নরসিংদীতে শহীদদের গণকবর সংরক্ষণ আজও হয়নি (ভিডিও)

লক্ষন বর্মন, নরসিংদী / ১২:০৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২,২০১৭

আশ্বাসে আশ্বাসে কেটে গেছে এক যুগ। আশ্বাস, বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও নরসিংদীতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবরগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকার। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে জেলার ২২ গণকবর। কোথাও কোথাও দখল হয়ে গেছে গণকবর।

গেল নয় বছরে পর পর ৩ জন জেলা প্রশাসক গণকবর রক্ষায় নকশা ও ভিতিপ্রস্তর স্থাপন করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই ক্ষুব্ধ দেশের সূর্য সন্তানরা।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর মুক্ত হয় নরসিংদী জেলা। ওই সময় জেলার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকবাহিনী। নরসিংদীতে ২৭ জন, পলাশে ১১ জন, শিবপুরে ১৩ জন, রায়পুরায় ৩৭ জন, বেলাবতে ১৬ জন ও মনোহরদীতে ১২ জনসহ মোট ১১৬ জন বীর সন্তান শহীদ হন। হত্যাযজ্ঞে নিহতদের বিভিন্ন স্থানে দেয়া হয় গণকবর।

নরসিংদী মুক্ত হওয়ার আগে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এমন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হল— নরসিংদীর বাগবাড়ি, পালবাড়ি, গণেরগাঁও, আলগী, মাধবদী, পাঁচদোনা, পলাশের চরণগরদী, চরসিন্দুর, বরাব, রাবান, জিনারদী রেলওয়ে স্টেশন, ডাঙ্গা বাজার, রায়পুরার মুছাপুর, হাটুভাঙ্গা, মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশন। বেলাবরের নারায়ণপুর, উজিলাব, আমলাব, জয়মঙ্গল বাজার, শিবপুরের ইটাখোলা, পুটিয়া ও বংশিরদিয়া, মনোহরদীর হাতিরদিয়া বাজার, রামপুর ও ড্রেনের ঘাট।

যুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা শহীদ হয়েছেন তারা হলেন— গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, অধ্যাপক সরোজ কুমার অধিকারী, ডা: সাদত আলী, মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, অধ্যাপক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, অধ্যাপক রাধা গোবিন্দ সাহা প্রমুখ।

সরেজমিনের ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচদোনা ব্রিজ, শিলমান্দী মাছিমপুর বিল, খাটেহারা ব্রিজ, মাধবদীর আলগী তারণী ভূঁইয়া বাড়ি, মনোহরদীর ব্র‏হ্মপুত্র নদের তীর, শিবপুরে ঘাসিরদিয়া, বেলাব আড়িয়াল খাঁ নদীর পাশে, রায়পুরা মেথিকান্দা রেল স্টেশনের গণকবরসহ ছোট-বড় প্রায় ২০টি গণকবর সেই নৃশংসতার সাক্ষী বহন করছে।

কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও গণকবরগুলো রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হলেও সম্পন্ন হয়নি। কেবল ভিত্তিপ্রস্তরেই থমকে আছে সেই উদ্যোগ।

কোথাও কোথাও গণকবরগুলো হয়ে উঠেছে ময়লা আবর্জনার স্তুপ, কোথাও হয়েছে বেদখল, কোথাও হচ্ছে অবমাননা। তাই এই বিজয়ের মাসে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত করতে জেলার সকল মুক্তিযুদ্ধের স্থানসহ গণকবরগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ জরুরী বলে মনে করছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তা না হলে আগামী বেশ কয়েক বছর পর মুক্তিযুদ্ধের শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকুও রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন তারা।

মুক্তিযোদ্ধা পবিত্র রঞ্জন দাস বলেন, নরসিংদী সদর উপজেলার সবচেয়ে বড় গণকবর পাচঁদোনায়। পাচঁদোনা ব্রিজ সংলগ্ন ৭১’ পাক সেনাদের ক্যাম্প ছিল, এখান থেকে বিভিন্ন এলাকার যুবক-যুবতী গরু-ছাগলদের ধরে নিয়ে আসত। যুবতীদের ধর্ষণ ও যুবকদেরকে হত্যা করে এখানের গণকবর দিত।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর আমরা এখান থেকে শত শত কঙ্কাল পেয়েছি। এখনও মাটির নিচে শত শত লাশের কঙ্কাল আছে। এটি যে গণকবর তা বুঝার কোনো উপায় নেই। এই গণকবরের স্মৃতি ফলকটি হওয়া দীর্ঘ দিনের দাবি। কিন্তু গণকবর গণকবরই রয়ে গেল একটু চিহ্নটুকুও নেই।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ বলেন, অত্যন্ত দু:খের বিষয় নরসিংদী জেলার মধ্যে যে বধ্যভূমিগুলো আছে প্রত্যেকটি বেদখল হয়ে গেছে। আমি অনুরোধ করব প্রসাশনের মাধ্যমে যেন এই বধ্যভূমিকে চিহ্নিত করে সংস্কার করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক বলেন, ৭১’ আলগী গ্রামে তারণী ভূঁইয়ার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। ৭১’এর ১৬ অক্টোবর রাতে পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকার আব্দুর রশীদের সহযোগিতায় তারিণীর বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। ৬ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে ও বেয়নেটের আঘাতে আরো ৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে কাঁঠাল গাছে ঝুলিয়ে রাখে। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ভবনটি অতি জরুরী সংস্কার করা দরকার।

মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বলেন, নরসিংদীতে যতগুলো গণকবর আছে সবগুলো গণকবরকে সংস্কার করা দরকার। বর্তমান স্বাধীনতার পক্ষের সরকারের কাছে আবেদন যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন, সে সব শহীদের স্মৃতি ধরে রাখা দরকার।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল মোতালিব পাঠান বলেন, বিগত সময়ে সম্মুখ মুক্তিযুদ্ধের স্থান ও গণকবরগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা ৬ উপজেলার ৬টি স্থান চিহ্নিত করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আমার বিশ্বাস বর্তমান সরকারের সময়ে সকল বধ্যভূমিগুলো সংস্কার করা হবে।

নরসিংদী জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গণকবরগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের প্রকল্পের পাশাপাশি জেলা প্রসাশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাচঁদোনাতে জেলা প্রসাশনের তরফ থেকে ৩০ শতাংশ জমি দেওয়া হয়েছে। এখানে সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন হবে, একই সাথে আমাদের নিজেস্ব অর্থায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভ হবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, এমন করে সবগুলো উপজেলাতে যে গণকবরগুলো অবহেলিত অবস্থায় আছে সেগুলো সংরক্ষণ করা হবে। আগামী ২ বছরের মধ্যে এগুলো সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে বলে আশাবাদী তিনি।

এলবি/এসবি

নিজটির লিঙ্ক : http://www.poriborton.com/dhaka/90946

প্রধান সম্পাদক : মোঃ আহসান হাবীব

Poriborton
Bashati Horizon, Apartment # 9-A, House # 21, Road # 17,Banani, Dhaka 1213 BD
Phone: +88 029821191, +88 01779284699
Website: http://www.poriborton.com
Email: report@poriborton.com
            editor@poriborton.com