‘শুদ্ধি অভিযান এখানেও দরকার’

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

‘শুদ্ধি অভিযান এখানেও দরকার’

সালাহ উদ্দিন জসিম ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৮, ২০১৯

‘শুদ্ধি অভিযান এখানেও দরকার’

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ তারই সহাপাঠিদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এ নিয়ে ইতিমধ্যে আন্দোলনে উত্তাল বুয়েট, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ। রাজনীতিসহ নানা কারণে ভিন্নমত থাকলেও এ নিয়ে কমবেশি সবাই মর্মাহত। মেধাবীদের হাতে মেধাবী খুন, এটি কেউই মেনে নিতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মিডিয়াজুড়ে এখন শুধুই আবরার।

যদিও এমন হত্যাকাণ্ড ক্যাম্পাসে প্রথম নয়। নানা সময়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে এমন খুনের নজির রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রায় অর্ধশত নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে বহিষ্কার করেই ক্ষান্ত হয়েছে সংগঠন। তদন্তে গাফিলতি, বিচারিক ফাঁক-ফোকর, আর প্রশাসনের দায়সারা ব্যবস্থায় এ যেনো বেড়েই চলেছে। এখনই এর লাগাম টানার দরকার বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।

এ সংকট উত্তরণে সমাধান জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞগণ পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে বলছেন, ‘কোনো শিক্ষার্থীই রাজনৈতিক পরিচয়ে ভর্তি হয় না। সে তার মেধা ও যোগ্যতায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আসে। তার উচ্চ শিক্ষার নিরাপদ পরিবেশ দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা সেটা দিতে পারছি কীনা, না পারলে কোনো পারছি না? সমস্যা চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তারা বলছেন, ‘আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে এক ধরনের গলদ ঢুকে গেছে। এটা চিহ্নিত করে সমাধানে ব্যবস্থা নিতে হবে। পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক গুণাবলী অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য শিক্ষা কারিকুলামেরও পরিবর্তন দরকার।’

বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষক রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতির প্রক্রিয়াগত সংস্কার এবং প্রয়োজনে এখানেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী শুদ্ধি অভিযান চলানোর পরামর্শ বিশিষ্টজনদের।

এ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘একজন তরুণ প্রতিভাবান নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। এটা শুধু একটা পরিবারের ক্ষতি নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। সহপাঠির হাতে সহপাঠি খুন কোনো দেশেই গ্রহণযোগ্য না। এটা খুব দুঃখজনক। একজন অভিভাবক হিসেবে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘মেধার সঙ্গে মানবিক গুণাবলী থাকতে হবে। মানবিক গুণাবলী না থাকলে যেকারো হাত দিয়ে এমন জঘন্য কাজ হতে পারে। এজন্য আমাদের অভিভাবক, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজব্যবস্থার দায় আছে।  পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ; সব স্তরে মানবিক গুণাবলীর ওপর নজর দিতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘প্রথমত, এই হত্যাকাণ্ডে প্রমাণিত হলো বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। ভিন্নমত হলেই নির্যাতন ও মৃত্যু মেনে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এতে বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রশাসন নেই। ভিসি বা প্রাধ্যক্ষ প্রশাসন চালান না। চালালে, কী করে হলে নির্যাতন কক্ষ থাকলো? প্রাধ্যক্ষ কেনো এগুলোর খোঁজ রাখেন না?’

তিনি মনে করেন, ‘এখন সরকারকেই সব দেখতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দক্ষ প্রশাসনেরর মাধ্যমে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।’

সৈয়দ আনোয়ার বলেন, ‘সব বিশ্ববিদ্যালয় এখন উত্তপ্ত, এটা সরকারের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। এটা কাটিয়ে উঠতে সরকারকেই কাজ করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবরে আমি হতভম্ব হয়ে গেছি। আমি চরম মর্মাহত। এরা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি, পরীক্ষা দিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ভালো ভালো বিষয়ে তারা ভর্তি হয়েছে। নিঃসন্দেহে তারা দেশের সেরা মেধাবী। তাদের হাতে কীভাবে সহকর্মী খুন হয়?

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের কোথাও গলদ ঢুকে গেছে। এটা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে।’

একজন শিক্ষাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি মনে করেন, “আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন আনার সময় হয়েছে। পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দরকার। এজন্য আমাদের কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময়োপযোগী যে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চলাচ্ছেন, এখানেও সেটা দরকার।”

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সম্প্রতি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বুয়েটের আবরার ফাহাদ চলে গেছে। তার চলে যাওয়া কিছু বিষয় ইঙ্গিত করে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সংকট, শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নতুন করে চিন্তার সময় এসেছে। সবচেয়ে মেধাবীদেরও সঠিক পরিচর্যা না হলে, তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ না হলে- তাদের হাতে হত্যা-নির্যাতনের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটতে পারে। আবরার হত্যা এটাই প্রমাণ করে।’

তিনি মনে করেন, ‘শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শিষ্টাচার অর্জন ও মানবিক গুণাবলী বিকাশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপট বা চর্চা নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে হবে। কোনভাবে চর্চা করলে সঠিক পথে থাকবে ছাত্ররাজনীতি, এটা নিরূপণ করতে হবে।’

উল্লেখ্য, আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৭তম ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়। রোববার (৬ অক্টোবর) দিনগত রাত ৮টার দিকে শেরে বাংলা হলের ১০১১নং কক্ষ থেকে কয়েকজন আবরারকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর রাত দুইটা পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে ওই হলের একতলা ও দোতলার মাঝখানের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অভিযোগ ওঠেছে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ডিবি পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন। এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ১১ জনকে ছাত্রলীগ বহিষ্কারও করেছে।

এদিকে, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আবরারের বিক্ষুব্ধ সহপাঠিরা ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বুয়েটে তালা দিয়েছেন। দাবি না মানা পর্যন্ত শিক্ষা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, এমনকি ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ রেখে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

এসইউজে/এইচআর

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও