বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল পত্রিকাগুলো

ঢাকা, শনিবার, ৯ নভেম্বর ২০১৯ | ২৪ কার্তিক ১৪২৬

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল পত্রিকাগুলো

প্রীতম সাহা সুদীপ ৪:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৯

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল পত্রিকাগুলো

“ঐ মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে।” ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল ছবি দিয়ে এই শিরোনামেই সংবাদ প্রকাশ করেছিল দৈনিক ইত্তেফাক।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিপান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর তিনি লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে ১১ জানুয়ারি স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিনই ওই শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশ করে ইত্তেফাক।

অথচ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করলো, পরদিন বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগীদের গুণগান করে সংবাদ প্রকাশ করেছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সকল পত্রিকা।

“ঐতিহাসিক নবযাত্রা” এই শিরোনামে ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “দেশ ও জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণে গতকাল প্রত্যুষে প্রবীণ জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী সরকারের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছেন।”

আর পত্রিকাটির মূল সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘দুর্নীতি স্বজন প্রীতি উচ্ছেদ।। সুবিচার ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ।’

এছাড়া পত্রিকাটির প্রথম ও দ্বিতীয় পাতায় বড় করে নতুন রাষ্ট্রপতি মোশতাকের ভাষণও প্রকাশ করেছিল।

১৮ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতি বাদশাহ খালেদ ও প্রেসিডেন্ট নিমেরীর অভিনন্দন, সৌদী আরব ও সুদানের স্বীকৃতি।’

ঠিক তার নিচের কলামে ছোট করে প্রকাশ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দাফনের সংবাদ, যার শিরোনাম ছিল- ‘পূর্ণ মর্যাদায় স্বগ্রামে পরলোকগত রাষ্ট্রপতির দাফন সম্পন্ন।’

স্বাধীনতা সংগ্রামের কান্ডারি, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার; বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার চিত্র তুলে ধরে বিস্তারিত সংবাদ কোনো পত্রিকাতেই আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়নি।

অথচ বঙ্গবন্ধু যেদিন প্রথম যুদ্ধবিদ্ধস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন তার পরদিন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকাটির মূল শিরোনাম ছিল ‘ভেঙ্গেছে দুয়ার, এসেছে জ্যোতির্ময়।’ অথচ সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার ঠিক পরদিনই এই পত্রিকাটিও মুখরিত হয়েছিল খুনিদের জয়গানে।

পঁচাত্তরের ১৬ আগস্ট দৈনিক বাংলার মূল সংবাদের শিরোনাম ছিল- ‘শেখ মুজিব নিহত: সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি: সশস্ত্র বাহিনীগুলোর আনুগত্য প্রকাশ-খোন্দকার মুশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি।’ আর শেষ পাতায় প্রকাশ করা হয় খোন্দকার মুশতাকসহ অন্যান্যদের জুমার নামাজ আদায় ও শপথ গ্রহণের বেশ কয়েকটি ছবি। আর মাঝখানে এক কলামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণের অভিনন্দন।’

জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়- ‘সশস্ত্র বাহিনী যে বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নিয়েছেন সেজন্য তাদের প্রতি অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি আসছে। এক ক্রান্তিলগ্নে জাতিকে রক্ষা করার জন্যে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ ও নয়া সরকারের প্রতি তাদের আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান এক বিবৃতিতে মুজিব সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশকে রক্ষা করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি স্বার্থহীন সমর্থন ও আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।’

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে খোন্দকার মুশতাক ও তার সহযোগীদের ক্ষমতা দখলকে একটি নতুন যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল ইংরেজি পত্রিকা 'দ্য বাংলাদেশ টাইমস'। পত্রিকাটি 'On the Threshold of a New Era' অর্থ্যাৎ 'একটি নতুন যুগের দোরগোড়ায়' শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল।

আরেকটি জনপ্রিয় পত্রিকা দ্য বাংলাদেশ অবজারভার বঙ্গবন্ধু হত্যাকে ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সম্পাদকীয়তে- যার শিরোনাম ছিল 'historical necessity'।

অথচ ঠিক তার আগের দিন ১৫ আগস্ট অবজারভারের প্রধান প্রতিবেদনটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর যোগ দেওয়ার কর্মসূচি নিয়ে। এ বিষয়ে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রও ছেপেছিল পত্রিকাটি। এছাড়া ওই দিনের আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসায় কোরিয়ান দূত।

১৯৭৫ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার সহকারী সম্পাদক ছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরদিন থেকে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোর যে বিতর্কিত ভূমিকা দেখা গেছে, তা মূলত সামরিক আইনের কারণে এমনটাই মনে করেন এই সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা।

শাহরিয়ার কবির বলেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মার্শাল ল জারি ছিল। মার্শাল ল'তে নিজস্ব মতামত বলতে কিছু থাকে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না। গণমাধ্যমের তখন কোন স্বাধীনতা ছিল না। উচ্চপর্যায় থেকে নিউজ সেন্সর করে পাঠানো হতো, সেগুলোই ছাপতে হত।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যম কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি দাবি করে তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের পরদিন নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের খবর চেপে গিয়েছিল দেশের গণমাধ্যমগুলো, এটা মিডিয়ার জন্য কালো অধ্যায়। তখন কেউই কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামান্য প্রতিবাদ করেছিল। আর কিছু লেখক-কবি তাদের লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তবে সেসব লেখা মূল ধারার কোন পত্রিকায় আসেনি।

রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ এভিনিউয়ে অবস্থিত আরকাইভস-ও-গ্রন্থাগার-অধিদপ্তরে এখনও সংরক্ষিত আছে তখনকার পত্রিকাগুলো।

পিএসএস/এসবি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও