প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কি কোটা চায়?

ঢাকা, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯ | ১০ চৈত্র ১৪২৫

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কি কোটা চায়?

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:০৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৮

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কি কোটা চায়?

বেশ কিছু দিন ধরে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে একটা শিরোনাম হয়েছে অথবা দ্বিতীয়স্থান দখল করেছিল।  তা হলো, কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন। কোটা বিরোধী আন্দোলনে কি হয়েছে তা আমরা সবাই কম বেশি জানি। আর বর্তমানে তা কি অবস্থায় উপনীত হয়েছে তাও আমরা সবাই জানি।

এখন কোটা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা এবং তাদের নাতি পুতিদের কি কোটা সুবিধা থাকা উচিত কি  উচিত না সে বিষয় নিয়ে মতবিরোধ আছে। কিন্তু যাদের কোটা সুবিধা থাকা নিয়ে কারোর মনেই সন্দেহ ছিল না, তা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোটা। কিন্তু ঘটলো ঠিক তার উল্টোটা। আমাদের প্রতিবন্ধী ভাই ও বোনেরা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে। সুশীল সমাজের মানুষেরা বলবে যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি পাওয়া একটি রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার।

আবার কেউ কেউ বলতে চাইবেন যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি দেবার মাধ্যমে আমরা সামাজিক ন্যয় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। সব যুক্তি হয়ত সঠিক। কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তার পরিবারের কাছে একটি চাকরি বা কর্মসংস্থানের যেভাবেই বলি না কেন এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যখন শত বাধা অতিক্রম করে শিক্ষা গ্রহণ করে, তারপর সে চায় যে সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে মূল্যায়ন পাবে।  একটি চাকরিই দিতে পারে সেই মূল্যায়ন।

পরিবার যখন দেখে তাদের পরিবারের সদস্যটি চাকরি করার মাধ্যমে সমাজে মূল শ্রোত ধারায় আসতে পারছে তখন তারা স্বার্থক মনে করে। কোটা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বপ্ন, শ্রম ও তাদের সমাজের মূল শ্রোত ধারায় আসার পথ রুদ্ধ করে দিলাম নাকি? এই প্রশ্ন সবার কাছেই থাকলো।

ছোট্ট বেলায় একবার আমরা ভাই বোন জিদ ধরে ছিলাম।  মাঝ রাতে রসগোল্লা খাব। মা আমাকে অনেক বকা দিয়েছিলো। কিন্তু পরেরদিন মা ঠিকি আমার জন্য রসগোল্লা এনে দিয়েছিল। সন্তান আবদার করবেই অভিবাবকের দায়িত্ব হল গুরুত্ব বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরিবারের কোনো সদস্য যদি দুর্বল হয় সেক্ষেত্রে অভিবাবক আরো বেশি সহানুভুতিশীল হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেশের অভিভাবক। আর তার মতো একজন বিচক্ষণ  অভিভাবক কেনো এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন তা আমার বোধগম্য নয়।

যাহোক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা ও আন্দলনের ফলে হয়তো কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হবে। কিন্তু তাতেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে? বর্তমানে যে কোটা ব্যবস্থা ছিল সেখানে  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের, প্রাথমিক বাছাই ও লিখিত পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে কোটা পদ্ধতি কার্যকর হতো। যদি এরকম নিয়ম বহল থাকে তাহলে কোটা ব্যবস্থার যে মূল উদ্দেশ্য প্রতিবন্দী ব্যক্তিদের সমাজের মূল শ্রোত ধারায় আনা তা ব্যহত হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা পায় না। শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা আছে সর্বোপরি প্রবেশগম্যতার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মানসম্মত শিক্ষা হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর পাঁচটা অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির সাথে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেই, তা কি ঠিক হবে? আমরা যদি কোটা ব্যবস্থা রাখতেই চাই তাহলে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারি। যেখানে একটি নির্দিষ্ট নাম্বার পেলেই ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির হবার সুযোগ পায়। এই ব্যবস্থার ফলে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা।

রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে আমি মনে করি, কোটা ব্যবস্থার একটা সাময়িক প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়। যদি পৃথক মন্ত্রণালয় থাকতো তাহলে আজকে আমরা যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছি তা হয়তো হতাম না। কারণ পৃথক মন্ত্রণালয় আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে দেখতে পারতো।

আমি একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বলতে চাই, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করতে হবে তাদের সমাজের মূল শ্রোত ধারায় আনতে হবে। তারা আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এত সুন্দর কথা আমি জানি না। আমরা শুধু জানি আমরা মানুষ। রাষ্ট্র আমাদের শান্তিতে, সন্মানের সাথে এবং নিরাপদে থাকবার ব্যবস্থা করবে। এটা আমার প্রতি রাষ্ট্রের দয়া বা করুণা নয়। এটা আমার অধিকার।

তালুকদার রিফাত পাশা
E-mail:  [email protected]

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।