মোশাররফ করিমের ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ ও কিছু পর্যালোচনা

ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৫

মোশাররফ করিমের ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ ও কিছু পর্যালোচনা

উম্মু মুসা’ব ৭:৫১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৮

print
মোশাররফ করিমের ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ ও কিছু পর্যালোচনা

সম্প্রতি একটি টিভি অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় টিভি অভিনেতা মোশাররফ করিমের মেয়েদের পোশাক সম্পর্কিত কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিতর্কের ঝড় উঠে। পরবর্তীতে, মোশাররফ করিম তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে বলে দুঃখপ্রকাশ করে তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।

উক্ত অনুষ্ঠানে মোশাররফ করিম বলতে চেয়েছেন যে, চলমান নারী ও শিশু নির্যাতনে মেয়েদের পোশাক আসলে কোনো ভূমিকা পালন করে না এবং মেয়েরা চাইলেই তাদের ইচ্ছামত পোশাক পরতে পারে। নারী নির্যাতন রোধে তিনি বলেছেন, সমস্যাটা নারীদের কাপড়ে নয়, বরং চলুন আমরা ‘শ্লীল হয়ে উঠি এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতে শিখি, সেটা না শিখলে আমি আসলে পুরুষ হয়ে উঠবো না’। এছাড়া, তিনি প্রশ্ন করেছেন, পোশাকই যদি সমস্যা হয়, তাহলে ‘সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব আমরা কিংবা যিনি বোরখা পরে ছিলেন, তার ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব?’ তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘কোন যুক্তি আছে?’ আমরা বলতে চাই, অবশ্যই যুক্তি আছে।

আমি প্রথমেই মোশাররফ করিমের ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ কিংবা ‘পুরুষ হয়ে উঠা’ নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ কিংবা ‘পুরুষ হয়ে উঠা’র সংজ্ঞা আসলে কী? যেহেতু তিনি অভিনয় জগতের মানুষ, তাই আমি ধরে নেব তার মতো যারা সংস্কৃতিমনা (গোঁড়া ধার্মিক নয়) এবং ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’য় বিশ্বাসী (ধর্মীয় অনুশাসনে বিশ্বাসী নয়), তারা অবশ্যই উনার কাছে ‘শ্লীল’ সম্প্রদায়ের মানুষ।

তাহলে, প্রশ্ন করতে চাই, কেন এই ‘শ্লীল’ সম্প্রদায়ের গুরু হলিউড তারকাদের বিরুদ্ধে, হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী কিংবা হলিউডের প্রোডাকশন হাউজগুলোতে কর্মরত নারীদের যৌন নির্যাতনের কুৎসিত অভিযোগ উঠে?

কেন যৌন কেলেঙ্কারি রুখতে পৃথিবী জুড়ে #MeToo মুভমেন্টের প্রয়োজন হয়? উল্লেখ্য যে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠার এই মুভমেন্টে গত দশ বছরে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৭৭ লক্ষ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ এনেছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামকরা অভিনেত্রী ও খ্যাতনামা নারীরা রয়েছেন।

গত অক্টোবর মাসে অস্কারজয়ী নির্মাতা হার্ভি ওয়েস্টাইনের বিরুদ্ধে হলিউডের অনেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী থেকে শুরু করে উঠতি মডেলরা যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। এদের মধ্যে অনেকে হার্ভির দ্বারা নির্যাতিত হবার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হলিউডের তারকা কেভিন স্পেসি, ‘ক্রেমার ভার্সেস ক্রেমার’ বিখ্যাত তারকা ডাস্টিন হফম্যান, ‘এক্সম্যান’ সিরিজের পরিচালক ব্রিট র্যা টনার, বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা অ্যান্ডি ডিক, বিখ্যাত প্রযোজক জেমস টোব্যাকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে।

তবে কি আমরা ধরে নেব যে, এই সমস্ত জগত বিখ্যাত তারকা ও প্রযোজকেরা মোশাররফ করিমের ভাষায় এখনও ‘শ্লীল’ কিংবা ‘পুরুষ’ হয়ে উঠেনি অথবা, ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’য় বিশ্বাস করতে শেখেনি?

প্রখ্যাত ফিল্ম ক্রিটিক পিটার কিওগ হলিউড সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটা এমন একটি শহর যেখানে খ্যাতি আর সৌভাগ্যের জন্য সবাই শরীর আর আত্মাকে বিক্রি করে। আর, এখানে সবাই, বিশেষ করে নারীরা পণ্য হিসাবে বিবেচিত হয়।’

এছাড়া, হলিউড মুভি নির্মাতা ক্রিস হ্যানলে দাবি করেন, তার (নির্মিত) ২৪টি সিনেমার প্রায় সবগুলোতেই প্রতিটি মূল অভিনেত্রীকে সিনেমার পরিচালক, প্রযোজক কিংবা প্রধান অভিনেতার সাথে বিছানায় যেতে হয়েছে।’

বিখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী গোয়াইনেথ কেট প্যালট্রো বলেন, তার অভিনয় জীবনের শুরুতে তাকে এক সিনেমার নির্মাতা বলেছিল, (সিনেমা জগতে) প্রতিটি বিজনেস মিটিংয়ের সমাপ্তি ঘটে ‘শোবার ঘরে’। আরেক বিখ্যাত অভিনত্রী জেন ফন্ডা বলেছেন, বিছানায় যেতে অস্বীকার করার কারণে তাকে একবার তার বস বহিষ্কার করেছিল।

শুধু মার্কিন মুলুকে নয়, সম্প্রতি ব্রিটেনেও কর্মস্থলে নারীদের উপর যৌন হয়রানি বন্ধে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ১৯০ জন ব্রিটিশ অভিনেত্রী। এদের মধ্যে আছেন এমা থম্পসন, কেইরা নাইটলি এবং এমা ওয়াটসনের মতো নামকরা তারকারা।

এছাড়া হলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক, পরিচালক এবং অভিনেতাদের পথ অনুসরণ করে, বলিউড, ঢালিউড, কিংবা এদেশের মিডিয়াজগতের তথাকথিত ‘শ্লীল’ সমাজে কী হয় এবং কিভাবে এখানে খ্যাতির স্বপ্নে বিভোর নারীদের খ্যাতি আর সৌভাগ্যের মুলা ঝুলিয়ে তাদের নিরেট ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়, একথা কিন্তু মোশাররফ করিমসহ মিডিয়া জগতের কারোরই অজানা নয়!!!

হার্ভে ওয়েস্টাইনের কেলেঙ্কারির পর বলিউডের নামকরা অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, ‘ওয়েস্টাইন কোনো ব্যক্তি নয় এবং সে শুধু হলিউডেই নেই। বরং, সে সব জায়গাতেই আছে।’ একথার মাধ্যমে তিনি আকারে ইঙ্গিতে ভারতের মিডিয়াজগতের বাস্তবতা সবাইকে বুঝিয়ে দেন।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল ফারহানা শাহরিন ফারিয়াও সম্প্রতি তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে মিডিয়াজগতে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, মিডিয়াজগতে কাজ করতে হলে অনেক ‘সেক্রিফাইস’ করতে হয় এবং বলেন যে, কাজ পেতে তাকে কারো কারো সাথে ‘ব্যক্তিগত সম্পর্ক’ তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে; প্রতিবাদ করায় তাকে অনেক বড় বড় কাজ হারাতেও হয়েছে।

সুতরাং, এটা পরিষ্কার যে, মিডিয়াজগতে নারীকে হয় বিতর্কিত ‘কাস্টিং কাউচে’ তার সম্মান ও মর্যাদাকে সেক্রিফাইস করে খ্যাতির সিঁড়িতে পা রাখতে হয়; আর, তা না হলে তার তথাকথিত খ্যাতিমান জীবনকে সেক্রিফাইস করতে হয়। এটাই এই পৃথিবীর মিডিয়া জগতের বাস্তবতা।

সুতরাং, মিডিয়া জগতের ধারক ও বাহক মোশাররফ করিমের মুখে অন্তত ‘শ্লীল হয়ে উঠা’ কিংবা ‘পুরুষ হয়ে উঠা’ সম্পর্কিত কোনো উপদেশ আসলে মানায় না।

এবার আমি আসবো মোশাররফ করিমের দ্বিতীয় প্রশ্নে। তিনি প্রশ্ন করেছেন, যদি পোশাকই সমস্যা হয় ‘সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব আমরা’ কিংবা ‘যিনি বোরখা পরে ছিলেন, তার ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব’?

তার এ প্রশ্নের উত্তরে আমি বলতে চাই- যে সমাজে একটি তুচ্ছ নিত্য ব্যবহার্য জিনিস বিকিকিনি করতে স্বল্পবসনা নারীদেহের প্রয়োজন হয়, যে সমাজে অবাধ মেলামেশাকে উৎসাহিত করে নারীকে লোলুপ আর লম্পট পুরুষের জন্য সহজলভ্য করা হয়, যে সমাজে পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল সিনে ম্যাগাজিন, রগরগে উপন্যাস, নাটক, সিনেমা কিংবা রেডিও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারীর সম্মানকে ধূলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়, যে সমাজে শুধুমাত্র ব্যাপক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে ‘ফ্যাশন শো’ কিংবা ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতা’ নামক বিকৃত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে লক্ষ-কোটি পুরুষের সামনে স্বল্পবসনা নারীকে হাটের গরুর মতো উপস্থাপিত করা হয়, যে সমাজে যুগের পর যুগ ধরে ঘটতে থাকা লক্ষ লক্ষ নারী ও শিশু নির্যাতনের কোনো বিচার হয় না, দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদের পরেও তনু, শাজনীন কিংবা ইয়াসমিনদের মতো নির্মমভাবে ধর্ষিত হয়ে নিহত হওয়া নারীদের বিচারের নামে শুধু প্রহসন হয়, সেই সমাজে সাত বছর কিংবা এর থেকেও কমবয়সী কন্যাশিশুটি নিরাপদ থাকবে না এটাই তো স্বাভাবিক; সেই সমাজে বোরখা পরিহিত কিংবা ঘরের ভেতরে বসে থাকা নারীটিও নিরাপদ থাকবে না এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল ম্যাগাজিন, রগরগে সিনেমা বা নাটক, ফ্যাশন শো কিংবা সুন্দরী প্রতিযোগিতা যে লম্পট পুরুষটির কৃপ্রবৃত্তিকে উস্কে দেয়, সেই পুরুষটি কিন্তু তার প্রবৃত্তিপূরণে সিনেমার নায়িকা, পর্নতারকা কিংবা র্যা ম্প মডেলদের হাতের কাছে পায় না, হাতের কাছে পায় ওই সাত বছরের অবুঝ শিশুটিকে কিংবা তার অধীনস্থ কাজের মেয়ে, নারী কর্মচারী, অথবা বোরখা পরিহিতা ওই মেয়েটিকে। সুতরাং, তারা দোষী না হলেও সমাজে অবাধে নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা প্রচার প্রসারের শাস্তি তাদেরকেই পেতে হয়।

ভারতের মতো একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ কেন ধর্ষকের দেশ বলে খ্যাত হয় বলতে পারবেন? কেন সে দেশে চলন্ত বাসে আধুনিকা নারী কিংবা ঘরের নিরাপদ আঙিনায় আট মাসের কন্যাশিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়? হিন্দু অধ্যুষিত সে দেশে তো নারীদের যেমন খুশি তেমন পোশাক পরার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তারপরেও কেন সেদেশে আধুনিকা শিক্ষিতা নারী থেকে অবুঝ শিশুটি পর্যন্ত নিরাপদ নয়? কারণ, নির্লজ্জতা আর অশ্লীলতা প্রচার প্রসারে ভারত পশ্চিমা বিশ্বকেও হার মানিয়েছে। তাই, তাদের অবুঝ শিশু আর সাধারণ নারীরা এখন এর বিষাক্ত ফলাফল উপভোগ করছে।

এছাড়া, যে ব্যক্তি স্বাধীনতার জয়গান আপনি গাইছেন, তা এমন একটি বিষাক্ত মূল্যবোধ যা মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা দেয়, মানুষকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় এবং তাকে ভয়ঙ্করভাবে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে। সমাজে কোনো ব্যক্তি যদি যা খুখি তাই করার জন্য স্বাধীন হয়, তাহলে মনে রাখবেন সে নারীকে খুন করার জন্য স্বাধীন, তাকে রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে কিংবা অফিসে-আদালতে যৌন হয়রানি কিংবা ইভটিজিং করার জন্যও স্বাধীন। নারীকে সুযোগ পেলে পরিমল কিংবা সেঞ্চুরি মানিকের মতো যত্রতত্র ধর্ষণ করার জন্যও স্বাধীন এবং সর্বোপরি, নারীর শরীর নিয়ে কুৎসিত বাণিজ্য করার জন্যও স্বাধীন। আর এজন্যই এদেশসহ সমগ্র পৃথিবীব্যাপী নারী নির্যাতন বিরোধী একের পর এক কঠোর আইন প্রণয়ণ করেও নারী নির্যাতন বন্ধ করা যাচ্ছে না; বরং, উপর্যুপরি তা বেড়েই চলছে।

ওর্য়াল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (হু) এর ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এই পৃথিবীতে বর্তমানে প্রতি তিনজনে একজন নারী শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি কিংবা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আর, যে দশটি দেশ নারী ধর্ষণে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে, এদের মধ্যে আছে সুইডেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা এবং ভারত। আর ধর্ষণে শীর্ষ খেতাব অর্জন করেছে এ পৃথিবীর বর্তমান সুপার পাওয়ার ও তথাকথিত নারী স্বাধীনতার ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্র।

আর নারীর পোশাকের বিষয়ে বলতে চাই যে, নারীরা অবশ্যই যা খুশি তাই পরিধান করতে পারে না। কারণ, মুসলিম নারী হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর অসীম জ্ঞান থেকে নারীদের জন্য যা সবচাইতে কল্যাণকর, সেটাকেই নারীদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর মুসলিম নারীদের পোশাকও এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে বলেন, ‘(হে রাসুল) আপনি ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে, তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে এবং তাদের সৌন্দর্য্য প্রদর্শন না করে।’ [সুরা নূর: ৩১]

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও ঈমানদার নারীদের বলুন যে, তারা যেন তাদের জিলবাবকে (বোরখা বা পুরো শরীর আচ্ছাদিত করার জন্য চাদর) তাদের উপর ঝুলিয়ে দেয়। এতে তাদেরকে (সম্মানিত নারী) হিসেবে চেনা যাবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।‘ [সুরা আহযাব: ৫৯]

এছাড়া, খোলামেলা ও উত্তেজক পোশাক যে নারীর সম্মানহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় তা অনস্বীকার্য এবং সেইসঙ্গে এটি সমাজে নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ও সমাজে তাদের মাঝে সুস্থ সম্পর্ককেও ব্যাহত করে। ‘অবজেক্টিফাইয়িং মিডিয়া: দেয়্যার এফেক্ট অন জেনডার রোল নর্মস অ্যান্ড সেক্সুয়্যাল হ্যারাসমেন্ট অব ওম্যান’ নামক গবেষণা ভিত্তিক এক রচনায় পুরুষদের উপর চালানো দুটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। দুটি গবেষণাতেই তিন ধরনের পুরুষের উপর গবেষণা করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রথম দলের পুরুষরা সেইসব টিভি সিরিয়াল দেখে অভ্যস্ত যেখানে নারীকে নিরেট ‘সেক্সুয়্যাল অবজেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। (অর্থাৎ, নারীদেহকে খোলামেলাভাবে উপস্থাপনা করা হয়)। দ্বিতীয় দল হলো- যারা নারীকে প্রোফেশনাল ভূমিকায় দেখে অভ্যস্ত। তৃতীয় দলটি হল, যারা এমন সিরিয়াল দেখে অভ্যস্ত যেখানে নারীকে দেখানোই হয় না। যেমন: ন্যাচার রিলেটেড ডকুমেন্টরি। গবেষণার প্রথম ফলাফল বলছে, যে সমস্ত পুরুষরা নারীকে ‘সেক্সুয়্যাল অবজেক্ট’ হিসেবে দেখে অভ্যস্ত, অন্য দুটি দলের চাইতে নারীর প্রতি তাদের যৌন নির্যাতনমূলক আচরণ এবং নারীকে হয়রানি করার প্রবণতা বেশি থাকে। আর দ্বিতীয় গবেষণার ফলাফল বলছে, নারীকে প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমগুলোতে ‘সেক্সুয়্যাল অবজেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরা পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গ বৈষম্যমূলক আচরণকে বৃদ্ধি করে। গবেষকরা আরো জানায়, এই দুটি গবেষণার ফলাফল একত্রিত করলে, এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, গণমাধ্যমগুলোতে নারীকে প্রতিনিয়ত যেভাবে তুলে ধরা হয়, তা প্রকৃতঅর্থে নারীর প্রতি (যৌন) হয়রানিমূলক আচরণকে উদ্দীপ্ত করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

সুতরাং, শিয়াল যেমন মুরগীর স্বাধীনতা চায়, তেমনি সমাজের একদল লোলুপ পুরুষ ব্যক্তি স্বাধীনতার ছদ্মাবরণে নারীকে খোলামেলা পোশাক পরিধান করাতে চায় যা পরবর্তীতে নারীদেরকে ওই সমস্ত লোলুপ পুরুষের অসহায় শিকারে পরিণত করে।

তবে মোশাররফ করিম, আপনার একটি কথার সাথে আমি একমত পোষণ করি, আর তা হল, শুধু পোশাক পরিবর্তন করলে হবে না। বস্তুতঃ নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আর, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই ইসলামী অনুশাসন ও মূল্যবোধের কাছেই ফিরে আসতে হবে। কারণ, একমাত্র ইসলামী অনুশাসন ও মূল্যবোধই সমাজে নারীর প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে এবং নারী নির্যাতনের প্রতিটি পথকে চিরতরে বন্ধ করে।

সংক্ষেপে বললে বলা যায়, প্রথমত: ইসলাম নারীকে পণ্য নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে। দ্বিতীয়ত: নারীর প্রতি সমাজে সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ইসলাম নারীর সৌন্দর্য্য ও দেহকে কেন্দ্র সকল প্রকার বাণিজ্য বন্ধ করে। তৃতীয়ত: নারীর সম্মান রক্ষার্থে ইসলাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করে এবং নারীর জন্য সম্মানজনক পোশাক নির্ধারণ করে।

বস্তুতঃ আধুনিক বস্তুবাদী সভ্যতা যেখানে নারীকে বেচাকেনার পণ্যে পরিণত করে তার সম্মান ও মর্যাদা ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, ইসলাম সেখানে আস্তাকুঁড় থেকে তুলে এনে নারীকে রানীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এই দুনিয়ার মধ্যবর্তী সকল কিছুই রিজিক। আর, সবচাইতে উত্তম রিজিক হচ্ছে একজন নেককার নারী’। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৬৭)

পুঁজিবাদ যেখানে নারীকে তার দৈহিক সৌন্দর্য্যের মাপকাঠিতে বিচার করেছে, ইসলাম সেখানে নারীকে তার মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে বিচার করেছে। তাইতো, হাজার বছরের ইসলামের ইতিহাসে অগণিত নারীরা একটি নারীবান্ধব নিরাপদ পরিবেশে পুরুষের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় কাজ করেছে এবং হাজার হাজার মুসলিম নারী তাদের মেধা, মনন আর সৃজনশীলতা দিয়ে ইসলামের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে, যাদের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে।

এছাড়া, নারীকে কোনো প্রকার যৌন নির্যাতন করা তো বহুদূরের কথা, সচ্চরিত্র ঈমানদার নারীর উপর অপবাদ আরোপ করাকেও ইসলাম ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। আল্লাহ বলেন,
‘আর যারা সচ্চরিত্র নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে; অতঃপর চারজন সাক্ষী হাজির করে না, তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। আর, এরাই হল ফাসিক।’ [সুরা নূর: ৪]

এছাড়া মোশাররফ করিমের বক্তব্য অনুযায়ী ইসলামের প্রখ্যাত স্কলার ইমাম গাজ্জালীর (রহ.)উপদেশ আমাদের নিজ নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করতে হলেও আমাদের ইসলামী অনুশাসনের কাছেই ফিরে যেতে হবে। ইসলামকে বিবর্জিত করে ইমাম গাজ্জালীকে অনুসরণ করা যাবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, মোশাররফ করিম ও তার মতো এদেশের তথাকথিত সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গের ভালো লাগুক বা নাই লাগুক- একমাত্র ইসলামী মূল্যবোধ ও অনুশাসনই সমাজের মানুষকে প্রকৃতঅর্থে ‘শ্লীল হয়ে উঠতে’ শেখায় কিংবা পুরুষদের শেখায় সত্যিকার ‘পুরুষ হয়ে উঠতে’। সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে তৈরি করে একটি সুস্থ ও সুন্দর সম্পর্ক এবং সর্বোপরি, ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিবর্তে সমাজের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত করে, চিরতরে বন্ধ করে নারী নির্যাতনের সকল পথ।

তথ্যসূত্র:
১. http://journals.sagepub.com/doi/abs/10.1177/0361684313515185
২.https://metoomvmt.org
৩.http://www.pbd.news/selected/33225/
৪.http://www.bd-pratidin.com/entertainment/2018/02/18/307525
৫.https://www.globalresearch.ca/longstanding-sexual-abuse-in-hollywood/5613474
৬.https://www.thedailystar.net/bangla/anandadhara/পেপার-কাটিং/বলিউডে-যৌন-হয়রানি-নিয়ে-প্রিয়াংকা-চোপড়ার-অভিযোগ-84958
৭.https://www.geopolitica.ru/en/389-top-10-countries-with-highest-rape-crime.html
৮.http://www.who.int/mediacentre/factsheets/fs239/en/

লেখক: উম্মু মুসা’ব
স্থপতি ও গবেষক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.



আলোচিত সংবাদ