যে কারণে চাপে ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

যে কারণে চাপে ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ৫:৫০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

যে কারণে চাপে ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক

সম্প্রতি গণমাধ্যমের হট কেক ছাত্রলীগ। ‘ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের ওপর ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা’, ‘কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশ’, ‘খোঁজা হচ্ছে দুইজনকে সরিয়ে দেয়ার কৌশল’, এসব শিরোনামে নিউজ ভাইরালও হয়েছে। আসলে ঘটনা কী? কেনো ক্ষেপেছেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনা? বাজারে চাউর ছিলো; এটি সরাসরি শেখ হাসিনার দেয়া কমিটি। সেরাদের সেরা থেকে বাছাই করে কমিটি দিয়েছেন তিনি। আসলেই কি তাই?

ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষনেতা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন এমন একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মূলত ‘আপার কমিটি’ বলে কিছু নেই। আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের কমিটি হয় গঠনতন্ত্র মোতাবেক। সেখানে নেত্রী (শেখ হাসিনা) অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। শুধু কমিটি গঠন নয়, সব ক্ষেত্রে তার সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। তিনি নানা দিক নির্দেশনাও দেন। ছাত্রলীগও তেমন। তবে, ছাত্রসংগঠনে যেহেতু রাজনীতির হাতেখড়ি, এতেই প্রথম সংগঠন করার অভিজ্ঞতা হয়। যাকে আমরা বলে থাকি, ‘যৌবনের প্রথম প্রেম।’ এ কারণে ছাত্রসংগঠনের প্রতি সবার আবেগটা বেশি। নেত্রীও (শেখ হাসিনা) এর বাইরে নয়। এজন্য তিনি ছাত্রলীগকে বেশি আদর করেন, শাসনও করেন। সেই অভিভাবকত্বের যায়গা থেকে তিনি ছাত্রলীগের বিষয়টা তদারকি করছেন, আমরা জাস্ট তার নির্দেশনা বাস্তবায়ন করি মাত্র।

হঠাৎ কেনো এত ক্ষুব্ধ হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা? জবাবে নেতারা বলছেন, ‘এটা হঠাৎ বলে মনে হয় না। কারণ একদিনের দু-একটা অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিশ্চয়ই এমনটা হয়নি। তবে ওই দিনের মিটিং জাস্ট উপলক্ষ হতে পারে।’ অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকে নানা অভিযোগ থাকতে পারে। যার কারণে ৭ সেপ্টেম্বরের সভায় নেতাদের অভিযোগ শুনে নেত্রী ক্ষুব্ধ হলেন।

৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সরিয়ে দিতেও বলেছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। যদিও পরদিন সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

এই ঘটনার রেশ না কাটতেই ১০ সেপ্টেম্বর মধুর কেন্টিনে ছাত্রলীগ সভাপতির গাড়িতে ওঠা নিয়ে দুই সহ-সভাপতির মারামারি, সাংবাদিককে জোর করে তুলে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা ছাড়া আরও নানা অভিযোগে জর্জরিত ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার গণভবনে প্রবেশের স্থায়ী পাস বাতিল করা হয়। এ নিয়ে বেশ চাপে আছে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

জানা গেছে, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নিজের বলয় শক্তিশালি করতে ও গ্রুপ ভারি করতে ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান অনেকে। সভাপতি-সম্পাদক পদে নিজের লোক বসাতে বেশ প্রতিযোগিতাও হয় আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের মধ্যে। কেন্দ্রের এ প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান না হলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ নিয়ে সংঘাতও হয়। এমপি-মন্ত্রী ও জেলা-উপজেলা সভাপতিদের মধ্যকার এ দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাও আছে অনেক। এরপরও এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর নানা কারণে নির্ভর করতে হয় ছাত্রলীগ নেতাদের।এই নির্ভরতা সুখের হয়, যতক্ষণ কমিটি গঠন থেকে শুরু করে সবকিছু নেতার নির্দেশে হয়। বিনিময়ে নানা সুযোগ সুবিধাও পাওয়া যায়। নেতার অবাধ্য হলে- গোস্যা করে নেতা তার অভিভাবকত্ব ছেড়ে দেন, সুবিধার পথ বন্ধ করে দেন। এমনকি ওপরে অভিযোগও করেন।

বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, বর্তমান ছাত্রলীগেও এই সংকট আছে। তারা কমিটি করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতার কথা রাখেন নি। এছাড়াও দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া ও দেরিতে ওঠা, নেতাদের ফোন না ধরা, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগে গ্যাপ, কমিটি বাণিজ্য ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তিন প্রজন্মের দলীয় আদর্শ দেখে বর্তমান ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক বাছাই করা হয়েছে। নেত্রীসহ আমরা আশা করেছিলাম- ছাত্রলীগের এই নেতৃত্ব লোভ ও ক্ষোভের উর্ধ্বে ওঠে সংগঠনকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু তারা এসেই প্রথম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে; নিজেরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। নেত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের চার নেতার তত্ত্বাবধানে তাদের কমিটি করতে হলো। সেখানেও ‘বিতর্ক’ ছিল; অনেক যোগ্য বাদ পড়েছে, অযোগ্যদের স্থান দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে পদবঞ্চিতরা আন্দোলনও করেছে। এগুলো সামাল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক।’

তারা আরও বলেন, ‘জেলা ইউনিটগুলোরও সম্মেলন দিতে পারেনি। নানা কর্মসূচিও সেভাবে পালন করতে দেখা যায়নি। সবকিছুতে দায়সারা ভাব। এরমধ্যে আবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ, এসব নিয়ে মূলত ক্ষুব্ধ হয়েছেন নেত্রী।’

তবে ছাত্রলীগের এই দুই শীর্ষনেতার ভাগ্যে কী আছে? জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে শনিবার পর্যন্ত। সেদিন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভা রয়েছে। সেখানে হয়ত এ নিয়ে আলোচনা হবে।

ভেতরে ভেতরে নানা কথা বললেও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য প্রায় একই রকম। বুধবার সচিবালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এটা আমাদের পার্টির একদম ইন্টারনাল কিছু বিষয় আছে- যেমন ছাত্রলীগের ব্যাপারটা পুরোপুরিভাবে সরাসরি নেত্রী নিজেই দেখেছেন এবং তিনি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রী দেখছেন। ছাত্রলীগে কোনো সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন, সংশোধনের প্রশ্ন আসলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই করবেন।’

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানও পরিবর্তন ডটকমকে প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো আপডেট নাই। দলের সভাপতি নিজেই বিষয়টি দেখছেন। তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন।’

এসইউজে/

 

রাজনীতি: আরও পড়ুন

আরও