ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নেতাদের

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নেতাদের

সালাহ উদ্দিন জসিম ৮:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৯

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধে মিশ্র প্রতিক্রিয়া নেতাদের

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নিয়ে নানা মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেউ বলছেন, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির যাতাকলে শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়াই প্রয়োজন।

কেউবা বলছেন, ছাত্র রাজনীতি খারাপ কিছু নয়। এদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামসহ ঐতিহাসিক সব অর্জনে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ক্যাম্পসগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চার ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে অগণতান্ত্রিক ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে। শিক্ষাঙ্গণে প্রশাসনের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব প্রকট হবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে না।

বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের পর ১০ অক্টোবর ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটি তো সেনা শাসকদের কথা। ছাত্র রাজনীতি বা আন্দোলনের ফলে আমরা ভাষা, স্বাধীনতাসহ অনেক কিছুই অর্জন করলাম। আমি নিজেও ছাত্র রাজনীতি করেছি। তবে বুয়েট বা যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলে নিরাপদ শিক্ষার জন্য তারা এটা করতে পারে আমরা হস্তক্ষেপ করবো না।

গত ১১ অক্টোবর বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হল।  আবরাব হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে  এ ঘোষণা দেন বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। একই সঙ্গে  তিনি বলেন, ‘গোপনে কেউ ছাত্ররাজনীতি করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এরপর থেকে এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘খুশি’ হলেও রাজনীতি সচেতনরা বলেছেন, ‘এতে ছাত্রদেরই ক্ষতি হয়ে গেল’। শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার সুযোগটি বন্ধ হয়ে গেল।

জানতে চাইলে ডাকসু ভিপি নূরুল হক বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি, খালি খারাপ দিকই নয়, দেশের সব অর্জনে ছাত্রদের ভূমিকা আছে। তবে খারাপ দিকটির জন্য দায়ী দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব নির্ভর সেই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ঢালাওভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে আমরা নই। বরং আমরা বলছি, সুস্থধারার রাজনীতি বিকাশে অতি দ্রুত দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।’

ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘এদের ভাষা, স্বাধীনতাসহ গণতান্ত্রিক সব আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল ছাত্ররাই। সব অর্জনে তাদের বড় ভূমিকা ইতিহাসে অনস্বীকার্য। সেই ছাত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি মেনে নেয়ার মতো না। অপরাধ করলে শাস্তি হবে, শোধরানো সুযোগ দিতে হবে। সাংগঠনিকের পাশাপাশি দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু গুটিকয়েক অপরাধীর জন্য পুরো ছাত্ররাজনীতি ক্যাম্পাসে বন্ধের ফলে ক্ষতির অংকটাই বেশি। এতে মৌলবাদী, উগ্রবাদি রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে। প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যাবে, শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার কেউ থাকবে না।’

ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকি আক্তার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নতুন কিছু না। এ পর্যন্ত চার বার তারা এরকম নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কার্যত সেখানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাড়া কেউ রাজনীতি করতে পারেনি। আমি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি থাকতে সেখানে একটা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম করতে গিয়েও  তা করতে পারিনি।

তিনি বলেন, বুয়েটে ছাত্রলীগের টর্চারও নতুন কিছু নয়। আবরার মারা যাওয়ায় সেটা বেশি করে ফলাও হচ্ছে হয়ত। সেখানে ছাত্ররাজনীতি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলে বরং আজকের এই পরিস্থিতি হতো না।

লাকি আক্তার বলেন, অপরাধ করলো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। নিষিদ্ধ করা হলো ছাত্ররাজনীতি, কেনো? ছাত্রলীগের অপরাধের দায় কোনো সবাই নেবে? কর্তৃপক্ষ কি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে বুয়েটকে কিন্ডার গার্টেন বানাতে চায়? মাথা ব্যথা হলে চিকিৎসা না করে মাথা কেটে ফেলার মতো। এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ হবে না বরং উগ্রবাদীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে বুয়েট।

প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক আল কাদির জয় বলেন, ছাত্র রাজনীতি আজকের এই বাংলোদেশ তৈরি করেছে; ডাকসু আছে, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে। বুয়েটেও সেই গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি থাকলে আজকের পরিবেশ হতো না। আমি বলবো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশসনের পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও যেনো এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।

তিনি বলেন, খুন, দখলদারিত্ব ও নির্যাতনের দায়ে বুয়েটে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা দরকার ছিল। কিন্তু একেবারে রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে সেখানে অগণতান্ত্রিক ও উগ্রবাদী শক্তির অভয়ারণ্য হবে।

ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, এটি একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত।  আমরা দেখেছি, বুয়েটসহ যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কথিত ছাত্র রাজনীতি বন্ধ আছে সেখানেও প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ ও গোপনে ছাত্রশিবিরের তৎপরতা আছে। আর ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ফলে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র প্রবল হয়, ছাত্রদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।

এসইউজে/এমএইচ

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও