‍হুমায়ূন হারিয়ে যাননি

মিল্টন বিশ্বাস / ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৯,২০১৬

২০১২ সালের ১৯ জুলাই নুহাশ পল্লির মায়াময় চাঁদ ডুবে যায়। অন্ধকার হয়ে যায় প্রিয় সব বৃক্ষ-লতা-গুল্ম। দূরের সমুদ্র ও পাহাড় তাঁর স্পর্শ বঞ্চিত হয়। আজ থেকে চার বছর আগে মৃত্যুকে ঠিক উপলব্ধি করেছিলেন বোধ হয়!  সেদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শল্য-চিকিৎসকের ফাঁদে ধরা দেবার আগে ঘুরে গিয়েছিলেন প্রিয় স্বদেশ। মৃত্তিকার গন্ধে ভরা, সবুজ প্রকৃতির আলিঙ্গন ঘেরা তার সব স্মৃতিময় জায়গাগুলো বড় বেশি টানছিল কি?

প্রিয় ভাইয়ের হাত ছেড়ে, একান্ত আপন স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ বিদায়ের মুহূর্তগুলো কেমন লেগেছিল তার? যে জ্যোৎস্না ও বৃষ্টি তাকে আলোড়িত করত সেসব থেকে বহু দূরে তিনি এখন। ধানমন্ডির বাসার বারান্দা, কার্জন হলের মখমল রাঙা বৌদ্ধিক উঠোন আর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণের মুগ্ধতা কোথায় হারাল সেদিনের শ্রাবণ বাদলের প্রথম কদম ফুলের সুগন্ধ থেকে? আমাদের প্রিয় লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পের অনেক মাধ্যমের নিবিড় ধ্যানী হুমায়ূন আহমেদ বড় অসময়ে মাত্র ৬৫ বছর বয়সে ইহধাম ত্যাগ করেন।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণায় জন্ম বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় এই ব্যক্তিত্ব ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় লিখেছিলেন ‘নন্দিত নরকে’র মতো আপাত সহজ কিন্তু জীবনের জটিল আবর্তের গল্প। যে মধ্যবিত্তের কথাকার তিনি তার সূচনা ছিল এ উপন্যাস দিয়ে। বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের পথিকৃত তিনি; চার দশক একটানা লিখেছেন; আমাদের দেশে পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিকদের আধিপত্য ধূলিস্যাৎ করেছেন।

সহজ, সরল ভাষায় স্নিগ্ধ ও অনাবিল হাস্যরস এবং জীবনের আপাত উপরিতলের কথা বলে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তিনি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক গভীর সংকেত লিপিবদ্ধ করেছেন তার কাহিনিতে। তার গদ্যরীতিতে যে সাবলীল গতি এবং বর্ণনার পরিবর্তে কথোপকথন ও সংলাপের প্রাধান্য দেখা যায় তা সব শ্রেণির পাঠকের কাছে সহজবোধ্য। তার প্রায় উপন্যাসে একই ধরনের চরিত্র আছে যারা খুব জনপ্রিয় তাদের উদ্ভট কর্মকাণ্ডের জন্য; রোমান্টিক আচরণের পাগলামির কারণে। মিসির আলী ও হিমু এদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশে এই নামগুলো বহুল পরিচিত হয়ে গেছে; সাহিত্যের পাতায় ও ক্যামেরার ফ্রেমে। কারণ অধিকাংশ উপন্যাসে এ চরিত্রদ্বয় ঔপন্যাসিকের গভীর মমত্বে রূপায়িত হয়েছে।

হিমু বললে হুমায়ূন আহমেদকে বোঝানো হবে; এটি এখন পাঠকের কাছে স্পষ্ট। কেবল চরিত্রটির প্রতি লেখক কিংবা পাঠকের ভালোবাসা নয় কাহিনিতে অনিবার্য সক্রিয়তায় চরিত্রটি স্মরণীয় হয়ে উঠেছে। এখনো বইমেলাতে নতুন হিমুকে খুঁজে ফিরছে পাঠকরা; বেদনায় সিক্ত হয়ে উঠছে আমাদের মন।

অনেকদিন থেকে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছেন; আর তার সেই কীর্তিমান রূপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও অক্ষুণ্ন থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মধ্যবিত্তের জীবনের গল্প লিখে জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি; অথচ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ও চলচ্চিত্র দিয়েই তার চূড়ান্ত খ্যাতি; তারপর সায়েন্স ফিকশনকে বাস্তবতার সঙ্গে একীভূত করে মহীরুহে পরিণতি। কী ছিল না এই লেখকের অর্জনে? যিনি বিটিভির নাটকের প্রাণপুরুষ হিসেবে আবির্ভূত তিনিই আবার বানিয়েছিলেন বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের ভেতর বসতি গেড়েছিলেন তিনি ছড়িয়ে পড়েছিলেন সেন্টমার্টিন থেকে নুহাশ পল্লিতে।

স্বপ্নচারিতা ও কল্পনার জগৎ নির্মাণে তার জুড়ি মেলা ভার। তার স্বপ্ন ও চিন্তার একটি দিক তার নিজের কথা থেকে তুলে দিতে পারি। ‘রং পেন্সিল’ নামক রচনায় বড়দের দ্বারা শিশুদের প্রতারিত হবার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘শিশুদের কাছে একসময় প্রতারণা ধরা পড়ে, তারা তখন বড়দের ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু আমরা বড়রাও প্রতারিত হই। প্রতারণা করেন রাজনীতিবিদরা। ইলেকশনের আগে কত সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। বৈতরণী পার হওয়ার পর সব কিছুই ভুলে যান। বিস্মৃতি ব্যাধি হয়। এ ব্যাধি পাঁচ বছর থাকে। পাঁচ বছর পর রোগ সারে। আবার পূর্ণোদ্যমে পুরনো কথা বলতে থাকেন, আমরা আবারও প্রতারিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি।’

সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোটের গুরুত্ব সকল রাজনীতিবিদের কাছে সমান। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বিবেচনা অন্যরকম। তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে চেয়েছেন; বোঝাতে চেয়েছেন এসব হতভাগা, মূঢ়, অসহায় মানুষের প্রতি সদয় না হলে গণতন্ত্রের সুবাতাস বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী হবে না। জীবিতাবস্থায় শেষ আগমনে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। বলেছিলেন ১৬ কোটি মানুষ এক টাকা করে দিলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বহন করা কোনো বিষয়ই নয়। আট বছর আগে তিনি ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে পাসের হার শতভাগ; ড্রপ আউট শূন্য। তিনি কল্পনায় যে সুন্দর স্কুল দেখেছিলেন এটি সেরকম একটি প্রতিষ্ঠান। তার ভাষ্য ছিল, স্কুল দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসে; অথচ তার এলাকার নির্বাচিত এমপিদের নিমন্ত্রণ করেও পাওয়া যায়নি।

২.
বাংলা সাহিত্যে ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের পর জনপ্রিয়তায় হুমায়ূন আহমেদের নাম উচ্চারিত হবে দীর্ঘদিন। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন জনপ্রিয় অধ্যাপক নন; তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের লেখকদের লেখনি সত্তার ‘আইকন’। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি টিভি ও চলচ্চিত্রে নিরন্তর তার কাজে সংযুক্তি একজন পরিশ্রমী ব্যক্তিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যিনি প্রতিভার ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেই তৈরি করে নিয়েছিলেন নিজস্ব এক ঘরানা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তার ‘দেয়াল’ উপন্যাসটি অসমাপ্ত থেকে যাওয়ায় আমাদের ক্ষতি হয়ে গেল বিস্তর। কেন এবং কিভাবে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন পাঠকের? তিনি নাগরিক জীবনকে উপন্যাসে মুখ্যত চিত্রিত করেছেন। তার ভাষা ছিল কাহিনির পরিপোষক। হাস্যরস ও রহস্যময়তা তার গল্পের মুখ্য উপাদান। তার পর্যবেক্ষণ ছিল অভিনব ও বিশিষ্ট। তার চরিত্রগুলো সহজেই পাঠকের সহানুভূতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল।

বিশাল ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’ ছাড়াও ‘শ্যামল ছায়া’য় মুক্তিযুদ্ধে একদল তরুণের অবদানকে যেভাবে তুলে ধরেছেন তা যুদ্ধ ও ব্যক্তি জীবনের সংশ্লেষে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন ‘একা একা’ উপন্যাসে তিনি উদ্ভট চরিত্র নির্মাণ করে হাস্যরসে মাতিয়েছেন তেমনি অতি সাধারণ বিষয় চোখে পড়েছে। তার উপন্যাসের গল্পের একটি পরিচিত কৌশল রয়েছে। তিনি ‘নন্দিত নরকে’ যে মধ্যবিত্ত জীবন ও পরিবারের গল্প বুনেছিলেন ঠিক একই রকম কাজ করেছেন ‘জয়জয়ন্তী’সহ আরও অনেক উপন্যাসে। হিমু ও মিসির আলী তার অনেক উপন্যাসের প্লটে নতুন নতুন আদলে আত্মপ্রকাশ করেছে।

সামাজিক উপন্যাসের আসর থেকে রহস্য উপন্যাসের আঙিনায় তার চলাচলের এটি ছিল সৃজনশীলতার অন্যতম অবলম্বন। তবে তার উপন্যাসের একটি দুর্বল দিক হলো বেশি কথোপকথন। এই কথার প্রাবল্য অসঙ্গতি তৈরি করেছে অনেক উপন্যাসে। তার ‘কবি’ উপন্যাস সে অর্থে শিল্পমানে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যদিও উপন্যাসটিতে ধনী, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জীবন উঠে এসেছে। অথচ প্রথমদিকে তার ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পাঠক ধরতে সক্ষম হয়েছিল; যার ধারাবাহিকতা ২০১২ সালের বইমেলা পর্যন্ত বজায় ছিল।

তিনি অনেক অদ্ভূত, আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব জীবনের গল্প বলেছেন ও বিচিত্র চরিত্র সৃজন করেছেন। তার সৃষ্ট শুভ্র পতিতার সন্তান কিন্তু তার মধ্যে তিনি মহান আত্মার প্রতিধ্বনি শুনেছেন। ঔপন্যাসিক হিসেবে একইসঙ্গে নগর এবং গ্রামীণ জীবন পর্যবেক্ষণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনকে কাহিনি বৃত্তে তুলে ধরার জন্য সাম্প্রতিক অনেক বিষয়ই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হয়েছে। এসবই পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন এমন শিল্প প্রকরণে যা মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সর্বস্তরে।

মূলত গত ও বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ অফুরন্ত প্রাণের অবারিত উচ্ছ্বাসে লিখেছেন; জনপ্রিয় হয়েছেন বহুমাত্রিক ধারায়। উপন্যাস, গল্প, টিভি নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতা তাকে মানুষের বেশি কাছে নিয়ে গেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পিতার সন্তান হুমায়ূন আহমেদের সমগ্র জীবনেই অভিব্যক্ত হয়েছে অনেক কিছু। তিনি আপাদমস্তক একজন আশাবাদী লেখক ছিলেন। যিনি মানুষের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন নির্বিকারভাবে।

বাঙালির আবেগের জায়গাটি ঠিক ঠিকভাবে উন্মোচন করে গল্প বলার কৌশল তিনি ভালই জানতেন। এজন্য লৌকিক থেকে অলৌকিকে চলাচল ছিল তার নিরবচ্ছিন্ন। অধিবাস্তবতা থেকে জাদুবাস্তবতা সবই তার কথাসাহিত্যের ঘটনাধারায় মিশ্রিত। নিজের বিশ্বে তিনি প্রকৃত অর্থেই মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের মতো অদ্বিতীয় ছিলেন। সমাজ ও জীবনকে মথিত করে অসাধারণ সৃজন দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে তার সাহিত্যকর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য অমৃত। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তার অকালে চলে যাওয়া ছিল আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
writermiltonbiswas@gmail.com

নিজটির লিঙ্ক : http://www.poriborton.com/arts-and-literature/10520/-‍হুমায়ূন-হারিয়ে-যাননি

প্রধান সম্পাদক : মোঃ আহসান হাবীব

Poriborton
Bashati Horizon, Apartment # 9-A, House # 21, Road # 17,Banani, Dhaka 1213 BD
Phone: +88 029821191, +88 01779284699
Website: http://www.poriborton.com
Email: report@poriborton.com
            editor@poriborton.com