নেত্রকোনা-১ নিয়ে আওয়ামী লীগ কী ভাববে?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

নেত্রকোনা-১ নিয়ে আওয়ামী লীগ কী ভাববে?

চারণ গোপাল চক্রবর্তী ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

নেত্রকোনা-১ নিয়ে আওয়ামী লীগ কী ভাববে?

আওয়ামী শব্দটি এসেছে উর্দু শব্দ 'আওয়াম' থেকে, যার অর্থ 'জনগণ’। আর লীগ অর্থ  'দল'। মানে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ হলো জনগণের দল। এই দলের নেতৃত্বেই আজকের এই বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন সব সময় এই দলের প্রতি রয়েছে। রয়েছে বিশ্বাস ও আস্থা। আর এই আস্থা একদিনে হয়ে উঠেনি। সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত সময়পোযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য নেতৃত্ব এই দলকে মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে এসেছে। একটি স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় আর আওয়ামী লীগ একই সূত্রে গাঁথা। এই দলকে নেতৃত্বশূন্য করতে ষড়যন্ত্রকারীরা সব সময় সরব। হত্যা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে। বার বার হত্যার জন্য আঘাত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার ওপর। কারণ, আওয়ামী লীগই জনগণের কথা বলে, দেশের কথা বলে।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে ঘাতকরা সপরিবারে হত্যা করে। তখন থেকে প্রায় ৬ বছর আওয়ামী লীগ কঠিন সময় পার করেছে। তারপর ১৯৮১ সাল থেকে বিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগকে জননেত্রী শেখ হাসিনা এক সুঁতোয় এনেছেন। তিনি যা সিদ্ধান্ত নেবার নিয়েছেন এবং নিবেন। সকলের চাইতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভালো-মন্দ উনিই ভালো বুঝেন। আওয়ামী লীগ আজকের পর্যায়ে তার যোগ্য নেতৃত্বেই এসেছে। আজকের পর্যায়ে দলকে নিয়ে আসতে যে পরিমাণ কষ্ট তাকে সইতে হয়েছে তা কেবল তিনিই জানেন। তাহলে দলের কিসে মঙ্গল কিসে অমঙ্গল তা উনার চাইতে ভালো কেউ বোঝার কথা নয়। মায়ের চাইতে মাসির দরদ বেশি হলে নাকি তাকে ভণ্ডামি বলা হয়। তবুও মাসিতো। তাও আবার কবিগুরুর দেবতার গ্রাস কবিতার রাখালের মাসি। তাই লেখা-

জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হবে, দল থেকে এ রকম ঘোষণা পেয়ে নেত্রকোনা-১ থেকে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২৬ জন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কিনেছিল। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাথে জননেত্রী শেখ হাসিনা কথা বলেছেন। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানিয়েছেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে দলকে বিজয়ী করতে কাজ করার কথা বলেছেন। নির্বাচন কঠিন হবে, সুষ্ঠু হবে, তাই ভোটারদের ঘরে ঘরে যাবার কথা বলেছেন। কেউ যেন আত্মতুষ্টিতে না থাকেন তাও বলেছেন। তিনি যাকে মনোনয়ন দিবেন তার হয়ে সকলকে কাজ করার কথা বলেছেন। অথচ গত ২৫ নভেম্বর মনোনয়ন ঘোষণা করার পর থেকে নেত্রকোনা-১ নির্বাচনী এলাকার সব কিছু উল্টো হচ্ছে। কিছু নেতাকর্মী বিভক্ত হয়ে রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ করছে। যাদের অনেকেই এখন ফিরে আসছে মূল স্রোতে। সমস্যা তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাগণ নয়, সমস্যা হলো সাধারণ জনগণকে নিয়ে। তাদের মুখের হাসি হারিয়ে গেছে। তারা বিরূপ মন্তব্য করছেন। অনলাইন থেকে রাস্তার পাশের প্রতিটা চা স্টলে প্রকাশ্য আলাপ-আলোচনায় তারা বিক্ষোভ করছেন। তাদের মন্তব্যের ধরণ আমাকে বিস্মিত করছে!

যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি অবশ্যই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। কিন্তু উনার জন্ম কিশোরগঞ্জ। তিনি এই এলাকার জামাই। বিগত কিছু দিন পূর্বে তিনি জায়গা-জমি কিনে এই এলাকার ভোটার হয়েছেন। ১০ম সংসদের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ভগ্নিপতি তিনি। বর্তমান সংসদ সদস্য খোদ তার ভগ্নিপতিকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে বলেছেন, ‘তিনি আমার ভগ্নিপতি, এই এলাকার না, এখানকার মানুষ আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দিবে, তাই ভোট পাবে না।’

সাধারণ জনগণ তো রীতিমতো প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে পেলে। তাদের আলাপচারিতাগুলো হলো এ রকম- “উনি কেডা? এই প্রার্থী তো ফেইল করবো, আমরার এলাকাত কে নেতা কেউ আছিন না, হেরে দিলো কে, ও তাইলে মনে হয় জোর কইরাই পাস করাইবো, তাইলে আর ভোট লাগে কেরে”।

এই এলাকার জনগণের মুখে রটে যাচ্ছে প্রার্থী পরাজিত হবে, না হয় জোর করে পাস করানো হবে। এর সাথে রঙ্গ যোগ করছে হালের কিছু কর্মী। তারা আত্মতুষ্টিতে নিজেরা ভুগছেন ও অন্যদেরকেও ভোগাচ্ছেন। যা এই এলাকার আওয়ামী লীগের জন্য কখনই সুফল বয়ে আনবে না। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছে। নৌকা নিয়ে মিছিল হলে জনতা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যেত সম্মান জানাতে, যা আজ চোখেই পড়ে না। তাই বলা যায়, এই আসনে যা ভোট প্রাপ্ত হবে তা শুধু দেশের উন্নয়নের তরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি ভালোবাসায়। বিগত নির্বাচনগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে, এই আসনে কখনই আওয়ামী লীগ একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই আসন যখন যে সরকার গঠন করেছে তার দখলেই ছিল। সব সময় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে।

যেমন– ৫ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী করিম আব্বাসী পেয়েছিলো ৩৮৪৩৭ ভোট, আওয়ামী লীগ থেকে জালাল উদ্দিন তালুকদার পায় ৩৮০২৩ ভোট। বিএনপি ৪১৪ ভোটে জয় পায়।

৭ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে জালাল উদ্দিন তালুকদার পেয়েছিলেন ৫৯৫৭৪ ভোট, বিএনপির প্রার্থী করিম আব্বাসী পায় ৫৫০২৭ ভোট। আওয়ামী লীগ ৪৫৪৭ ভোটে জয় পায়।

৮ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী করিম আব্বাসী পেয়েছিলো ১০৩০৫৯ ভোট, আওয়ামী লীগ থেকে জালাল উদ্দিন তালুকদার পায় ৯০০৩১ ভোট। বিএনপি ১৩০২৮ ভোটে জয় পায়।

১/১১ প্রেক্ষাপটের পর ৯ম সংসদ নির্বাচনে এসে বড় দুই দলই তরুণ প্রার্থী দেয়। কারণ এই সময় নতুন ভোটার যোগ হয়ে এই এলাকার মোট ভোটার সংখ্যা হয় ২৬৪৯৪৫। আওয়ামী লীগ থেকে মোস্তাক আহমেদ রুহী পায় ১৪০৪৬৫ ভোট, বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পায় ৮৬৭৩৭ ভোট। এখানে আওয়ামী লীগ একটা নতুন মাত্রা পায়। এই প্রথম বিএনপির দূর্গে হানা দেয় আওয়ামী লীগ। হিসাব মিলালে দেখা যায়, ২০০১ এর ৮ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রাপ্ত ভোট ৯ম সংসদ নির্বাচনে এসে ১৬৩২২ ভোট কমে যায়। তার জন্য আওয়ামী লীগ ৫৩৭২৮ ভোটে জয় পায়। এর পেছনে কাজ করেছে মোস্তাক আহমেদ রুহীর নেতৃত্ব। এই অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারের সন্তান আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র। সেই কলেজের ছাত্রনেতা সাবেক এজিএস ও ভিপি রুহীকে পেয়ে দলের চাইতেও ব্যক্তিকেই বেছে নেয়।

এরপর দেখা যাক ১০ম সংসদ নির্বাচন। মোট ভোটার সংখ্যা ৩০০২৭১ জন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরিবর্তন করে নতুন প্রার্থী দেয়। বিএনপি নির্বাচন বিমুখ। আওয়ামী লীগ ঘোষিত প্রার্থীকে তার নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সাথে ভোট যুদ্ধে নামতে হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয় মোস্তাক আহমেদ রুহী ও শাহ কুতুবউদ্দিন তালুকদার রুয়েল। এই নির্বাচনে মোট প্রাপ্ত ভোট হয় প্রায় ১ লক্ষ (কম-বেশি)। আওয়ামী লীগ থেকে ছবি বিশ্বাস ৫৩৪৯৬ ভোট পেয়ে জয় পায়। রুহী পায় ১৭৬৬৫ ভোট। রুয়েলের ভোটের সঠিক কোনো তথ্য না থাকায় উল্লেখ করতে পারলাম না(এই নির্বাচন শেষে রুয়েল তালুকদার সংবাদ সম্মেলন করে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ করেন)। এখানে দেখা যায়, ৯ম সংসদ নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের ঘরের ভোট প্রায় ৪০ হাজার নীরব থেকেছে। ধরে নেওয়া যায় প্রার্থী পছন্দ হয়নি ও নৌকার বিরুদ্ধে যেতে পারবে না তাই তারা নীরবই থেকেছে। সে সময়ও ছড়ানো হয়েছিলো নৌকা এমনিতেই জয় পাবে।

এবারের ১১তম সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে, তা খোদ প্রধানমন্ত্রী বার বার বলছেন। তাহলে বিএনপি যখন তাদের পুরাতন প্রার্থী কায়সার কামালকে(৯ম-৮৬৭৩৭ ভোট) মনোনয়ন দিলো সেখানে আওয়ামী লীগ আবারও কেন নতুন প্রার্থী মাঠে নামিয়েছে তাদের পুরাতন পরীক্ষিত প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও। এটা কি জেনেশুনে বিষপানের শামিল নয়! একদিকে বিএনপি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সব কিছু হাল্কাভাবেই নিচ্ছে জনগণের চাওয়ার বাইরে থেকে। এই নেত্রকোনা-১ আওয়ামী লীগের একক আসন নয়। যেহেতু এই এলাকার সবচাইতে জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা জালাল উদ্দিন তালুকদারকেও বার বার পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।

১০ম সংসদ নির্বাচনে যেখানে ৪০ হাজার আওয়ামী ভোটার নীরব থেকেছে। এবারও যে কাণ্ড ঘটছে তাতে এর চাইতেও বড় সংখ্যায় যে নীরব থাকবে না তার গ্যারান্টি কী?

১০ম সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৪৭ হাজার ভোট নৌকার বিপরীতে গিয়েছিল, এটাও ভাবানায় আনা প্রয়োজন। ভাবনায় আনা প্রয়োজন কায়সার কামাল বিএনপির সেন্ট্রাল কমিটির পরিচিত নেতা। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবলে ভুল করবে। তারা প্রচার-অপপ্রচারে সরব। আওয়ামী লীগ নেতারা যখন হনু হয়ে ঘুরছে তখন তারা গ্রামে-গঞ্জের শহেরর চা-স্টল রাস্তার মোড়ে নীরব প্রচারণায় ব্যস্ত।

এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বলছে, ৮ তারিখ পর্যন্ত সময় আছে। তাদের সামনে এখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আছে। না হয়তো ভুল বার্তায় ভুল করে এই দুর্গাপুর-কলমাকান্দায়(নেত্রকোনা-১)আওয়ামী লীগের সামনের দিনগুলোতে ভয়াভহ পরিণতির শিকার হবে। আওয়ামী লীগ মানে জনগণের দল, তা যেন ভুলে না যায়। যে বিশ্বাস ও আস্থা এখনও আছে তা যেন অটুট থাকে। সবশেষ ঋতিক বাবুর স্বরেই বলি, ভাবুন আওয়ামী লীগ ভাবা প্র্যাকটিস করুন দলের স্বার্থে।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।