অরিত্রির আত্মহত্যা ও ভিকারুননিসা!

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

অরিত্রির আত্মহত্যা ও ভিকারুননিসা!

মাহফুজা মুন্না ১:০৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

অরিত্রির আত্মহত্যা ও ভিকারুননিসা!

আমার ছোট মেয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। কাল (সোমবার) যখন বাসায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করল, আমিতো রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম। কি হয়েছে বাবু জিজ্ঞেস করতেই বলল, অরিত্রি সুইসাইড করেছে। আমার হার্টবিট মিস হলো, কয়েকদিন আগেই তিন বন্ধু মিলে বেইলি রোডে খেয়ে এল।

কেন বাবু কেন এমন করল? চিৎকার দিয়ে উঠলাম, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। ভীষণ গুণী, ভীষণ পজেটিভ মেয়ে ও, নাচ-গান, ছবি আঁকা সব বিষয়ে দক্ষ ছিল। আর খুব বাবাভক্ত ছিল, বাবার কথাই মুখে সারাক্ষণ থাকতো।

সমাজ পরীক্ষায় সেলফোন নিয়ে ধরা পরার পর যখন টিসি দেয়ার কথা বলে। আর বাবাকে অপমান করতে দেখে ও সেটা হয়তো নিতে পারেনি, কাউকে না বলে বাসায় চলে এসেই ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মাহত্যা করেছে।

মেয়েটা ভুল করেছে নিঃসন্দেহে। কারণ, বেঁচে থাকলে সব সমস্যার কোনো না কোনো সমাধান আছেই।

কাল ছিল কেমিস্ট্রি পরীক্ষা। তার আগে সমাজ। ইলেকশনের কারণে পরীক্ষার আগে কোনো বন্ধ না পাওয়ায় পরীক্ষার্থীরা চাপে আছে। তার উপর শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে যে, পরীক্ষায় খারাপ করলে দশম শ্রেণিতে উঠানো হবে না। এটা সব স্কুলেই বলে কিন্তু ভিকারুননিসায় যা করে তা হলো অভিভাবকদের জঘন্যভাবে অপমান। হেড মিস জিন্নাত আপা, যা মুখে আসে তাই বলেন। তিনি প্রিন্সিপালকেও তোয়াক্কা করেন না।

আমার মেয়ের সহপাঠী কয়েকজন মেয়েকে ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠাল না শুধুমাত্র কয়েকটি নাম্বারের জন্য, তাও বাচ্চাগুলো পারিবারিক কিংবা শারীরিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। কারও পরিবারের সদস্য মারা গিয়েছিল বলে দেশে চলে গিয়েছিল, কারও দাদি স্ট্রোক করেছে। ফলে পুরো পরিবার দৌড়াদৌড়ির কারণে মেয়ের পড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। কেউ জ্বরে পরীক্ষা দিতে পারেনি, এমনি নানাবিধ কারণ আর স্কুলের সিস্টেম সব পরীক্ষা মিলে গড়ে পাস। ফলে যাদের গড় করে ৩৩ আসেনি, তাদের অষ্টম শ্রেণিতে উঠানো হয়নি।

অভিভাবকরা একটা চান্স চেয়েছিল এইটের হাফ ইয়ারলি পর্যন্ত। কিন্তু, সেটাও দেয়া হয়নি। প্রিন্সিপাল আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু, জিন্নাত আপা কোনো কথা শুনেননি। বরং বাচ্চাগুলোকে জঘন্যভাবে অপমান করেছে। এমন কথাও বলেছেন, অন্যান্য বাচ্চাদের সামনে, তোমরা দেখে রাখো এরা কালপিট, আমি উঠাব না বলে দিয়েছি তারপরও প্রিন্সিপালের কাছে যায় আমার নামে নালিশ করতে, কি নির্লজ্জ বেহায়া। (অথচ বাচ্চারা অনুরোধ করেছিল প্রিন্সিপালকে যেন জিনাত আপা ওদের মাফ করে দিয়ে প্রমোশন দেয়) আরও জঘন্য কথা যেগুলো শুনে অভিভাবক এবং বাচ্চারা খুব কেঁদেছে।

এরা লটারিতে চান্স পাওয়া বাচ্চা না, পরীক্ষা দিয়ে চান্স পাওয়া বাচ্চা। ফাইভে এ+ পাওয়া বাচ্চা। এদের জীবন থেকে একটা বছর কেড়ে নিল জিন্নাত আপা।

এবার ১ বৈশাখের একটি ঘটনা। জিনাত আপা নাকি ড্রেস কোড দিয়েছিলেন, সাদা-লাল কম্বিনেশন। অনেকেই জানতে পারেনি, আবার অনেকেই ভেবেছে যে, যারা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য এই ড্রেস কোড। আমার মেয়েকে তার জেবা আপু একটি শাড়ি গিফট করেছে। শাড়িটি তার বড় খালামনি পছন্দ করে কিনেছে। আজকাল ১ বৈশাখে সাদা-লাল কম্বিনেশনের শাড়িই পড়তে হবে এমন নিয়ম নিশ্চয়ই নাই। মেয়ের শাড়িটির রঙ বেগুনী। চমৎকার শাড়িটি পরে সেজেগুজে স্কুলে গিয়েছে। কিন্তু, গিয়ে দেখে গেইটে বাচ্চাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে যারা ভিন্ন রঙের ড্রেস পরেছে। জিনাত আপার হুকুম, সে ঢোকার সময় যাদের দেখেছে তাদের বের করে দিয়েছে। গার্ডদের বলে দিয়েছে যেন কাউকে ঢুকতে না দেয়া হয়। পরে প্রিন্সিপ্যাল আপা ঢুকতে দিতে চাইলেও জিনাত আপা প্রতিবাদ করে বলেন, আমাকে কিন্তু অপমান করছেন আপা। পরে গার্ডিয়ানরা অনুরোধ করেছেন এই বলে, যেসব বাচ্চা একা এসেছে ভ্যানে বা মাইক্রোতে তারা কি করবে? তখন স্কুলের ভেতর ঢুকতে দিয়েছে। কিন্তু, অডিটোরিয়ামে ঢুকতে দেয় নাই।

এমনি হাজারো ঘটনা আছে জিনাত আপা ও কিছু টিচারের বিরুদ্ধে। আমার মেয়ের ক্লাস টিচার খুবই ভাল। ভীষণ পজেটিভ। আরও এমন ভালো শিক্ষক আছেন। কিন্তু, তাদের কেউ জিন্নাত আপার মন নরম করাতে সক্ষম নন। প্রিন্সিপাল আপা বেশ নরম। কিন্তু, ভাবখানা যেন জিন্নাত আপাই প্রিন্সিপাল। কার জোরে এত ক্ষমতা এটা নিয়ে সবাই কানাঘুষা করে যদিও কিন্তু প্রতিকার নাই।

জীবনের মূল্যই যদি না বুঝল না শিখলো বাচ্চারা তবে আর সময়ের মূল্য কিংবা এইম ইন লাইফ পড়ে কি হবে? স্কুলে আসলে কি শিখায়? স্কুল থেকে বাচ্চারা কি শিখে? কি শেখা উচিত? যে কোনোভাবে হোক বেঁচে থাকার লড়াই করতে হবে আগে এটাই মূলমন্ত্র হওয়া উচিত নয় কি?

বেঁচে থাকলে যুদ্ধ করা যায়, প্রতিশোধ নেয়া যায়। নিজেকে পরিবর্তন করা যায়। আত্মহত্যা করলে শুধুই কষ্ট। যে মারা গেল, সে কষ্ট নিয়ে গেল। যাদের রেখে গেল সেই পরিবারের সদস্যরা কষ্ট নিয়ে বাঁচল। কিন্তু, যার কারণে আত্মাহুতি তিনি দিব্বি সুখে থাকবেন নিশ্চিত।

মা-বাবাদের বলব যে বাচ্চাদের আশেপাশের সমস্ত বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দেন দয়া করে। এরা ঝগড়া করবে, মারামারি করবে, আড়ি নিবে, ভাব নিবে, এমনি করেই টিকে থাকতে শিখবে। survival of the fittest। যোগ্যরাই টিকে থাকবে।

লেখক: অভিভাবক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।