স্ট্রীট ফুড: বগুড়া

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ৪ মাঘ ১৪২৫

স্ট্রীট ফুড: বগুড়া

নটু আহমেদ ৩:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০১৮

স্ট্রীট ফুড: বগুড়া

কেউ যদি বগুড়া শহরে সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ঘুরতে বের হন আর সাতমাথায় যান, তাহলে দেখবেন সেখানে শত শত মানুষ গিজগিজ করছেন। শিক কাবাব, চটপটি, হালিমের মিশ্রিত গন্ধে আকাশ বাতাস মৌ মৌ করছে। কমপক্ষে পঞ্চাশটি দোকানে মজা করে শত শত নারী পুরুষ মহা উৎসবে খাওয়া দাওয়া করছেন। শিক কাবাব, চটপটি, ফুচকা, হালিম, মাল্টা চা, মরিচ চা, বিরিয়ানী, চপ, বার্গার, সেদ্ধ ডিম, ভুঁড়ি ভুনা, ফ্রায়েড চিকেন সহ হরেক রকমের ভাজাভুজি – কি নেই সেখানে?

এমন মুখরোচক খাবারের মেলা বাংলাদেশের অন্য কোনো শহরে বসে কিনা জানিনা। তবে বগুড়ায় গেলেন, অথচ সাতমাথার এই মেলায় গেলেন না, খেলেন না – তাহলে আপনার বগুড়া বেড়ানোটাই মাটি!

আগের দিনে রাস্তার পাশের খাদ্য (স্ট্রীট ফুড) বলতে বুঝাতো সাধারণতঃ চানাচুর, চীনাবাদাম/বুট/মটর ভাজা, কোথাও জিলাপি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, বা ঝুরি জাতীয় তেলে ভাজা খাবার আর হাটে বা মেলায় বিভিন্ন রকম খাজা, গজা, লই, কটকটি, চালের ঝুরি, মুড়ি মুড়কি। এছাড়া কখনো কোথাও ছোলা/বুট সেদ্ধ বা আচার এর দেখাও মিলত। আমাদের শৈশবের সেই দিন আর নেই। যুগ ও চাহিদার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে গেছে। তাই কালের পরিক্রমায় বগুড়ার সাতমাথা হয়ে গেছে স্ট্রীট ফুড এর স্থায়ী মেলা।

বগুড়া শহরে একসময় কিছু বিখ্যাত খাবারের দোকান ছিল। লম্বা পছন্দের তালিকায় প্রথমেই চলে আসবে সেই অবিস্মরণীয় ‘ঠাকুরের দোকান’ এর কথা। উত্তরা সিনেমা হলের উত্তর পাশের গলিতে ছিল সেই ‘উড়িয়া ঠাকুরের দোকান’। সন্ধ্যা হলেই শহরের যুবক থেকে মধ্যবয়সী মানুষদের মন আনচান করত। ঠাকুরের দোকান যেন চুম্বকের মতো তাদেরকে আকর্ষণ করত। সেখানকার খোলা রান্নাঘরের পাশে বেঞ্চিতে বসে কলাপাতায় করে তেঁতুলের টক দিয়ে আলুর চপ, পাঁঠার মাংসের কাটলেট, লুচি/পরোটার সাথে মজাদার ‘লাবড়া’(নিরামিশ) আর বিরিয়ানীর স্বাদ এখনও যেন মুখে লেগেই আছে। ঠাকুর তার বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে খালি গায়ে ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে থাকতেন। তাকে সহযোগিতা করতেন তার স্ত্রী। সেখানে বসে থেকেই হাঁক ডাক করে খবরদারী করতেন। স্বাধীনতার আগে বা ঠিক পরের সময়টাতে চার আনা (স্বাধীনতার আগে ছিল এক আনা) দামের আলুর চপ আমাদের বয়সীদের সাধ্যের মধ্যেই থাকত। পকেটে ২/৩ টাকা থাকলেই দুই তিনজন বন্ধু মিলে সন্ধ্যার নাশতা অনায়াসে হয়ে যেত। ঠাকুরের দোকানে খায়নি বা যায়নি, সেসময়ের এমন কোনো যুবক নিজকে বগুড়া শহরের বাসিন্দা দাবী করলে হয় সে অবোধ, নতুবা মিথ্যা কথা বলে।

ঠাকুরের দোকানের সঙ্গেই লাগোয়া ছিল ‘তৃপ্তি হোটেল’ এবং তার উত্তর পাশেই বিখ্যাত ‘আকবরিয়া হোটেল’। তৃপ্তি হোটেল খুব একটা বিখ্যাত বা আকর্ষণীয় ছিলনা, যদিও হোটেলের চেহারা প্রায় আকবরিয়ার মতই ছিল। বেশীর ভাগ মানুষের পছন্দের ছিল আকবরিয়া হোটেল। আকবরিয়া আগে এখনকার চেয়ে আয়তনে বেশ বড় ছিল। অনেকগুলো টেবিল। সবসময়ই হোটেলে ক্রেতাদের সরগরম ভিড় লেগে থাকতো। তখন আকবরিয়ার সব খাবারই বিশেষতঃ খাসীর বিরিয়ানী খুব সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ছিল। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন কোনভাবে পাঁচ আনা পয়সা যোগাড় করতে পারলেই আকবরিয়ায় গিয়ে কোয়ার্টার প্লেট বিরিয়ানী খেয়ে আসতাম। তখন এক প্লেট বিরিয়ানীর দাম ছিল এক টাকা চার আনা মাত্র। ঐ কোয়ার্টার প্লেট খেয়েই আঙ্গুল চাটতে থাকতাম। একমাত্র এ হোটেলটিই গভীর রাত পর্যন্ত খোলা পাওয়া যেত। বিশেষ করে বগুড়ায় যারা বহিরাগত মানুষ বিভিন্ন কাজে রাত্রিযাপন করতেন, তাদের জন্য আকবরিয়া ছিল পছন্দের গন্তব্য। আকবরিয়া হোটেলের মালিক হাজী আকবর হোসেন ছিলেন আমার বড় ফুপা। এ কারনে আকবরিয়া হোটেলকে একটু বেশী আপন মনে করি।

রেলওয়ে মাঠ (এখন যেখানে বড় একটা মসজিদ হয়েছে) তার দক্ষিণ পাশে সড়ক পরিবহন শ্রমিক সমিতির অফিসের সামনে প্রতি সন্ধ্যায় বিহারীরা শিক কাবাব তৈরি করতেন। তার স্বাদ ছিল অসাধারণ। দত্তবাড়ী এলাকায় অনেক বিহারী থাকতেন। তারাও প্রতি সন্ধ্যায় বিভিন্ন রকম শিক কাবাব, নিহারী (গরুর পায়ার স্যুপ) ও অন্যান্য মজাদার কাবাব এর দোকান বসাতেন রাস্তার পাশে। ঐ এলাকা কাবাবের সুগন্ধে তখন মৌ মৌ করত।

একজন মানুষের কথা আমার খুব মনে পড়ে। উনি বিহারী ছিলেন। বেঁটে খাটো একজন হাসিখুশী মানুষ। গলায় একটি বড় কাঁচের বাক্স ঝুলিয়ে ‘চাই গরম…গরমা গরম…গরমা গরম………’ হাঁক দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাবাব ও কাটলেট বিক্রি করতেন। তার সেই কাঁচের বাক্সের একপাশেই একটা ছোট্ট কয়লার চুলা লাগানো থাকতো। কেউ কাবাব চাইলে সঙ্গে সঙ্গে বাক্সে রাখা শিকে গাঁথা কাবাব বের করে সেই চুলায় হাতপাখা দিয়ে গরম করে কাগজে করে খেতে দিতেন। দামও ছিল কম। এক আনা, দুই আনা ও চার আনা, কাবাবের সাইজ অনুযায়ী দাম। আমরা তখন স্কুলের ছাত্র। আমি ঐ কাবাব কেনার জন্য পয়সা জমা করতাম।

আমার মনে হয়, আমাদের বাঙালী খাদ্য তালিকায় অনেক বৈচিত্র্য যোগ হয়েছে এই বিহারীদের কারনে। এসব কাবাব, বিরিয়ানী, চাপ বা নিহারী, এবং মাংসের বিভিন্ন মুখরোচক খাবার একমাত্র বিহারীরাই বানাতেন তখন। এছাড়াও বিহারীদের তৈরি বিভিন্ন মিষ্টি, হালুয়া ও ফিরনি খুবই মজাদার হতো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যখন বিহারী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো লতিফপুর কলোনিতে একত্রিত হন, তখন ধীরে ধীরে তারা সেখানেই ছোটখাট কাবাবের দোকান চালু করেন। তাই খাদ্যবিলাসী মানুষ বিশেষতঃ যুবাশ্রেণীর পছন্দের গন্তব্য হয়ে ওঠে সেই লতিফপুর কলোনি। সেখানে মুশ্তাক বিহারী তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে সন্ধ্যাবেলায় শিক কাবাব বিক্রি করতেন। আরও কয়েকটি দোকান খুব জমজমাট চলত। আমিও অনেক বার সপরিবারে গিয়েছি। আমার বাবা খুব কাবাব পছন্দ করতেন। তাই তাকেও সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে কাবাব খাইয়েছি।

সাতমাথায় মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল (বর্তমানের সপ্তপদী মার্কেট) এর দক্ষিণ পাশে ছিল ‘লক্ষী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত মিষ্টির দোকান দুটি ছিল বড়গোলায়। ‘অধরের দোকান’ আর ‘ব্যানারজীর দোকান’। এই দুটি দোকানের মিষ্টির স্বাদ এখনও ভুলিনি। অধরের দোকানে সকাল বেলার নাশতায় অসাধারন স্বাদের লুচি, রসগোল্লা ও নিরামিষ খেতে লোকে লাইন দিয়ে ভিড় করত।

থানা রোডে উত্তরা হলের কাছে (এখন যেখানে এশিয়া সুইট মিট) ছিল ‘বরোদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’। ঐ দোকানের সন্দেশ আর ‘ক্ষীর তকতি’ ছিল আমার প্রায় প্রতিদিনের পছন্দ। আকবরিয়া এবং বরোদায় বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের সান্ধ্যকালীন নিয়মিত আড্ডা হতো। আমরা বন্ধুরা মিলে মাঝে মাঝে সেখানে বসতাম। আকবরিয়ার শাহজাহান ভাই ও সিদ্দিক ভাই অসীম ধৈর্য নিয়ে আমাদের আড্ডা আর অত্যাচার সহ্য করতেন। বরোদায় অনেক মানুষের সঙ্গে নিয়মিত চায়ের আডডায় যোগ দিতেন আমাদের বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ‘দবির ওস্তাদ’।

সাতমাথার বাটার দোকানের দক্ষিণে ঠিক থানা রোড ও গাল্লাপট্টি রোডের সংযোগ স্থলে কোণাকুণি একটা মিষ্টির দোকান ছিল প্রায় ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। আমার কানা স্কুলের সহপাঠী অরুণদের দোকান ছিল সেটা। ওর বাবা আজীবন দোকানটি চালিয়েছেন। ঐ দোকানের সন্দেশও অসাধারণ ছিল।

বড়গোলায় ভাণ্ডারী বাড়ীর পশ্চিম পাশে (এখনকার ভুমি অফিস সংলগ্ন) একটা ছোট্ট দোকানে প্রতিদিন বিকেলে মাখন বাবু আলু ও বাদামের সিঙ্গারা তৈরি করতেন। তার স্বাদ আজ ষাট বছর পরেও আমার মুখে যেন লেগেই আছে। আমার জীবনে অত স্বাদের সিঙ্গারা আমি আর খাইনি। আমার মনে হয়, আমার মতো অন্যেরাও ঐ স্বাদ ভুলতে পারবেন না।

বলা বাহুল্য, এই সব দোকানই এখন বিলুপ্ত।

স্বাধীনতার আগে কী পরে ঠিক মনে নেই। উত্তরা সিনেমা হলের পশ্চিম করিডোরে একটা আধুনিক রেস্তরাঁ খুলেছিল। ‘মনোরা রেস্টুরেন্ট’। কিছুটা আধুনিক মেন্যু ও পরিবেশনা চালু করেছিলেন তারা। সেটিও পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে গেল। নিউমার্কেটে ঢোকার পথে স্বাধীনতার পর ‘শ্যামলী রেস্টুরেন্ট’ চালু হল।

তবে ‘রায় ভাজা’র কথা না বললে মহা অন্যায় হবে। বগুড়ার অনেক যুগের ঐতিহ্যবাহী চানাচুর ছিল এই ‘রায় ভাজা’। দারুণ স্বাদ আর মুখরোচক! সেসময় বাইরের জেলার কেউ বগুড়ায় গেলে ‘রায় ভাজা’ কিনতে কখনোই ভুল করতেন না। মেরিনা সিনেমা হলের পশ্চিম দেয়াল বরাবর একটা ছোট্ট দোকানে এই চানাচুর বিক্রি হতো। রেলওয়ে মাঠে আগে যখন শীতকালে বাৎসরিক বাণিজ্য মেলা বা প্রদর্শনী হতো, তখন অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘রায় ভাজা স্টল’ নিজের উপস্থিতির জানান দিত।

এভাবেই আমাদের উঠতি বয়সে বগুড়া শহরে জিভের স্বাদ বদল করতাম আমরা। করনেশন বা কানা স্কুলের ছাত্রদের কাছে যেমন বংশী কাকার বাদাম ভাজা, তেমনি জেলা স্কুলের ছাত্রদের কাছে কমল দা’র বাদাম ভাজার স্মৃতি অবস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন সাতমাথার এই স্ট্রীট ফুডের মেলাও হয়তো ভবিষ্যতে অনেকের মনে একটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে।

(ক্রমশঃ)

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।