জেল হত্যা দিবস এবং জাতীয় চার নেতা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

জেল হত্যা দিবস এবং জাতীয় চার নেতা

মোস্তফা মাসুম তৌফিক ২:২৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

জেল হত্যা দিবস এবং জাতীয় চার নেতা

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক একটি দিন। খুনি মোশতাক সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে রিসালদার মুসলেম উদ্দিনসহ চারজন ঘাতক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে কারারুদ্ধ চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এটাই ইতিহাসের কুখ্যাত জেল হত্যা কিংবা চার দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতার শাহাদাত বরণ হিসেবে পরিচিত। একই দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তা হলো ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান হয়, এতে মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হন, সামরিক বাহিনীর প্রধান মে. জে. জিয়া গৃহবন্দী হন।

আজকের আলোচ্য বিষয় জেল হত্যা, তবে অনিবার্যভাবেই এর সাথে সম্পর্কিত আরও অনেক বিষয় এবং ঘটনা এখানে চলে আসে। জেল হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; স্বাধীনতা পরবর্তী দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা মাত্র। বিশেষ করে ১৯৭৫  সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, আাবদুর রব সেরনিয়াবত, শেখ ফজলুল হক মনিসহ ১৭ জনকে হত্যা করে যে নারকীয় তাণ্ডবের সূচনা করে, জেল হত্যাকাণ্ড যেন সেই তাণ্ডবের পরিপূর্ণতা এনে দেয়। জেল হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট বিচার করতে চাইলে সংক্ষেপে আমরা ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করতে প্রয়াস পাই।

সারাদেশে এক ভীষণ নৈরাজ্য, ১৬ আগস্টে টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুকে দাফন করা হয়, অবশ্য দাফনের আগেই ঢাকায় আওয়ামী লীগ কিংবা বাকশালের বড় একটা অংশ নিয়ে খোন্দকার মোশতাক সরকার গঠন করেন। সেনা প্রধান শফিউল্লাহ, বিমান বাহিনী প্রধান এ কে খোন্দকার, নৌ বাহিনী প্রধান এম এইচ খান, বিডিআর প্রধান খলিলুর  রহমান, রক্ষী বাহিনী প্রধান আবুল হাসান এবং পুলিশ প্রধান নুরুল ইসলাম খোন্দকার মোশতাকের আনুগত্য স্বীকার করে নেন। কেবিনেট সচিব এইচ টি ইমাম নবনিযুক্ত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের বন্দোবস্ত করেন, যেখানে ১০০% সদস্যই বাকশাল কিংবা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলো। বাকশাল কায়েমের সময় সংসদ এবং মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেয়া জে. ওসমানী মোশতাকের সামরিক উপদেষ্টা নিয়োজিত হন।

সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ডে বিরাট অসংগতি দেখা দেয়, জুনিয়র অফিসার রশীদ-ফারুক-ডালিম- নুর বঙ্গভবনে অবস্থান করে একের পর এক নির্দেশনা জারি করতে থাকে। ২২ আগস্ট নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার হন তাজউদ্দিন আহমদ, ২৩ আগস্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান এবং এম মনসুর আলীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এদের সাথে আবদুস সামাদ আযাদ, কোরবান আলীসহ আরও ১৪/১৫ নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়, ১৬ আগস্টেই সৌদি আরব ও সুদান এবং ৩১ আগস্টে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, ২৫ তারিখে শফিউল্লার স্থলে জিয়াকে সামরিক বাহিনীর প্রধান করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর বাকশালের বিলুপ্তি ঘটে। ২ সেপ্টেম্বরে আ. মালেক উকিলের নেতৃত্বে ৬৩ তম আন্তঃপার্লামেন্টারি সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডন যাত্রা। ৬ সেপ্টেম্বরে জিল্লুর রহমান, তোফায়েল এবং আ. রাজ্জাককে গ্রেফতার করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বরে রাবি ভিসি ড. মাযহারুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। ৪ অক্টোবর পাকিস্তান ও চীনের সাথে কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের যুক্ত ঘোষণা আসে। ৫ অক্টোবরে রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে একত্রিত করতে অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। ৭ অক্টোবর আমির হোসেন আমু গ্রেফতার হন। ১৭ অক্টোবর এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াবকে বিমান বাহিনীর চিফ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। ২১ সেপ্টেম্বরে ১৯টি জেলায় সামরিক আদালত স্থাপন করা হয়

সারাদেশে এক অদ্ভুত চিত্র ফুটে ওঠে। দ্রব্যমূল্য বিশেষ করে চালের দামে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়, আ. কাদের সিদ্দিকী ছাড়া আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কেউই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেনি। সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটে এবং গুজব রটে যায়, ভারত যে কোনো সময় বাংলাদেশ দখল নিয়ে নেবে। ভারত সরকারও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নাই মন্তব্য করলে, খো. মোশতাক বিশেষ দূত পাঠিয়ে ২৫ দফা বজায় থাকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সাথেও সম্পর্ক জোরদার করার জন্য দূত পাঠানো হয়। ওদিকে ইন্দিরা গান্ধীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে চলমান ঘটনাবলীতে চুপ থাকার অনুরোধ জানানো হয়, যা তিনি পরবর্তীকালে স্বীকার করে নেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরপরই ভুট্টো বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ সাহায্য পাঠান। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো একের পর এক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া শুরু করে, জীবিত বঙ্গবন্ধু হাজারবার অনুরোধ সত্ত্বেও যারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল।

এদিকে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কায় সর্বদা কম্পমান থাকতো মোশতাক রশীদ গং। বঙ্গভবনে এক পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক শুরু হয় সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লবী কে হবেন, জিয়া নাকি খালেদ মোশাররফ, তা নিয়ে। কর্নেল রশীদ তো একটি ব্রিগেডও গঠন করেন জিয়া ও খালেদকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে, পরবর্তীতে এটা অসম্ভব মনে করে তা স্থগিত করা হয়। শাফায়েত জামিল কয়েকবার জিয়ার কাছে ধর্না দেন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে, জিয়া প্রতিবারই " এখনও সময় হয়নি" বলে তা থামিয়ে দেন। এক পর্যায়ে খালেদ মোশাররফ শাফায়েত জামিলকে আশ্বস্ত করেন, তিনিই দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবেন। নতুন করে ক্যু এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ওদিকে জাসদ কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আদলে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে থাকে এবং তা বাস্তবায়নের পথে দ্রুত অগ্রসর হয়। গণবাহিনী এবার রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ব্যাপক আদর্শিক পরিবর্তন এবং সেই সাথে বিপ্লব করে দেশের পুরো দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হতে থাকে। এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে বিচলিত মোশতাক রশীদ ফারুক গং সব ধরনের প্রত্যাঘাতের আশঙ্কায় ক্ষমতার শীর্ষ স্থানে বসেও নিরাপত্তাহীনতার চরম অনুভূতিতে কাতর সময় পার করে। তাজউদ্দিনের আদর্শের সাথে মোশতাকের বিরোধ ছিলো ঐতিহাসিক। তাকে সরাসরি জেলে ভরা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং কামরুজ্জামানকে মন্ত্রী পদ অফার করলে তারা দুজনেই নাকচ করে দেন এবং সংগত কারণেই মোশতাক কোনো রিস্ক না নিতে তাদের বন্দী করে ফেলেন। আর এম মনসুর আলীকে মোশতাক প্রধানমন্ত্রী পদ অফার করলে, তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন, এমন কি মোশতাককে গালি পর্যন্ত দেন। এই চারজনই ছিলো ব্যাপক জনপ্রিয় এবং আদর্শবাদী। বঙ্গবন্ধু ভক্ত এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক। তারা চারজনই ৭৩ এর নির্বাচনে ব্যাপক  ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন, যেখানে মোশতাক রীতিমত পুকুরচুরি করে সংসদের সিট খানি পেয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু ছাড়া পুরো বাংলাদেশে এই চার নেতাই ছিলো সামনে থেকে যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে দেশ পরিচালনার যোগ্য, এটা মেশতাকের চেয়ে ভালো আর কেউ-ই জানতো না, একাত্তরের স্মরণে তিনি সব সময়ই তাই এ চার নেতাকে নিয়ে এলার্জিতে ভুগতেন। তাইতো জেলবন্দি হাজতির ভয়েই মোশতাক দিবারাত্রি কম্পমান থাকতেন।

এই পরিস্থিতিতে ৩ নভেম্বর অতি ভোরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে একটি জিপ থামে। জিপ থেকে নেমে রিসালদার মুসলেম উদ্দিনসহ চারজন সশস্ত্র অবস্থায় জেলে ঢুকতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হন। ডিআইজি প্রিজন যখন কোনভাবেই তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না, তখন রিসালদার সাহেব বিরাট উত্তেজিত হয়ে পরেন। মুসলেম উদ্দিন কর্নেল রশীদকে ফোন দিয়ে ডিআইজি সাহেবকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু কর্তব্যবোধ এবং স্বাভাবিকতার কারণে জেলার সাহেব কর্নেল রশীদকেও অগ্রাহ্য করলে, তিনি মোশতাককে ফোনটা দিলে মোশতাক স্বয়ং বলেন, "আমি প্রেসিডেন্ট মোশতাক বলছি। ওরা যা বলে, সেভাবে ওদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিন।" এরপর ডিআইজি প্রিজন অপারগ হয়ে রিসালদার মুসলেম উদ্দিন এবং সাথীদের ভেতরে যাবার অনুমতি দেন। এরপর ঘাতক দলটি জেলে ঢুকে সবাইকে তাজউদ্দিন সাহেব যে কক্ষে ছিলো, সেখানে জড়ো করেন এবং দ্রুততম সময়ে ব্রাশফায়ারে শেষ করে দেন। জেলহত্যা আসলে শুধুমাত্র একটি ঘটনা নয়। এটা অনেকটা একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে মিলে যায়।

একটি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য যা করতে হয়, খুনি মোশতাকের পাতলা কাঁধে সওয়ার হয়ে অপশক্তি দানব সেটাই করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১০০% আওয়ামী বাকশালীদের নিয়ে মোশতাকের মন্ত্রিসভা নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক বিতর্ক রয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে, রক্তে পা দিয়ে, লাশ ফেলে রেখেই ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেছিলেন, তাদের অনেকেই আবার পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন এবং মন্ত্রী সাংসদ টাইপের অনেক পদেই ছিলেন। তাদের একটা স্বাভাবিক অজুহাত ছিলো, বন্দুকের নলের সামনে তারা অসহায় হয়েই যা করার করেছেন

জাতীয় চার নেতা সবার সামনেই জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছেন, যে দেশের প্রশ্নে, আদর্শের প্রশ্নে মৃত্যুভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কিভাবে মৃত্যুকে জয় করা যায়। তাইতো বলা হয়, বীরের কখনও মৃত্যু নাই। তারা অমর।

লেখক: কবি ও প্রবন্ধিক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।