যেন মহাকাশ নেমে এসেছিল মঞ্চে

জাহাঙ্গীর সুর / ৫:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ২৬,২০১৭

‘আমি মহাবিস্ফোরণ। আমার থেকেই জন্ম এই মহাবিশ্বের।’ মঞ্চে উঠে ছোট্ট এক বালিকা, বলতে থাকল, ‘আমার আনুমানিক বয়স ১৩৭০ কোটি বছর।’ মেয়েটির নাম জোবাইদা আক্তার। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে প্রসাদপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৭-১৮ মে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসেছিল আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার বিজ্ঞানমেলা। আসরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘পৃথিবী ও মহাবিশ্ব’ নামে একক অভিনয়। এতে বিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থী ১৪টি মহাজাগতিক চরিত্রে অভিনয় করে।

সূর্য সেজেছিলেন দশম শ্রেণির সিরাজুম মুনিরা। তার কণ্ঠে শোনা যায়, ‘আমি সূর্য। আমি আরও ৫০০ কোটি বছর বাঁচব। আর তোমরা নিশ্চয়ই ততদিনে দ্বিতীয় কোনো পৃথিবী খুঁজে পাবে। হয়ত সেখানে তোমার পাড়ি জমাবে, বাড়ি বানাবে। শুভেচ্ছা রইল।’

সৌরজগতের সবচেয়ে ছোট গ্রহ বুধের চরিত্রে অভিনয় করে অষ্টম শ্রেণির লুবনা জাহান সাথী। সে বলে, ‘আমি হলাম সবচেয়ে গর্তওয়ালা (ক্রেটার) গ্রহ। একেকটা গ্রহ হাজার কিলোমিটারও চওড়া হয়। একেকটার নাম একেক। একটার নাম আবেদিন। তোমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে নাম। কিন্তু আমার দুঃখ একটাই। আমার কোনো চাঁদ নেই।’

নবম শ্রেণির আতিয়া নওশিন সেজেছিল শুক্রগ্রহ, যাকে আমরা শুকতারা বা সন্ধ্যাতারা বলি। সে বলে, ‘আমি আকারে পৃথিবীর প্রায় সমান। ভরও প্রায় পৃথিবীর সমান। এজন্য আমাকে পৃথিবীর যমজ বোনও বলা হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমার এখানে বছরের চেয়ে দিন বড়। আরও মজার কথা হলো। আমার এখানে সূর্য পশ্চিমে উঠে, পূর্ব দিকে ডুবে। তোমাদের পৃথিবীর উল্টো। সবগ্রহ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে। আর আমি ঘুরি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে।’

পৃথিবীর চরিত্রে অভিনয় করে অষ্টম শ্রেণির সাবরিনা সুলতানা। সে বলে, ‘জানো, এখান থেকে যদি তোমরা গর্ত করতে থাকো তাহলে একসময় পৃথিবীর আরেক প্রান্তে গিয়ে উঠবা। প্রসাদপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গর্ত করে তোমরা লাফ দিলে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে উঠবা। সময় লাগবে মাত্র ৪২  মিনিট।’

চাঁদ হয়েছিল দশম শ্রেণির ইসরাত জাহান ইমা। সে বলে, ‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা- মা যতই বলুক না কেন, আমি জানি চাঁদ কিন্তু পৃথিবী থেকে উল্টো প্রতিবছর দূরে সরে যাচ্ছি। বছরে প্রায় দেড় ইঞ্চি করে। তোমাদের আঙুলের নখগুলো যে গতিতে বাড়ে, আমি ঠিক সেই গতিতেই দূরে সরে যাচ্ছি। শুরুতে আমি পৃথিবী থেকে মাত্র ২২ হাজার কিলোমিটার দূরে ছিলাম। আর এখন পৌনে চার লাখ কিলোমিটারের বেশি। এভাবে এমন একদিন আসবে যেদিন আমার ওপর পৃথিবীর কোনো অভিকর্ষ কাজ করবে না। আমাকে হারিয়ে ফেলবে তোমরা।’

নবম শ্রেণির হুমাইরা বুশরা অভিনয় করে লালগ্রহ মঙ্গলের চরিত্রে। সে বলে, ‘মানুষ একদিন আমার বুকে বাড়ি বানাতে চায়। ২০২৫ সালের মধ্যেই নাকি পৃথিবী থেকে চার জন মানুষ আমার এখানে আসবে। দুজন ছেলে, দুজন মেয়ে। তোমরাও একদিন আসো এই লাল মাটির দেশে। অগ্রিম শুভেচ্ছা রইল।’

সপ্তম শ্রেণির সানজিদা সাদিয়া চৈতি সেজেছিল বৃহস্পতি। সে বলে, ‘আমি হলাম গ্রহরাজ। কম করে হলেও ১৩০০টি পৃথিবী এক জায়গায় করলে আমার সমান হবে। সবচেয়ে বেশি চাঁদ আমার। ৬৭টি। আমার সবচেয়ে বড় চাঁদ হলো গ্যানিমিড। সৌরজগতে সব চাঁদের মধ্যে সে বড়। এমনকি বুধ গ্রহের চেয়েও সে বড়।’

বলয়গ্রহ শনি সেজেছিল নবম শ্রেণির নুসরাত জাহান নিলা। সে বলে, ‘আমার চাঁদ ৬২টি। ওদের মধ্যে সবচয়ে বড় চাঁদটির নাম টাইটান। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ওখানে থাকতে পারে প্রাণের অস্তিত্ব। সেটা নিয়ে নিরন্তর ভাবছেন তারা। তোমরাও না হয় ভাবো। অনুসন্ধান চালাও।’

দশম শ্রেণির জিন্নাতুন নিসা ইউরেনাস গ্রহ সেজেছিল। সে বলে, ‘সূর্য থেকে আমি এতদূরে যে, আমার আকাশে এটাকে একটা শুধু তারার মতো মনে হবে। সবার চেয়ে আমি আলাদা অন্তত একটা বিষয়ে। সবগ্রহ ঘুরে পশ্চিম থেকে পূর্বে। শুক্র বলেছে, সে ঘোরে সবার উল্টো: পূর্ব থেকে পশ্চিমে। আর আমি ঘুরি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে। সবচেয়ে উল্টা।’

সপ্তম শ্রেণির হুমায়রা আনজুম হিমু নেপচুন গ্রহের চরিত্রে অভিনয় করে। সে বলে, ‘১৮৪৬ সালে আমাকে আবিষ্কার করেছিলে তোমরা। সূর্যকে একবার ঘুরতে আমার ১৬৫ বছর লাগে। তার মানে আবিষ্কারের পর মাত্র একবার সূর্যকে ঘুরতে পেরেছি আমি।’

সৌরপরিবারে ‘বিতর্কিত সন্তান’ সাবেক গ্রহ প্লুটোর চরিত্রে অভিনয় করে সপ্তম শ্রেণির সাদিয়া খাতুন। সে বলে, ‘২০০৬ সালে আমার গ্রহ পদবি কেড়ে নেওয়া হলো। এখন আমাকে বলা হয় বামন গ্রহ। অথচ দেখ, আমার চাঁদের সংখ্যাও পৃথিবীর চেয়ে বেশি। পাঁচটা চাঁদ আচে আমার। মাত্র একটা মহাকাশযান আমাকে দেখে গেছে। তার নাম নিউ হরাইজনস।’

ভিনগ্রহ সেজেছিল সপ্তম শ্রেণির আফরিনা বিনতে আব্বাস অর্নি। সে বলে, ‘আমি হুবহু পৃথিবীর মতো। কিন্তু তোমরা আমায় খুঁজে পাওনি। আমি কোথায় আছি, কতদূরে, তোমাদের বলব না। তবে আমার বিশ্বাস, যেভাবে তোমার মনপ্রাণ দিয়ে আমায় খুঁজতে নেমেছ, একদিন তোমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়তেই হবে। আমি সেটাই চাই।’

নবম শ্রেণির সাইমুন নাহার লিম অভিনয় করে কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে। সে বলে, ‘আমি সবকিছুকে গিলে ফেলতে পারি। এমনকি আলো, যার গতি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি, তাকেও আমি দুমড়ে মুচড়ে ফেলি। তোমরা প্রশ্ন করতে পারো, পৃথিবী কি ব্লাকহোলে হারিয়ে যেতে পারে? আর যাই হোক, তোমাদের ব্লাকহোলের মিছেমিছি ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তোমরা পৃথিবীবাসী ভালো থেকো।’

‘পৃথিবী ও মহাবিশ্ব’ গল্পটি লিখেছেন আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের সহ-উদ্যোক্তা শর্মিলা সিনড্রেলা ও জাহাঙ্গীর সুর। শিক্ষার্থীদের অভিনয় দেখে প্রসাদপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকবর আলী বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে যে, পুরো সৌরজগত নেমে এসেছে এখানে।’ অভিনেতা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই একটি করে বই উপহার দেওয়া হয়।

দুই দিনের এ বিজ্ঞান আসরে ছিল প্রকল্প প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ। প্রায় ছয়শ শিক্ষার্থী মেলায় অংশ নিয়েছিল। এদের মধ্যে তিনটি প্রকল্প প্রশিক্ষণ পেয়েছে ১২০ জন। বাতাস ও বৃষ্টির আভাস এবং ডিজিটাল পাহারাদার নামে দুটো প্রকল্প শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শিখিয়েছেন বিজ্ঞানকর্মী মুরাদুল ইসলাম মনু। স্বয়ংক্রিয় রেল নিয়ন্ত্রক (অটো রেল কন্ট্রোলার) প্রকল্পটির প্রশিক্ষক ছিলেন বিজ্ঞানকর্মী শাহাবুদ্দীন সামি। মেলায় প্রকল্প প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণে সহায়তায় ছিলেন বিজ্ঞানকর্মী মাহফুজ রহমান, মাসুম আলী, ইনজামামুল হক সুমন আবদুল্লাহ গালিব, মোস্তাকিম আলী ও ইকবাল হোসেন।

প্রশিক্ষণের পর পুরো দুই দিনের মেলায় সবচেয়ে বিচক্ষণ, কৌতুহলী, মনোযোগী ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে বেছে নেওয়া হয়। স্কুলসেরা খুদে বিজ্ঞানকর্মী নির্বাচিত হয় নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হুমাইরা বুশরা। তাকে একটি অনুবীক্ষণ যন্ত্র উপহার দেওয়া হয়। যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করে অষ্টম শ্রেণির লুবনা জাহান সাথী ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইমা। যুগ্মভাবে তৃতীয় হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির মোসা: হিমু ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের মাহমুদা খাতুন। পাঁচজনকেই একটি করে বই, বিজ্ঞান প্রকল্প শেখার যন্ত্রপাতি ও মেডেল দেওয়া হয়।

দুইদিনই বিদ্যালয় মাঠে চলেছে বিজ্ঞান আড্ডা। সেখানে খেলায় খেলায়, মজায় মজায় শেখানো হয় নিউটনের গতির তিন সূত্র; ফল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, মানবদেহ যে পরিবাহী তার প্রমাণ এবং নানান ধরনের প্রশ্ন ও উত্তর। বিজ্ঞান আড্ডা সঞ্চালন করেন জাহাঙ্গীর সুর। সহযোগিতায় ছিলেন বিজ্ঞানকর্মী আফরোজা খাতুন, আফিফা খাতুন, ইকবাল হোসেন।

শর্মিলা সিনড্রেলা সঞ্চালনা করেন উপস্থিত বিজ্ঞান বক্তৃতা পর্বটি। সেরা প্রশ্ন বিভাগে ছয়জন এবং সেরা বিজ্ঞান বক্তৃতায় তিনজনকে একটি করে বই উপহার দেওয়া হয়। সেরা প্রশ্নকর্তা ছিল নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী রওশন আরা অমি। অন্যরা হলো: খুশি খাতুন (নবম বিজ্ঞান), আফসানা আক্তার (দশম বিজ্ঞান), ফারহানা মুবাশশিরা (অষ্টম), নিপা খাতুন (ষষ্ঠ) ও সানজিদা সাদিয়া চৈতি (সপ্তম)। বিজ্ঞান বক্তৃতায় সেরা হয় সপ্তম শ্রেণির শাওমুন অরা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয় যথাক্রমে অষ্টম শ্রেণির সাবরিনা সুলতানা ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ইসরাত জাহান ইমা।

এছাড়া দুই দিনের মেলায় সেরা আগ্রহী শিক্ষার্থী হিসেবে পুরস্কৃত করা হয় দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীÑ তানভীরুন হাফিজ ও লাইলা আনজুমান শম্পাকে।

দুই দিন ধরেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ছিল বইমেলা। আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগারের বিজ্ঞানকর্মীদের লেখা ১৭টি বই নিয়ে এই মেলা ছিল। কৌতুহলী ও পড়–য়া মেয়ের বইমেলায় খুব আগ্রহ দেখিয়েছে। বইমেলার দায়িত্বে ছিলেন বিজ্ঞানকর্মী জোহিরুল ইসলাম সোহেল ও মাহাবুব আক্তার রনি।

(লেখক : সাংবাদিক ও বিজ্ঞান লেখক)

নিজটির লিঙ্ক : http://www.poriborton.com/public-opinion/52525

প্রধান সম্পাদক : মোঃ আহসান হাবীব

Poriborton
Bashati Horizon, Apartment # 9-A, House # 21, Road # 17,Banani, Dhaka 1213 BD
Phone: +88 029821191, +88 01779284699
Website: http://www.poriborton.com
Email: report@poriborton.com
            editor@poriborton.com