নারীর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হবে

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯ | ১১ চৈত্র ১৪২৫

নারীর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হবে

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন ৭:০২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

নারীর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে হবে

প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখি নারীর প্রতি যৌন হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার খবর। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক শত্রুতা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ সব ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে নারী।

যেকোনো তুচ্ছ ঘটনায় বাড়ি, অফিস, রাস্তা ও গণপরিবহনেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারী। নারীর জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ, দেশ আমরা গড়ে তুলতে পারি নি। নারীর জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র বা গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই আমাদের। এমনকি একটি নিরাপদ মানসিকতাও গড়ে তুলতে পারি নি আমরা !

নারী-পুরুষ একসঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ গড়ার কথা। কিন্তু একজন নারী কি তার পুরুষ সহপাঠী, সহকর্মী ও প্রতিবেশীর কাছে নিরাপদ !

প্রতিদিন নারী ধর্ষিত হচ্ছে, আশঙ্কার কথা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশুরাও। ধর্ষণের পর অথবা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে তাদের হত্যা করার ঘটনা ঘটছে। যেসব খবর গণমাধ্যমে উঠে আসছে আমরা শুধু সেই তথ্যগুলোই জানছি। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে হাজারো ঘটনা। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারী তার লাঞ্ছনার খরব বলার সাহস করে না। কারণ সমাজ ধর্ষকদের বিচার করার বদলে ধর্ষণের শিকার নারীর নানা দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়।

এই দেশে বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর নারী নির্যাতনের বিচার চাইতে আইনজীবীর কাছে যায় কুমিল্লার লালমাই উপজেলার এক নারী। কিন্তু বিচারে সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে আইনজীবীর দুই সহকারী তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। বিচারপতি তোমার বিচার করবে কে?

নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে যখন বিছানায় কাতরাচ্ছে ধর্ষক তখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। আমরা সতীদাহ প্রথা দূর করেছি, ইভটিজিংয়ের নাগাল টেনে ধরেছি কিন্তু কেন ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছি না? কেন নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণ করতে পারছি না?

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধর্ষণের শিকার নারী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। যেমনি ২০০১ সালে শিকার হয়েছিলেন পূর্ণিমা রাণী।

বিবিসির অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও তার ছত্রছায়ার লোক প্রতিশোধ নিতে ওই নারীকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ করার পূর্বে ওই নারীর স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রাখা হয়। কতটা বেপরোয়া হলে এমন ঘটনা ঘটানো যায়। শুরুতে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও মূলধারার গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর উঠে আসায় তা আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু এরপরেও অনেক ঘটনার বিচার হয় না। সংস্কৃতিকর্মী তনু হত্যার বিচার হয়নি আজও।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুসারে গত চার বছরে নারী ও শিশু ধর্ষণ সংক্রান্ত ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ভিকটিমের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৮৯ জন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী ও ৩ হাজার ৫২৮ জন শিশু। এ সময় মাত্র ৩ হাজার ৪৩০টি ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ হয়েছে। অন্যদিকে নিষ্পত্তি হওয়ায় মামলায় শাস্তিও হয় কদাচিৎ।

প্রথম আলো পত্রিকার এক বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা যায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে গত ১৫ বছরে ৪২৭৭ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যেখানে সাজা হয়েছে ৩% মামলার, অব্যহতি পেয়েছে ৪১% মামলার আসামি আর খালাস হয়েছে ৫৫% মামলা। (৮ মার্চ, ২০১৮ দৈনিক প্রথম আলো)।

মামলায় সাজা না হওয়া, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতি প্রশ্রয়ের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী পার পেয়ে যায়। বরং ভিকটিম বিচার চাইতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হন। মেয়েকে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনায় বিচার না পেয়ে ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুর রেল স্টেশনের কাছে চলন্ত ট্রেনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন হযরত আলী ও তার মেয়ে আয়েশা আক্তার। অন্যদিকে বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি অপরাধীদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলছে।

মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে ৯৬৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৫৮ জনকে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, গত তিন বছরের ধর্ষণের শিকার নারীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু।
সম্প্রতি ঢাকার ডেমরায় পাঁচ ও সাত বছরের দুই শিশুকে লিপস্টিকের লোভ দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করে দুই পাষণ্ড। জানা যায়, ওই দুই খুনি মাদকাসক্ত ছিল। শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ শিশুদের বাধাদানের শারীরিক শক্তির অভাব, ধর্ষককে পরবর্তীতে চিনতে না পারা, ধর্ষকদের বিকৃত যৌন চাহিদা।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, ২০১৭ সালে ৫৯৩ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৭০ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৪৪ জন প্রতিবন্ধী শিশু।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে ৩০৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যেখানে ১৫৭ জনের বয়স ১২ এর কম এবং ৪৬ জনের বয়স ৬ বছরের কম। এরমধ্যে ১৬ জনকে ধর্ষণের পর এবং ৪ জনকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়।

সদ্যসমাপ্ত ২০১৮ সালের (জানু-জুন) ছয়মাসে ২০৬৩টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৩২টি, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ২৯ জনকে। এসিড সন্ত্রাসের শিকার হযেছেন ১০ নারী। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৭৭টি। পাচার করা হয়েছে ১৩ জনকে। যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ৫১ জন নারীকে। উত্ত্যক্ত করার জেরে আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩ নারী।

ধর্ষণের চেষ্টাও এক ধরনের যৌনসন্ত্রাস। গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা-আশুলিয়া সড়কের সুইসগেট এলাকায় এক নারীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের চেষ্টা করে গাড়িচালক ও হেলপার। পরে বাঁচার জন্য সেই নারী চলন্ত গাড়ি থেকে জানালা দিয়ে লাফ দেন। গাড়িতে ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা এটা প্রথম নয়। গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে পরিবহন শ্রমিকরা চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে শিক্ষার্থী রূপাকে।

এত ঘটনার পরও নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই। নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য নারীর চলাচলের জন্য নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা জরুরি।

শুধু সুবর্ণচরের ঘটনা নয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। গত বছর বগুড়ায় এক শিক্ষার্থীকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার৷

তাই ধর্ষণ বন্ধ করতে চাইলে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া পারিবারিক দ্বন্দ্বেও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে নারী। নোয়াখালীতে পারভিন আক্তার নামে এক গার্মেন্টকর্মীকে জমি বিরোধের জের ধরে গণধর্ষণ করে বিবদমান প্রতিবেশীরা। পরে পায়ের রগ কেটে তাকে মেরে জঙ্গলে লাশ ফেলে দেয়।

নারী আর্থসামাজিক নিম্ন অবস্থানের কারণে প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হয়। তাছাড়া সমাজের নৈতিক মূল্যবোধহীনতা, মাদকের বিস্তার,পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত যৌনরুচিও দায়ী। আবার প্রায় সব বাংলা সিনেমায় দেখানো হয় কীভাবে একটা নারীকে ধর্ষণ করা হয়। ঠুনকো কারণে নারীকে ধর্ষণ করা যায়। এসব দেখানোর কারণে নারীকে একটি যৌন চাহিদা মেটানোর বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

তাই ধর্ষণ বন্ধ করতে সুষ্ঠু সংস্কৃতিচর্চা, পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষার প্রসার, নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তাছাড়া পুরুষকেও সচেতন করতে হবে যে নারী কোনো ভোগ্যপণ্য নয়। একজন নারী কারো মা, কারো বোন, কারো মেয়ে, কারো প্রিয়তমা। তাই নারীকে সম্মান করতে হবে।

যেকোনো ধরনের যৌন সহিংসতার ব্যাপারে সব ধর্মে কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রত্যেকটা মা যদি তার সন্তানকে গড়ে তুলে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে তবেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গড়া সম্ভব। তবে সবচেয়ে বেশি যেটি দরকার তা হলো নারীর প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধের দৃষ্টিভঙ্গি, আইনের শাসন ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।