আক্রান্ত বৃটেন এবং কতিপয় প্রশ্ন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫

আক্রান্ত বৃটেন এবং কতিপয় প্রশ্ন

শুভ কিবরিয়া ৮:০৭ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০১৭

আক্রান্ত বৃটেন এবং কতিপয় প্রশ্ন

সাফি রৌজ রাউসস -এর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। ফুলের মত একটা শিশু। বয়স মাত্র ৮। পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন বর্ণের যে কোন ধর্মের এই বয়সের একটা শিশুর মতই নিষ্পাপ হাসিমুখ তার। জানিনা, কোন বাবা-মার হৃদয় ভেঙ্গে টুকরো করে হারিয়ে গেলো এই শিশুটি।

তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু এই মুহুর্ত পর্যন্ত জানতে পারি নাই সাফি রৌজ-এর বাবা-মা বেচে আছে কি না? নাকি তারাও এই রক্তক্ষয়ী আত্মঘাতি বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন সেটাও এখন পর্যন্ত অজানা।

সাফি রৌজ বৃটেনের ম্যানচেস্টার কনসার্ট হলে আত্মঘাতি বোমা হামলায় নিহতের মধ্যে কনিষ্ঠতম বলে জানা গেছে। শিশুদের প্রিয় সংগীত শিল্পী মার্কিন নিবাসি আরিয়ানা গ্রান্ডির কনসার্ট শুনতে গিয়েছিল আর অনেকের মতই সাফি রৌজ। কনসার্ট শেষে যখন সবাই বেরোচ্ছিল কনসার্ট হল থেকে তখনই ঘটে এই বর্বর ঘটনা।

২২ মে ২০১৭ সোমবার বৃটেনের স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টায় এখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ম্যানচেস্টারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘ম্যানচেস্টার অ্যারিনায়’ ঘটে এই ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। এক দশকের মধ্যে এটি বৃটেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম সন্ত্রাসি হামলা।

উল্লেখ্য ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থায় এক আত্মঘাতি বোমা হামলার সিরিজ ঘটনা ঘটে যেখানে ৫২ জন নিহত হয়, আহত হয় প্রায় ৭০০ জন। আল-কায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত ৪জন বৃটিশ নাগরিক এই আত্মঘাতি বোমা হামলা চালায়।

এবারের আত্মঘাতি হামলায় প্রাথমিকভাবে ২২ জন নিহত এবং আহত হয় ৬৪ জন। আহত-নিহতের সংখ্যা সময় গেলে আরও বাড়তে পারে। ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইতোমধ্যে দাবি করেছে তাদের একজন সমর্থক এই হামলা চালিয়েছে ।

দুই.
এই হামলার পর পুলিশ আত্মঘাতি এই হামলাকারির পরিচয় প্রকাশ করেছে। পুলিশের ভাষ্যমতে আত্মঘাতি হামলায় নিহত এই তরুণের নাম সালমান আবেদি। লিবিয় বংশোদ্ভূত ২২ বছর বয়সী এই মুসলিম তরুণ।

লিবিয়ার সাবেক একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমলে লিবিয়া ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমায় সালমানের পরিবার। তার বাবা-মা শরণার্থি হিসাবে বৃটেনে আশ্রয় নিয়েছিল। সালমানরা চার ভাইবোন। সালমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ম্যানচেস্টারেই। চার ভাইবোনের মধ্যে সেজ সালমান।

১০ বছর আগে ম্যানচেস্টারের দক্ষিণাংশে বাস করতে শুরু করে সালমানের পরিবার। ম্যানচেস্টারের এই অংশে লিবিয়া থেকে আসা বহু মুসলিম পরিবারের বাস। ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টারে নাম করা বিশ্ববিদ্যালয় সালফোর্ডে ব্যবসায় শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে সালমান। তবে দুই বছর পর ডিগ্রি না নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। কোনো অপরাধের সঙ্গে কোনো দিন তার নাম ওঠেনি।

সালমান যেখানে বসবাস করে ওই এলাকা থেকে ২০১৫ সালে দুই স্কুল শিক্ষার্থী সিরিয়ায় পাড়ি দেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্যমতে সালমান আবেদী এই হামলার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে লিবিয়া থেকে বৃটেনে ফিরেছে। বহু বছর বৃটেনে বসবাস করার পর তার পরিবার লিবিয়ায় ফিরে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, অন্য ভাইবোনদের চেয়ে সালমান ছিলেন বেশি চুপচাপ-শান্ত। সে যে এমন এক ঘটনা ঘটাতে পারে তা যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে সবার কাছে।

তিন.
বৃটেন আশঙ্কা করছে এই হামলার পর আরো সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। ফলে দেশটিতে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি সংক্রান্ত সতর্কতা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনায় সেনা ইউনিট নামানো হয়েছে। পুলিশকে সহায়তার জন্য ‘অপারেশন টেম্পেরার’ নামে সেনাবাহিনীর ইউনিট নামানো হয়েছে। ৩৮০০ সেনা বৃটেনের রাস্তায় টহল দিচ্ছে।

বৃটেনের রাজনীতিতে রক্ষণশীলতা ক্রমশ শক্তিমান হয়ে উঠছে। বৃটেনের জনগণ শুধু ইউরোপিয় ইউনিয়ন থেকেই বের হবার জন্য ভোটই দেয় নাই তারা অভিবাসি প্রশ্নেও কঠোর ও কট্টর হয়ে উঠছে। সে কারণেই ডেভিড ক্যামেরনের পর থেরেসা মে অধিকতর রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অভিবাসি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রশ্ন বৃটেনে এখন খুবই জনপ্রিয় একটি দাবি।

থেরেসা মে আগাম নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। আগামী ৮ জুন বৃটেনে সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয়েছে। এই নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালেই ঘটলো এই বর্বর হামলার ঘটনা। এক অর্থে এই বর্বরতা তেরেসা মে’র বিজয়কে আরও সুনিশ্চিত করার দিকে ঠেলল। আরও হামলা হতে পারে এই আশংকায় বৃটেনে এখন এক ধরণের জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সেটা হয়তো নির্বাচন পর্যন্ত বজায় রাখার চেষ্টা হলেও হতে পারে।

এই সহিংসতা থেরেসা মে কে আরও কট্টর হবার সুযোগ দেবে। নির্বাচনে জিতে আরও কট্টর আয়রন লেডি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারেন থেরেসা মে। থেরেসা মে বৃটেনের গত ৬০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সেদেশের হোম সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করেছেন। সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটা রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদি নতুন বৃটেনের অভ্যুদয় ঘটতে পারে থেরেসা মের হাতে।

এবার বিপুল গরিষ্ঠতায় সরকার গড়তে পারলে জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের মতো শক্তিমান জাতীয়তাবাদি শাসক হিসাবে মার্গারেট থ্যাচারের জায়গা নেবার সুযোগ আছে থেরেসা মে’র। সে কারণেই নির্বাচনের আগে আগে এ ধরণের সন্ত্রাসি হামলা এবং এই বিপুল প্রাণহানি কাকতালিয় কি না , নাকি এর পেছনেও কোনো পলিটিক্যাল গেম প্ল্যান আছে সেটাও ভাবার বিষয়।

চার.
এখন পর্যন্ত বৃটেনের পুলিশ এই বর্বরতার সাথে সালমান আবেদিকেই জড়িত বলে ঘোষণা করেছে। পুলিশের ধারণা এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শুধু আবেদিই এককভাবে জড়িত নয়। তার সহযোগি আরও থাকতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশ সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেফতারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

পুলিশের অনুমান যদি সত্য হয় তবে এটা ভাবার বিষয সালমান কেন এরকম কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ল? শান্ত স্বভাবের এই তরুণ কি কারণে আত্মঘাতি হবার মতো সিদ্ধান্ত নিল?

একদা সু্স্থিত লিবিয়া এখন গৃহযুদ্ধ আর পশ্চিমা দেশের আক্রমণে ছিন্নভিন্ন অশান্ত এক দেশ। নিজের দেশের এই করুণ পরিণতি কি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল? যে দেশ ছেড়ে তার পরিবার বৃটেনে শরণার্থি হতে বাধ্য হয়েছিল তা কি তার মনে কোন

ঝড়ো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই কি সে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের এই বিপদযুক্ত ভুল, রক্তক্ষয়ী পথে পা বাড়িয়েছিল?

পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত আমেরিকা ও বৃটেনের উদ্যোগে লিবিয়ার যে দুর্দশা ঘটে তার প্রতিশোধ নিতেই কি সালমান আদেবি নামের এই তরুণ আরেকটি ভুল ও রক্তাক্ত পথ বেছে নেয়?

পাঁচ.
সাফি রৌজ-এর কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম। এই বর্বর রাজনীতি বা হিংস্র প্রবণতার সাথে শিশু সাফির কোনো যোগ ছিল না। অথচ সে এই বর্বরতার নৃশংস শিকার হোল। গত কয়েক দশক ধরে আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া, নাইজেরিয়া, মালি, প্যালেস্টাইনে এরকম হাজারো হাজারো শিশু বর্বতার শিকার হচ্ছে। এই শিশুরা একেবারেই নিরপরাধ। অথচ তাদেরকেও কারও না কারও নিষ্ঠুরতার বলি হতে হচ্ছে।

লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক কিংবা আফগানিস্তানে সংগঠিত এইসব বর্বরতার পৃষ্ঠপোষকতা, পরিকল্পনার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক শক্তিমত্তা এবং অস্ত্র ব্যবসা বিস্তারের সঙ্গে ভুল নীতি বহুলাংশে জড়িত। আজ বৃটেনে বা প্যারিসে কিংবা বেলজিয়ামে যা ঘটছে তা হয়তো এসব ভুল ও পরিকল্পিত রণনীতির খেসারত। কিংবা নতুন করে দুনিয়ায় অস্ত্র ব্যবসা বিস্তারের নয়াফাঁদ।

কিন্তু এই ধ্বংস, এই ঘৃণা, এই প্রতিহিংসা ছড়িয়ে কার লাভ? সেই প্রশ্ন এখন উঠছে। কার লোভে, কার পাপে পৃথিবীতে এই দ্বেষ-ঘৃণা ছড়াচ্ছে সেই উত্তর এখন জানা জরুরি। জানা দরকার এইসব সালমান আবেদিরা কেন আত্মঘাতি হচ্ছে?

পুনশ্চ
শিশু আয়লানের জলমগ্ন ছবি গোটা পৃথিবীকে কাঁদিয়েছে। শিশু সাফি রৌজয়ের রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন শরীরও কাঁদাচ্ছে। কিন্তু পৃথিবী এই জঘণ্য হত্যা-খুন-রক্তপাত থেকে মুক্ত হচ্ছে না। রাজনীতি আর রণনীতির নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচানো যাচ্ছে না নিরপরাধ মানুষকে। তাই পৃথিবীতে আজ দরকার ঐকমত্যের। নইলে শরণার্থির সংখ্যা যেমন বাড়বে আবার এই শরণার্থিরাই একদিন হন্তারক হয়ে উঠবে।

শুভ কিবরিয়া : সাংবাদিক, কলামিস্ট; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
kibria34@gmail.com