কাঁধে অস্ত্র হাতে ক্যামেরা নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন হারুন হাবীব

শওকত জামান,জামালপুর / ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৯,২০১৭

কাঁধে অস্ত্র, হাতে কলম, টেপ রেকর্ডার ও ক্যামেরা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন হারুন হাবীব। একদিকে অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে রণাঙ্গনের দুর্লভ ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছেন তিনি। স্বশস্ত্র যুদ্ধের সাথে ছিলেন রণাঙ্গনের সাংবাদিক। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে হারুন হাবীব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্স শেষবর্ষের ছাত্র থাকাকালীন স্বাধীনতার দাবীতে উত্তাল ঢাকার রাজপথে মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। ৭ মার্চের জনসভায় যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উজ্জ্বিবিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে সেদিনকার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের র্শীষ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যার যার এলাকায় তরুণ যুবকদের সংগঠিত করতে পঠিয়ে দেন। 

সেদিনের তরুণ হারুন হাবীবের উপর দায়িত্ব পড়ে ময়মনসিংহ ও তাঁর নিজ জেলা ভারতের সীমান্তবর্তী জামালপুরের তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করার। ১৬ মার্চ (সম্ভবত) চলে আসেন তিনি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে। হারুন হাবীব ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুয়েটের আনোয়ারুল আজিম ছানা’র নেতৃত্বে এলাকার তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করার কার্যক্রম শুরু হয়। এতে গোটা এলাকার গণমানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরী হয়। কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতা দলে দলে স্থানীয় জিলপাক সুগার মিলের অস্ত্র প্রশিক্ষণে যোগ দিতে থাকেন। লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে মিল মাঠের নবীন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির। ছুটিতে এলাকায় আসা ইপিআর ও পুলিশ সদস্যরা এইসব যুবকদের ট্রেনিং করানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রয়োজন পড়ে অস্ত্রের। স্থানীয় থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রেনিংয়ের জন্য কিছু অস্ত্রের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিদিন থানা থেকে অস্ত্র আসে, ট্রেনিং শেষে তা জমা দেওয়া হয়।

২০ মার্চে হারুন হাবীব ও আনোয়ারুল আজিমের নেতৃত্বে মুক্তিকামী জনতা দেওয়ানগঞ্জ রেলওয়ে ষ্টেশন সংলগ্ন বেলতলি বাজারে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ষ্টেশন এলাকায় বসবাসরত অবাঙ্গালিরা সেই ছবি তোলে সকল তথ্য পাঠিয়ে দেয় সেনাবাহিনীর কাছে। এসব কার্যক্রমের খবর পেয়ে ময়মনসিংহ, জামালপুর হয়ে দেওয়ানগঞ্জে প্রবেশের পথে গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পাক হানাদার বাহিনী সুগার মিলের দিকে এগিয়ে যায়। হারুন হাবীবের নেতৃত্বে ৫০/৬০ জনের একটি দল যমুনা নদী পথে গুঠাইল হয়ে মলমগঞ্জের কাছে পৌঁছলে পাক হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পায়। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা ফায়ার শুরু করে । পাল্টা ফায়ার শুরু করে হানাদার পকিস্তানি সেনারা। টিকতে না পেরে অতি সামান্য অস্ত্রে সজ্জ্বিত নবীন মুক্তি বাহিনীর দলটি পিছু হটে। কেউ কেউ ধরা পড়ে, শহীদ হয়। দেওয়ানগঞ্জ থানা ও সুগারমিল দখল করে ক্যাম্প স্থাপন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী।

এরপর পাকসেনারা নদীপথ দখলে রাখতে বাহাদুরাবাদ ঘাটে একটি বড় ক্যাম্প স্থাপন করে। পরদিন হারুন হাবীবের বাড়ী গিয়ে ভাংচুর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করে। পতাকা উড়ানোর অভিযোগে আনোয়ারুল আজিমকে ধরে নিয়ে বাহাদুরাবাদ ঘাটে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। হারুন হাবীব সঙ্গীসাথীদের নিয়ে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে যমুনার চরাঞ্চলে আত্মগোপন করেন। রেডিও আকাশবাণী ও বিবিসিতে তিনি খবর শুনেন ভারতের মেঘালয়,আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গের সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। দলে দলে লোকজন পার্শ্ববর্তী ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিচ্ছে। ভারতের পাহাড়গুলোতে ট্রেনিংয়ের খবর প্রচার হলেও মেঘালয়ের এই অঞ্চলে তখনও ট্রেনিং শুরু হয়নি। হারুন হাবীব একটি দল নিয়ে অনেক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে কামালপুর বর্ডার হয়ে মেঘালয়ের তুরা জেলার মহেন্দ্রগঞ্জে পৌছেন। সেখানে দেখা হয় বৃহত্তর ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধুর বন্ধু ময়মনসিংহের রফিক ভুইঁয়া, জামালপুরের রাশেদ মোশারফ, আব্দুস ছামাদ,করিমুজ্জামান তালুকদার ও হাতেম তালুকদারসহ অনেক জনপ্রতিনিধিদের সাথে। তারা প্রশিক্ষণ শুরুর গুরুত্ব অনুভব করেন। এ সময় ক্যাম্প স্থাপনের ব্যবস্থা চলতে থাকে। মহেন্দ্রগঞ্জের পাহাড় কেটে তাঁবু বসানো শুরু হয়। ভারতীয় বিএসএফ এ ব্যাপারে সস্ক্রিয় সহায়তা করে।

কিন্ত হারুন হাবীব খবর পেতে থাকেন ভারতীয় সীমান্তের অনেক জায়গায় তখন মুক্তি বাহিনীর ট্রেনিং শুরু হয়ে গেছে। কেবল এই এলাকাতেই দেরী হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে হারুন হাবীব বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ভারতীয় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে ট্রাকে কাচা কলার ঝুপরিতে পালিয়ে তিনি আসামের ধুবরী যান। পরে ট্রেনে চেপে কোলকাতায় জয়বাংলা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অফিসে পৌঁছান। তারপর আবার ফিরে আসেন রণাঙ্গনে। আবারও ট্রেনিং গ্রহন করেন তিনি। যুদ্ধে অংশ নেন কামালপুর রণাঙ্গন ও জামালপুর, শেরপুর ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন রনাঙ্গনে।

ঐতিহাসিক কামালপুর রণাঙ্গন ছিল ঐতিহাসিক ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই রণাঙ্গনের আওতাভুক্ত ছিল জামালপুর,শেরপুর, বকসীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জসহ আশপাশের নদীবাহিত অঞ্চল। কামালপুরের বিওপি ঘিরে পাকিস্তান বাহিনীর একটি বড় ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। কামালপুর, শেরপুর, জামালপুর হয়ে টাঙ্গাইলের পথ ধরে ঢাকা আক্রমণের মূল প্রবেশ দ্বার ছিল এটি। এ পথকে সুরক্ষিত রাখতে ব্যাপক সৈন্য মোতায়েন করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই ক্যাম্পটি দখলে নিতে চারপাশে বাংকার স্থাপন করেছিল তারা। অধিনায়ক মেজর তাহেরের (পরবর্তীতে কর্ণেল) নেতৃত্বে কামালপুর রণাঙ্গনে একাধিক সন্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই বীরযোদ্ধা। ঐতিহাসিক চিলমারী যুদ্ধেও অংশগ্রহণ ছিল তার। ১৪ নভেম্বর কামালপুর দখলে নিতে গিয়ে কর্ণেল তাহের গুলিবিদ্ধ হয়ে একটি পা হারান। সেই যুদ্ধেও কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধ করেছেন। পাকিস্তান বাহিনীর রসদ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে উত্তরাঞ্চলের সাথে বাহাদুরাবাদ ঘাটের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বোমা মেরে জিল পাক সুগার মিলের অদুরে রেলব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন এই বীর সেনানী। অস্ত্র কাঁধে শুধু যুদ্ধই করেনি তিনি ক্যামেরার ক্লিকে যুদ্ধের চিত্র পৌঁছে দিতেন জয়বাংলা পত্রিকাসহ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার বেশ কয়েকটি পত্রিকায়। যুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করে খবর প্রেরণ করতেন তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও। যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্লভ ছবি ক্যামেরা সংগ্রহ করেন তেলঢালা ক্যাম্পে কিছুদিন থাকাকালীন। (তখনও ১১নং সেক্টর গঠিত হয়নি)।

চট্টগ্রামের ডাক্তার হুমায়ুন হাই নামে এক ব্যাক্তি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন, ছিলেন কুড়িগ্রামের তেলঢালা ক্যাম্পে। তার ছিল একটি ক্যামেরা। তিনিই প্রথমে হারুন হাবীবকে ক্যামেরায় ছবি তোলার তালিম দেন। ওই ক্যামেরা দিয়ে কিছুদিন কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজিবপুর ও কোদালকাঠিসহ ধরলা ও তিস্তা পারের ঘটে যাওয়া যুদ্ধের চিত্র তুলে পাঠালেন তিনি । আগস্ট মাসে কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে ১১ নং সেক্টর গঠন হলে তিনি চলে আসেন ১১ নং সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার তাহের হারুন হাবীবকে সাদরে গ্রহণ করলেন। নিজের ক্যামেরাটি দিয়ে বললেন, এটি কাজে লাগাও। এই ক্যামেরা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বেশীরভাগ ছবি তুলেছিলেন তিনি। যখন সশস্ত্র যুদ্ধে যেতেন অস্ত্রের সাথে ক্যামেরা ও টেপরেকর্ডার সাথে নিতেন তিনি। একহাতে অস্ত্র চালাতেন, আরেক হাতে তুলতেন যুদ্ধের চিত্র। ক্যামেরার ফিল্ম কিনতে ছুটতেন ভারতীয় মিলিটারীর গাড়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের গাড়ীতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৫২ মাইল দুরে তুরা পাহাড়ের জেলা শহরে। সেখানে কুমারী নামে এক মহিলার স্টুডিও থেকে রিল কিনতেন, ওখানেই ছবি ‘ডেভলাপ’ ও প্রিন্ট করতেন। সেখান থেকে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও জয়বাংলা পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্রিকা অফিসে যুদ্ধের ছবি ও খবর পাঠাতেন। খবর পাঠতেন লোক মারফত ও পোস্ট অফিসের মাধ্যমেও। তার তোলা বাহাদুরাবাদ লাইনে উড়ে যাওয়া রেল ব্রীজসহ যুদ্ধ চিত্র ফলাও করে ছাপা হয় সেদিনকার প্রভাবশালী ভারতীয় পত্রিকাগুলোতে। এসব যুদ্ধের সফলতার খবর পড়ে ও ছবি দেখে উজ্জিবিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিজে লিফলেট লিখে আসামের গৌহাটি থেকে তা ছাপিয়ে আনেন তিনি। সেখানে হারুন হাবীবের দেখা হয় পিটিআই’র স্থানীয় সাংবাদিক মানিক চৌধুরীর সাথে। এসব লিফলেট বিলি করা হয় দেশের মধ্যে।

নভেম্বরে কামালপুরে যুদ্ধের চুড়ান্ত আক্রমনের রণকৌশল নেন সেক্টর কমান্ডার তাহের। হারুন হাবীব, মেজর তাহেরের ছোট ভাই আবু সাঈদ ও লেফটেনেন্ট মান্নানসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানী ধানুয়া কামালপুরের দিকে অবস্থান নেন। আরো দুটি গ্রুপ মিলে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে হানাদার বাহিনীর কামালপুর বিওপি। মেজর তাহেরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রচন্ড গুলিবর্ষণ করে আগ্রসর হতে থাকে। মিজান কোম্পানীর একটি দলের অবস্থান নিশ্চিত হতে না পেরে মেজর তাহের নিজেই কামালপুর বিওপি’র কাছে চলে গেলে মর্টার সেলের আঘাতে একটি পা হারান। এই এলাকায় অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নেন হারুন হাবীব। ৪ ডিসেম্বর কামালপুর দখলের পর বক্সিগঞ্জ, শেরপুর হয়ে জামালপুরের দিকে অগ্রসর হতে গেলে মুক্তি বাহিনী হানাদার বাহিনীর বাধাঁর মুখে পড়ে। মুক্তি ও মিত্র বাহিনী হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করে ১০ তারিখে জামালপুর দখল করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হারুন হাবীবের, যুদ্ধের পর স্বাভাবিক কারণেই তিনি সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। প্রথমত  যোগ দেন সেদিনকার বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল(বিপিআই) নামের এক সংবাদ সংস্থায়। এরপর বাংলাদেশে সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক লিখেছেন অসংখ্য গ্রন্থ, প্রায় সবই মুক্তিযুদ্ধের ওপর। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য রচনায় তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। সেক্টর কমান্ডারর্স ফোরামের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এসজে/আরজি

নিজটির লিঙ্ক : http://www.poriborton.com/news-of-bangladesh/90255

প্রধান সম্পাদক : মোঃ আহসান হাবীব

Poriborton
Bashati Horizon, Apartment # 9-A, House # 21, Road # 17,Banani, Dhaka 1213 BD
Phone: +88 029821191, +88 01779284699
Website: http://www.poriborton.com
Email: [email protected]
            [email protected]