‘গ্রাম হবে শহর’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯ | ৭ চৈত্র ১৪২৫

‘গ্রাম হবে শহর’

আরিফুল ইসলাম আরিফ ৪:০৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০১, ২০১৮

‘গ্রাম হবে শহর’

স্লোগান একটি ধারণা বা উদ্দেশ্য পুনরাবৃত্তিমূলক অভিব্যক্তি হিসেবে একটি রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, ধর্মীয় এবং অন্যান্য প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি স্মরণীয় নীতিবাক্য বা শব্দগুচ্ছ।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্লোগান ব্যবহার বহুদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মূলত নির্বাচনকে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দল তাদের স্লোগানের উপর ভিত্তি করে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করে থাকে। এমনকি কখনো কখনো একটি ভালো এবং যুগোপোযোগী স্লোগান নির্বাচনের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করে দিয়ে থাকে। অতীতের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যায় স্লোগান জাতীয় নির্বাচনে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে থাকে।

গণতন্ত্রের সূতিকাগার খ্যাত মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের নির্বাচনে সর্বপ্রথম স্লোগান ব্যবহার করেন আমেরিকার নবম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন ১৮৪০ সালে।  তারপর প্রায় প্রতিটি মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের হয়ে নির্বাচনী স্লোগান ব্যবহার করে আসছে।

সর্বশেষ মার্কিন নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘Make America great again’।

অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান আমেরিকানদের মন জয় করে ট্রাম্পকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিলারী ক্লিনটনের সাথে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল। 

আগেই বলেছি নির্বাচনী স্লোগান অনেক সময় নির্বাচনী প্রেক্ষাপটকে পরিবর্তন করে দেয়। এরকম উদাহরণ ইতিহাসে অনেক রয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘Vote Yourself a Farm’ মূলত যুক্তরাস্ট্রের বাসিন্দাদের বিনামূল্য বাসস্থান প্রদানের আইনকে সমর্থন করে রিপাবলিকান দল এই প্রতিশ্রুতি দেয়। যা আব্রাহাম লিংকনকে যুক্তরাস্ট্রের ইতিহাসে প্রথম রিপাবলিকান  প্রেসিডেন্ট হতে অনেকটা ভূমিকা রাখে।

ভারতের প্রধাণমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে ‘জয় জাওয়ান, জয় কৃষাণ’ স্লোগান দিয়ে পুরো ভারতবর্ষের নজর কেড়েছিলেন এবং প্রধাণমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে ভারতের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী ‘গরীব হঠাও’ স্লোগান দিয়ে বাজিমাত করেছিলেন।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী স্লোগান নিয়ে-

বাংলাদেশের নির্বাচনেও প্রত্যেকটা দল নির্বাচনী স্লোগান দিয়ে থাকে যা তাদের নির্বাচনের ইশতিহারে গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। মূলত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ তথ্য প্রযুক্তি খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

২০০৮ সালে জয়ী হয়ে জনগণের আশা আকাঙ্খা অনেকটাই প্রতিফলন ঘটিয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার। 

ইনফো সরকার-৩ প্রকল্প, কালিয়াকৈরে হাইটেক সিটি পার্ক, যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, সারাদেশে ২৮টি আইটি পার্ক, ন্যাশনাল হেল্প ডেস্ক ৯৯৯ চালু,  সারাদেশে সকল নাগরিকদের স্মার্ট আইডি কার্ড প্রদান, উদ্যেক্তাদের জন্যে স্পেস বরাদ্দ, ৬ হাজার কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা, আউট সোর্সিংয়ের উপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ৩০ হাজারেরও অধিক স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমের ব্যবস্থা, শিক্ষকদের জন্যে শিক্ষক বাতায়ন, দেশের ১ হাজার ১০৪টি ইউনিয়নে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন, সরকারি সেবা গ্রাম অঞ্চলে পৌঁছে দেবার অভিপ্রায়ে দেশের ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ‘ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’, ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি ছাড়াও আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। 

এইসব উদ্যোগ দেশের আর্থ- সামাজিক উন্নয়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী স্লোগান ও ইশতিহারে যে সব বিষয় দেওয়া হয়েছিল তার অনেকটা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। জণগণের দেওয়া ভোটের মর্যাদা দিয়েছে। 

আগামী ৩০ ডিসেম্বর  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে উপদেষ্টামন্ডলীর এক সদস্য আওয়ামী লীগের নির্বাচী স্লোগান ঘোষণা দিয়েছেন ‘গ্রাম হবে শহর’।

চূড়ান্তভাবে স্লোগানটি এখনো সিলেক্ট না করা হলেও একই মেসেজের কিছু শব্দের পরিবর্তন আসতে পারে এই রকম ধারণা করা হচ্ছে। 

আমরা জানি একটি দেশ উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পূর্ব শর্ত হলো টেকসই উন্নয়নের লক্ষমাত্রা সমূহ অর্জন।

টেকসই উন্নয়নের অনগুলো শর্ত রয়েছে যেমন- দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নবায়ন যোগ্য ও ব্যয়সাধ্য জ্বালানী, উন্নত অবকাঠামো, বৈষম্য হ্রাস, শান্তি ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের মাধ্যমে একটি দেশ উন্নয়নশীল বা উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই উন্নয়নশীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। 

একটি দেশের উন্নয়ন টেকসই ও কার্যকর হয় যখন সেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ভালো হয়। যদি গ্রাম ও শহরের উন্নয়নের মধ্যে বৈষম্য হয় তাহলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। 

এইসব দিক বিবেচনা করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নির্বাচনী স্লোগান দিতে যাচ্ছে গ্রাম কেন্দ্রীক তথা গ্রাম উন্নয়নকে কেন্দ্র করে। 

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামকে উপেক্ষা করে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে  কাজ করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। 

কিছুদিন আগেও গ্রামের মানুষ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পেতে শহরমুখী হতো।  কর্মসংস্থানের খোঁজে,  ভালো শিক্ষা লাভের আশায়, উন্নত জীবন যাপনের জন্যে শহর অভিমুখী হতো। বিগত কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রাম অঞ্চলে পৌঁছেছে। 

বাংলাদেশের ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন ছিল এক নজিরবিহীন সাফল্য। আগে গ্রামের মানুষ ইন্টারনেট ভিত্তিক সব ধরনের কাজ করতে শহরে যেত। কিন্তু বর্তমানে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। কিছুদিন পূর্বেও বাংলাদেশের সবচেয়ে সমস্যা ছিলো লোড শেডিং বা বিদুৎতের সমস্যা। ২০১৪ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার একটা বিশেষ উদ্যোগ ছিলো ঘরে ঘরে বিদুৎ।  বর্তমানে বিদুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াটের উপরে যার ফলে গ্রামের মানুষও নিরবিচ্ছিন্ন বৈদ্যুতিক সুবিধা পাচ্ছে। ধীরে ধীরে গ্রাম অঞ্চলে কল কারখানা স্থাপন হচ্ছে ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হচ্ছে তেমনি গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইন্টারনেটের সুবিধার কারণে গ্রামের স্কুল কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে। মোবাইল ব্যাংকিং চালু হবার ফলে বিদেশ থেকে সহজেই রেমিটেন্স গ্রাম অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে, গ্রামের মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হচ্ছে।

বিনামূল্যে বীজ প্রদান,  অল্পসুদে কৃষিঋণ,  কৃষি উন্নয়নে ভুর্তকি বাড়ানো, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, প্রতিটি  ইউনিয়নে কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান  ইত্যাদি কার্যকরি উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গ্রামকে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। যার ফলে দেশ ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের জীবমযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬৫ শতাংশ যা ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে ছিল ৫.০৫ শতাংশ।  ২০০৬ সালের অর্থনীতির আকারের চেয়ে বর্তমান অর্থনীতির আকার বেড়েছে প্রায় চার গুণ। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার যা ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে ছিল ৬৮৬ মার্কিন ডলার।

দেশের অবকাঠামো এবং রাস্তাঘাটের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তৈরি হচ্ছে দেশের দীর্ঘতম সেতু ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় চার গুণ।  ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ছিল দেড় লক্ষ কোটি টাকার মতো। বর্তমানে তা প্রায় ছয় লক্ষ কোটি টাকার মতো। দেশের আমদানি ও রপ্তানি বেড়েছে কয়েক গুন। বাড়ছে বৈদেশিক রেমিটেন্স, বাড়ছে আমাদের নিজস্ব রিজার্ভ। দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৩ শতাংশে যা ২০০৯ সালে ছিল ৪০.৪ শতাংশ। 

সর্বোপরি মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ২০০৯ সালে সূচকের মান ছিল ০.৫৩৫। সর্বশেষ UNDP প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সূচকের স্থান দাঁড়িয়েছে ০.৫৭৯ এ।

আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে উন্নয়ন সুবিধার বণ্টনে সমতা আনতেই গত দশ বছরে গ্রামকে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলার অভিপ্রায়ে যে কাজ করে চলছে সেই পরিকল্পনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগানটিকে নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে।

মূলত শহুরে মানুষ যে ধরনের নাগরিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে সেই সুযোগ গ্রাম অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে ‘গ্রাম হবে শহর’ বেছে নিয়েছে।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে স্লোগানটি যথার্থ হয়েছে বলে আমি মনে করি। 

আশা করব দেশের জনগণ নৌকায় ভোট প্রদানের মাধ্যমে এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবে।

আসুন আমরা আমাদের স্বদেশকে স্বপ্নের সমান উচ্চতায় গড়ে তুলি।

জয় বাংলা

জয় বঙ্গবন্ধু

লেখক: সহ-সভাপতি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।