অন্যরকম এক বিদ্যালয় সৈয়দপুরের ডাংগারহাট

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

অন্যরকম এক বিদ্যালয় সৈয়দপুরের ডাংগারহাট

নুর আলম, নীলফামারী ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০১৯

অন্যরকম এক বিদ্যালয় সৈয়দপুরের ডাংগারহাট

ইচ্ছে থাকলেই যে সম্ভব সেটি দেখিয়েছেন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ডাংগারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবলি বেগম।

দুই বছরের মাথায় বদলে গেছে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ। বেড়েছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, হচ্ছে ভালো ফলাফল।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখতে নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ।

এখানে রয়েছে ১০ জনের ক্ষুদে চিকিৎসকদল এবং ১০ জনের কাব স্কাউট। নিয়মিত হয় অবিভাবক সমাবেশ, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং এবং অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে করা হয় ‘হোম ভিজিট’। চালু রয়েছে মিড ডে মিল।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, কবি সুফিয়া কালাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের নামে বিদ্যালয়ের একেকটি শ্রেণিকক্ষের নামকরণ করা হয়েছে। একটি কক্ষ রাখা হয়েছে নামাজ ঘরের জন্য।

ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি করা হয়েছে শহীদ মিনার। সম্প্রতি এটির উদ্বোধন করেন সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সদ্য নির্মিত শহীদ মিনার। বিদ্যালয়ের দেয়ালে শোভা পেয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। এছাড়া রয়েছে ভাষা শহীদের প্রতিকৃতি।

চিত্রায়িত হয়েছে জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল, জাতীয় পাখি, বাংলা বর্ণের সমাহার প্রভৃতি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে লাইব্রেরি, সৎ মানসিকতা তৈরিতে সততা স্টোর, ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে স্টুডেন্ট কাউন্সিল এবং অনিয়মের ব্যাপারে স্থাপন করা হয়েছে ‘অভিযোগ বাক্স’।

দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোও যেন শিক্ষক। সাজসজ্জা আর পরিপাটি সম্পন্ন দেয়ালে স্থান পেয়েছে শিক্ষাবিষয়ক দর্শনীয় উপকরণ। দেয়ালে তাকালেই যেন শিক্ষাগ্রহণ।

রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন। সুপেয় পানির জন্য নলকূপ এবং সীমানা প্রাচীর ঘেরা বাউন্ডারি।

সর্বশেষ স্থাপন করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কর্নার’। সম্প্রতি এটির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী।

কর্নারে দেশ বিভাগ, মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয়দফা, লাহোর প্রস্তাব, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, অস্থায়ী সরকার গঠন, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ, বীরাঙ্গনা, সেক্টর কমান্ডার, জাতীয় চার নেতা, ভাষা শহীদ, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসর্মপণ, সৈয়দপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার চিত্র।

সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর এলাকার ডাংগারহাটে ১৯৭২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে চারজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছে এখানে আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২৮ জন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাম প্রসাদ বলেন, ২০১২ সালে যোগদান করি এখানে। মানসম্মত শিক্ষা, সুন্দর পরিবেশ সব হয়েছে গেল দুই বছরে শিবলি আপা আসার পর থেকে। দারুণ উদ্দমী মানুষ তিনি।

তিনি বলেন, এখানে সবাই মিলেমিশে কাজ করি আমরা। অবিভাবক থেকে শুরু করে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদেরও নিয়ে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভালো করছে আগে এটি ছিলো না। গত বছর এখান থেকে একজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পায়।

বাঙ্গালীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রানবেশ চন্দ্র বাগচি বলেন, আমার ইউনিয়নে ১০টি স্কুল। এরমধ্যে ডাংগারহাট নতুন সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে অনেক এগিয়ে রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ভূমিকা পালন করছে বিশেষ।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকটি আমাদের জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত। এটি সচরাচর চোখে পড়ে না। শিশুদের মাঝে দেশপ্রেম তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আমিরুজ্জামান বকুল বলেন, আমরা প্রতি মাসে বৈঠকে মিলিত হয়। ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করি। আর এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধান শিক্ষকের কারণে।

তিনি আরো বলেন, একজন মানুষ বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখলে শিক্ষাগ্রহণের জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। কি নেই এখানে। অবিভাবক এবং মা সমাবেশ প্রায়ই হয়ে থাকে। শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি একটি উদাহরণ হতে পারে।

প্রধান শিক্ষক শিবলি বেগম জানান, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা অফিস, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষকদের সহায়তায় এটি করতে পেরেছি।

তিনি বলেন, সর্বশেষ আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছড়িয়ে দিতে এবং মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের যে অর্জন সেগুলো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

শিবলি বেগম বলেন, স্লিপ এবং ক্ষুদ্র মেরামত বরাদ্দের টাকা আমি বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করেছি। যাতে শিক্ষার্থীদের কাজে এবং প্রতিষ্ঠানের কাজে আসে।

এখোনো অনেক বাকি রয়েছে মন্তব্য করে বলেন, কাজের শেষ নেই তবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নান্দনিক একটি প্রতিষ্ঠান দিতে পারবো।

বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নিঃসন্দেহে ডাংগারহাট বিদ্যালয়টি আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। একজন মানুষের ইচ্ছে থাকলেই যে করা যায় সেটি করে দেখিয়েছেন এখানকার প্রধান শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে উপলদ্ধি করতে পারবে এবং শিখবে ও জানবে।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন এরকম উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

এইচআর

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও