আলোর পথ দেখাচ্ছেন জাহানারা বেগম

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

আলোর পথ দেখাচ্ছেন জাহানারা বেগম

নুর আলম, নীলফামারী ৬:৩৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

আলোর পথ দেখাচ্ছেন জাহানারা বেগম

প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের অতিসাধারণ একজন গৃহবধূ। যার প্রধান কাজ মূলত ঘর সংসার সামলানো। ঘরের বাইরে টুকটাক কাজকর্ম করে সাংসারিক ব্যয় মেটানো। গ্রামবাংলার চিরায়ত প্রথায় এমন দৃশ্য এখনো বহমান। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে অনেক।

গ্রামের নারীরা এখন শুধু চুলোই উনুন দিতে নয়, বরং সব ধরনের কার্যক্রমের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করছে। আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার পথে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

তেমনি একজন আলোর পথের দিশারী হলেন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর গ্রামের জাহানারা বেগম (৫১)।

তিন সন্তানের জননী জাহানারা দারিদ্র্যতার কারণে খুব বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন তার বিয়ে হয়ে যায়। এরপর আর পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। স্বামী-সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অন্যসব নারীর মতো তাকেও মাথানিচু করে থাকতে হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। সময়ের সাথে স্বনির্ভরতা অর্জন করেন। তারপর আর পেছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি জাহানারাকে। এখন তিনিই খালিশা বেলপুকুর গ্রামের অস্বচ্ছল নারীদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

জাহানারা বেগম এখন তার এলাকায় বাল্যবিয়েরোধে কাজ করে যাচ্ছেন। বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে গ্রামবাসীকে অবহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেই সাথে গ্রামের মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করতে অভিভাবক সমাজকে জোর আহ্বান জানাচ্ছেন। সেই সাথে নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম গড়তে অক্ষরজ্ঞানহীন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের মাঝে তিনি অক্ষরদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এর ফলে এখন খালিশা বেলপুকুর গ্রামে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের সহজ সরল স্বভাবের মানুষজনের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরেজমিনে খালিশা বেলপুকুর গ্রামের সেতুবন্ধন পাঠাগারে গিয়ে দেখা যায়, জাহানারা বেগম পাঠাগারে আগত গ্রামের শিশু-কিশোরদের মাঝে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের আরো বেশি বেশি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি নিজেও এই পাঠাগারে নিয়মিত আসেন। বই পড়েন, পত্রিকা পড়েন। দেশ ও দেশের বাইরের যাবতীয় খবরাখবর রাখেন। তার মতে, নিজেকে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই।

এছাড়াও তিনি গ্রামের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালে ৫০ জন নারীকে নিয়ে সেতুবন্ধন মহিলা উন্নয়ন সমিতির যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে জাহানারা বেগম এই সমিতির সভাপতি। এই সমিতির মাধ্যমে গ্রামের নারীরা যেমন তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় একত্রিত করতে পারছেন। তেমনি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে মোটা অংকের টাকা উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে পারছেন। পাশাপাশি সমিতির মাধ্যমে তিনি পাড়া-মহল্লায় মাদক ও বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করছেন।

গ্রামকে কুসংস্কারমুক্ত করতে সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এর ফলে জাহানারা বেগমের হাত ধরে পথচলা সেতুবন্ধন মহিলা উন্নয়ন সমিতি এখন গ্রামের নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ওতোপ্রোতভাবে ভূমিকা রাখছে।

জাহানারা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদীয় স্পিকার সবাই নারী কিন্তু তারপরও আমাদের দেশের গ্রাম অঞ্চলের সমাজ ব্যবস্থার কারণে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে গ্রামের নারীরা কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।

তিনি নারীশিক্ষার ওপর জোর দিয়ে আরো জানান, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য নারীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করতে হবে। আর এই লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জানতে চাইলে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর নীলফামারীর উপ-পরিচালক রাফিয়া ইকবাল বলেন, সেতুবন্ধন মহিলা উন্নয়ন সমিতি আমি পরিদর্শন করেছি। এখানকার মহিলারা সামাজিক বিভিন্ন কাজে বেশ তৎপর। গ্রামে থেকেও সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী অধিকার রক্ষায়।

বিশেষ করে জাহানারা বেগম এই নারীদের সংগঠিত করে বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছেন। জাহানারার হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামটি। জাহানারার মতো আরো অনেকে তৈরি হলে পরিবর্তন ঘটবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

এইচআর

 

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও