এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর কত?

ঢাকা, ১২ মার্চ, ২০১৯ | 2 0 1

এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর কত?

রিক্তা আসলাম ১:৩৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা আর কত?

ভিকারুননিসা নুন স্কুলের ক্লাস নাইনের একটা মেয়ে আত্মহত্যা করল। এই প্রথম এমন কিছু ঘটল তা নয়। এসএসসি, এইচএসসির রেজাল্টের পরপর প্রতি বছর কিছু বাচ্চা এভাবে আত্মহত্যা করে। আমাদের যতগুলো সামাজিক সমস্যা আছে, তার মধ্যে প্রথম ও প্রধান সমস্যা শিক্ষাক্ষেত্রে অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা।

বাচ্চা ভাল স্কুলে পড়বে, এ প্লাস পাবে— এ না হলে যেন সমাজে মুখ দেখানোই দায় হয়ে পড়ে। আমরা অভিভাবকরা চাই যে, কোনো মূল্যে ভাল একটা স্কুলে দিতে। কারণ, আমাদের ধারণা, ভিকারুননিসা বা আইডিয়ালে দিলেই এ প্লাস নিশ্চিত। আর এ প্লাস নিশ্চিত হলেই বুয়েট মেডিকেল নিশ্চিত।

অথচ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যাই হোক ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে না উঠলে তার দ্বারা পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের কোনো উপকারই হয় না। এখনকার এডুকেশন সিস্টেম এমন যে, একটা বাচ্চাকে ক্লাস ওয়ানের আগেই অসুস্থ এবং অমানবিক এক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হয়।

ক্লাস ওয়ানে ভাল স্কুলগুলোতে ভর্তি হতে তাকে কোচিং করতে হয়। যেই বয়সে সে ধুলোবালি মাখামাখি হয়ে খেলবে, মনের আনন্দে আঁকিবুকি করবে অথবা কার্টুন দেখবে তখন সে একের পর এক কোচিং করে ঘরে ফেরে। ঘরে ফিরেও শান্তি নেই, হোমওয়ার্ক। স্কুলের সাথে কোচিংয়ের।

মাগুলাও বাচ্চাদের সাথে পড়ে সব মুখস্থ করে ফেলে। ঘুম পাড়াতে গিয়ে তারা বাচ্চাদের সাথে মজার কোনো গল্প বলে না বরং আগামী দিনের পড়া ঝালিয়ে নেয় শুয়ে অথবা কোচিং আর স্কুলের টাইম শিডিউল মেলান। বাচ্চার ইমোশোনের জগত কারও বিবেচনায় নেই, না মা, না বাবা, না স্কুলের টিচারের।

কিশোর বয়স বড় বেশি আবেগের। এই বয়সে হঠাৎ করে মান-অপমানবোধ খুব বেশি তীব্রভাবে বুকে বাজে। দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, স্কুলের টিচাররা ছুটি গল্পের ফটিকের মামীর মতো ব্যবহার করে এসব কিশোর-কিশোরীদের সাথে। অথচ এই বয়সে ওরা চায় একটু বাড়তি মনোযোগ, একটু স্নেহার্দ্র স্পর্শ।

সবাই সমান ব্রিলিয়ান্ট হয় না। কিন্তু, এরা এই সহজ সত্যিটা জানলেও মানে না। ভাল নাম্বার যারা পায়, তাদের সামনে খারাপ স্টুডেন্টদের অপমানের চূড়ান্ত করে ছাড়ে। ঘরে ফিরে সেই অপমানিত কিশোর-কিশোরী নিভৃতে বসে জীবন থেকে পালাবার পথ খোঁজে।

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, কোনো বাবা-মা বলে না বাবু, তুমি আজ রেস্ট নাও। না হয় মজার কোনো গল্পের বই পড়ো। তোমার পছন্দের কার্টুন দেখ। অথবা জিজ্ঞেস করে না, তোমার কি করতে ভাল লাগে বাবা? চাষবাসের জন্য গরুর কাঁধে যেভাবে জোয়াল চড়িয়ে দেয় ঠিক সেইভাবে কঁচিকঁচি প্রাণের পরে চাপিয়ে দেয়া হয় ভারী ভারী বইয়ের বোঝা।

এ প্লাস, বুয়েট মেডিকেল যখন সোশ্যাল স্ট্যাটাস হয়ে দাঁড়ায় তখন বাচ্চার কাছ থেকে মানবিক আচরণ আশা করাও ঠিক না। সবাই মিলে একটা রোবট প্রজন্ম বানাচ্ছি। কিছু কিছু রোবট এসবের পরেও মানবিক বোধ হারায় না। তাই এই সিস্টেমে মানিয়ে নিতে না পেরে অকালে ঝরে যায়।


লেখক-রিক্তা আসলাম

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 

মুক্তকথা: আরও পড়ুন

আরও