ভুটানের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

ভুটানের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

আকমাল হোসাঈন ১২:০৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৮

ভুটানের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

প্রতিটি দেশের আলাদা বিশেষত্ব বা ব্র্যান্ড রয়েছে যার ফলে অন্য দেশগুলি দেশটির ব্যাপারে বিশেষভাবে জানে। উদাহরণস্বরূপ, কাতার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, মানুষ এটি জানে কারণ এটি এফসি বার্সেলোনা, স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব, কাতার এয়ারওয়েজ এবং আল জাজিরা টেলিভিশন নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষক। ভুটান এক্ষেত্রে  দেশটির বার্ষিক উৎপাদন পরিমাপের জন্য গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাকশন (জিডিপি) এর একটি বিকল্প পদ্ধতি গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিন্যান্স (জিএনএইচ) এর জন্য ব্যতিক্রম।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ভারত ও চীনের মধ্যে একটি ল্যান্ডলাকড এবং স্যান্ডউইচ দেশ ভুটান। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভুটান অন্য ছয় সদস্যসহ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতির (সার্ক) প্রতিষ্ঠাতা দেশ। কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবের কারণে আমরা ভুটানের ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৄতির ব্যাপারে সামান্যই কিছু জানি।

১৮৬৫ সালে 'দুয়ার' যুদ্ধে বিজয় লাভের পর ব্রিটেন তার ভৌগোলিক শাসনে ভুটানকে সংযুক্ত করে এবং তারপর ব্রিটিশ সরকার ও ভুটানের মধ্যে সিনচুলু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় ভুটান ব্রিটিশ ভারতে জমি চাষের বিনিময়ে বার্ষিক ভর্তুকি পাবে এটা নির্ধারিত হয়। উইয়েন ওয়াংচুক - যিনি ক্রমবর্ধমান ঐক্যবদ্ধ ভুটানের প্রকৃত শাসক হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক উন্নত করেছিলেন – ফলে ১৯০৭ সালে তাকে রাজা করা হয়েছিল।

তিন বছর পর, ১৯১০ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে ব্রিটিশরা ভুটানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে রাজি হয় এবং ভুটান ব্রিটেনকে তার পররাষ্ট্র বিষয়ক নির্দেশনা দেওয়ার অনুমতি দেয়। অবশেষে, নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া আধুনিকীকরণের অধীনে এবং ১৯৫০ দশকের প্রথম দিকে ভুটান একটি স্বাধীন পতাকা অর্জন করে এবং ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে যোগ দেয়ার মধ্যদিয়ে তার দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে বহির্বিশ্বে পদার্পণ করে।

ভুটান বিশ্বের বিরল দেশগুলির মধ্যে অন্যতম, যা দেশ ও বিদেশের কোনো প্রকৃত চাপ ছাড়াই গণতন্ত্র প্রবর্তন করে। ১৯০৭ সাল থেকে ভুটান ওয়াংচুক রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়। ১৯৬০ এর দশকে আধুনিকীকরণের ধীর প্রক্রিয়া দ্বারা শুরু হয় গণতন্ত্রের পথে চলা। ২০০৮ সালে সংবিধান গঠন ও একই বছরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ভুটান তার দীর্ঘ শতাব্দী প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র থেকে এটি একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্থানান্তরিত হয়।

২০১৩ সালে ভুটান তার দ্বিতীয় জাতীয় নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও ন্যায্য ভিত্তিতে ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে ভুটান এক শাসন থেকে আরেকটি ক্ষমতা হস্তান্তর করার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ধরে রাখে। ২০১৮ ভুটানের জন্য একটি ভাল বছর, কারণ এটি একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করার জন্য আরেকটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

যদি মুক্ত, ন্যায্য ও নিয়মিত নির্বাচন উদার গণতন্ত্রের ভিত্তি হয় তবে আমরা ভুটানকে সহজে এগিয়ে যেতে বলতে পারি। কিন্তু শুধু মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উদার গণতন্ত্রের জন্য সবকিছু নয়। সার্বজনীন মানবাধিকার, প্রেস স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পত্তির অধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, ভোটের ব্যবস্থায় নাগরিক অংশগ্রহণ এবং ভয় ছাড়া ভোট প্রদান উদার গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ।

অন্যান্য অনেক গণতন্ত্রের পাশাপাশি, ভুটানের গণতন্ত্র ভুলের উর্ধে নয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংসদে কম মহিলা প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের একটি ছোট সংখ্যা এবং ভুটানের প্রকৃত সমস্যাগুলির প্রতি উদাসীনতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং রাজনীতির থেকে ধর্মীয় নেতাদের বঞ্চিত করা, শরণার্থী সমস্যা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার মনে হয়, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ হ্রাস পাওয়া ভুটানের গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ভুটানের গণতন্ত্রের পক্ষে সর্বাধিক চ্যালেঞ্জ ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের ভোট প্রদান ছিল ৮০ শতাংশ এবং ডিপিটি পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ভুটানের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করেছিল। ৮০ শতাংশ ভোটারের ভোট প্রদান অনেক প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের চেয়েও বেশি, এমনকি আমেরিকার চেয়েও। তার মানে ভুটানের মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহী। পষ্টতই, ভুটানের গণতন্ত্রের জন্য এটা ভালো খবর ছিল।

কিন্তু ২০১৩ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বদলে ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা ভুটানের গণতন্ত্রের জন্য ছিল লাল সংকেত। এটা ভুটানের গণতন্ত্রের জন্য ছিল একটি নেতিবাচক বার্তা। এর একটা কারণ হতে পারে এই যে, ভুটানীরা এখনও রাজতন্ত্রের প্রতি অনুগত এবং অজ্ঞতাবশত, বিশেষত নাগরিক শিক্ষার অভাবের কারণ।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভুটানের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত অস্থায়ী ফলাফল অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বাম ড্রুক নিমরূপ টিশোগা (ডিএনটি), যা ২০১৩ সালে গঠিত হয়েছিল, ৪৭ জাতীয় সংসদ আসনে ৩০ টি আসন লাভ করে বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে ভোট প্রদানে হার ছিল ৫০ শতাংশ,  এর মধ্যে ৫২.৬ শতাংশ মহিলা এবং ৪৫.৪ শতাংশ পুরুষ ভোটার।

তুলনামূলকভাবে তৃতীয় জাতীয় নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার সর্বনিম্ন ছিল। এটা স্পষ্টতই বিশ্বের নতুন গণতন্ত্রের জন্য ভাল খবর নয়। এটা নির্বাচনে এক ব্যক্তির জন্য এক ভোটের পদ্ধতির বিরুদ্ধে, যা গণতন্ত্রের ভোটাধিকার ব্যবস্থার সার্বজনীন বিষয় বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।

অবশেষে বলা যেতে পারে যে গণতন্ত্রের পথ মসৃণ নয় এবং একটি নতুন গণতন্ত্র হিসাবে ভুটানের গণতন্ত্রকে টেকসই করতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নীতির উপর বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। এ ছাড়াও গণতন্ত্রের মসৃণ পথের জন্য নাগরিক শিক্ষা ও গণতন্ত্র সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভুটানের জন্য কি এটা সম্ভব হবে? ভুটানের গণতন্ত্রের ভাগ্য দেখার জন্য আমাদের দুই বা তিন দশক অপেক্ষা করতে হবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।