চট্টগ্রামে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শিল্পাঞ্চল

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ ১৪২৫

চট্টগ্রামে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শিল্পাঞ্চল

হিমাদ্রী রাহা ১:০২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
চট্টগ্রামে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শিল্পাঞ্চল

রাস্তায় মোড়ে মোড়ে নেই কোন মোটর ওয়ার্কশপ। পথচারীরা ফুটপাতে চলতে ফিরতে পাবেনা ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা যত্রতত্র ওয়ার্কশপের ঝনঝনানি শব্দ কিংবা গায়ে এসে পড়বে না কাটার মেশিনের আগুনের স্ফুলিংগ। রাস্তা দখল করে গাড়ি মেরামত করতে গিয়ে নগরবাসীকে পোহাতে হবে না কোন যানযট। অনেকটা দুঃস্বপ্ন হলেও যত্রতত্র মোটর ওয়ার্কশপকে এক জায়গায় স্থানান্তরের লক্ষ্যে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গড়ে উঠতে যাচ্ছে দেশের প্রথম অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল ।

ইতিমধ্যে ভূমি বরাদ্দের কাজ শেষ। বাকি শুধু আর্থিক বরাদ্দ। যদিও এর নেপথ্যে ছিলো অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানা ও প্রশাসনিক ভোগান্তি এড়ানোর জন্য সেই ১৯৮৯ সাল অর্থাৎ এরশাদ সরকারের আমল থেকেই সোচ্চার ছিলো সমিতির নেতারা। এই লক্ষ্যে তারা তৎকালীন বিনিয়োগ বোর্ড বরাবর  ৯/১১/১৯৮৯ তারিখে অটোমোবাইল শিল্পঞ্চল গড়ে তোলার নিমিত্তে ৭ দফা দাবীসহ একটি আবেদন করেন। পরে সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে মালিক সমিতির আওতাধীন ওয়ার্কশপগুলো বিনিয়োগ বোর্ডের নীতি ও পরিকল্পনা পরিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধন করা হয়।

তবে সরকার পতন ও এরপর সরকারের পালাবদলে মাঝপথে থমকে যায় ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির শিল্পঞ্চল গড়ার দাবী। দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় বরাবর আবারো শিল্পাঞ্চল বরাদ্দের পুনঃতাগিদের আবেদন করেন অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির নেতারা। পরে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন(বিসিক)কে  দেয়া হয় অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার দায়ভার। এরপর শিল্পাঞ্চলের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়নের জন্য  বিসিকের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপকে আহবায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কমিটি অটোমোবাইল মালিক সমিতির দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী চট্টগ্রামের বাকলিয়া,ফতেয়াবাদ ও কর্ণফূলী থানার চরলক্ষ্যা এই তিন জায়গায় সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে জেলার পটিয়া উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের চরফরিদ গ্রামে ১০ একর জায়গার উপর অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেখানে অন্তত ছোট বড় প্রায় ৬০০ অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ স্থানান্তর করা যাবে। বর্তমানে এই শিল্পাঞ্চল স্থাপনের প্রক্রিয়াটি বাজেটের প্রণয়নের অপেক্ষায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অটোমোবাইল মালিক সমিতি চট্টগ্রাম জেলা শাখার আহবায়ক শচী নন্দন গোস্বামী পরিবর্তনকে জানায়- দেশের পরিবহন ও যানবাহন ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম  বাস,ট্রাক,মিনিবাস,কোস্টার,কার, মাইক্রোবাস,টেক্সী,টেম্পুসহ সকল ধরণের গাড়ী দেশের বিভিন্ন স্থানসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ গুলো মেরামত,সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষন করে এই দরিদ্র দেশের পরিবহন ও যানবাহন ব্যবস্থাকে সচল রাখছে।সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা এই ওয়ার্কশপগুলো দেশের অবহেলিত হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন গড়ার ইনস্টিটিউশান হিসেবে দীর্ঘকাল যাবৎকাজ করছে।এখান থেকে একজন শ্রমিক দক্ষ কারিগর হয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে করে বিদেশেও কাজ করে সুনাম অর্জণ করছে। দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসছে।অথচ আমাদের কোন স্থায়ী জায়গা নেই। ভাড়া জায়গায় যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করতে হয়।দেশের অন্যতম এই শিল্পটি অনেকটা উদ্বাস্তু। তারপরও আশার কথা হলো দেরীতে হলেও এই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে যাচ্ছে। এখন শুধু আর্থিক বরাদ্দ বাকি।

সমিতির সদস্য সচিব আবু সাঈদ চৌধুরী পরিবর্তনকে জানান-দেশের পরিবহন সেক্টওে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে ওয়ার্কশপগুলো যথাযথাভাবে বিকাশ লাভ করেনি। বিভিন্ন এলাকায় সরকারী কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন পতিত জায়গায় ওয়ার্কশপগুলো নির্মিত হয়েছে। তাই সরকারী সিদ্ধান্তে বা উচ্ছেদের ফলে অথবা জমির মালিকদের মর্জিমতো প্রায় ওয়ার্কশপগুলো সরিয়ে নিতে হয়। এই অনিশ্চয়তা ও দূর্ভোগ নিরসনের জন্য সেই এরশাদ সরকারের আমল থেকেই আমরা সংগ্রাম করে আসছি স্থায়ী ঠিকানায় একটি শিল্পাঞ্চল করার জন্য। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে বিসিকের সহায়তায় চট্টগ্রামের কর্ণফূলী থানার চরলক্ষ্যায় গড়ে উঠবে স্বপ্নের শিল্পাঞ্চল। আশাকরি খুব শীঘ্রই আর্থিক বরাদ্দও হয়ে যাবে। শিল্পাঞ্চল হয়ে গেলে গ্রাহকদের উন্নত ও ভালো সেবা দেয়া যাবে। এছাড়াও ভ্রাম্যমান রেকারিং সার্ভিসের মাধ্যমে রাস্তায় বিকল হয়ে যাওয়া গাড়িটি তাৎক্ষনিকভাবে মেরামত বা প্রয়োজনে ওয়ার্কশপে আনার ব্যবস্থা করা যাবে। এছাড়াও গাড়ীর যন্ত্রাংশ নির্মাণ,ডেন্টিং,পেইন্টিং উন্নত গাড়ির বডি তৈরী ও হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ডক্টর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজের মতে- দেশে অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে একদিকে যেমন ভাসমান এই শিল্পটির একটি নির্দিষ্ট জায়গা হবে তেমনি গাড়ি ব্যবহারকারী ও রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানিকারকরাও নানা ভোগান্তি থেকে বাঁচবে। কর্মসংস্থান হবে বিপুল জনগোষ্ঠীর। এতে করে মালিক-শ্রমিক-ব্যবহারকারী সর্বোপরি সরকার লাভবান হবে। সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।

বর্তমানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মালিক সমিতির নিবন্ধন অনুযায়ী বড়-২৭৫,মাঝারী-১৮০,ক্ষুদ্র-১২০টি মিলিয়ে মোট ৫৭৫টি ওয়ার্কশপ আছে।যার বাৎসারিক উৎপাদন/সেবা ১২৫ কোটি টাকা। এই শিল্প থেকে সরকার রাজস্ব পায় ৫.৬২ কোটি টাকা।

আরজি/

 
.



আলোচিত সংবাদ