পানি সংকটে থমকে গেছে রাঙ্গামাটির জীবন

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

পানি সংকটে থমকে গেছে রাঙ্গামাটির জীবন

প্রান্ত রনি, রাঙ্গামাটি ৮:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০১৯

পানি সংকটে থমকে গেছে রাঙ্গামাটির জীবন

পানি সংকটে থমকে গেছে রাঙ্গামাটির জনজীবন। চলাচলের একমাত্র অবলম্বন নৌপথ পানির নাব্যতা সংকটে বন্ধ। যার কারণে এক উপজেলা থেকে অপর উপজেলা ও জেলার যাতায়াত বিঘ্নিত হচ্ছে। নিত্য পণ্য পরিবহনসহ নানা সংকট প্রকট হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ হবার উপক্রম দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের।

জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় বন্ধ হওয়ার উপক্রমে দেশের একমাত্র জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। অন্যদিকে হ্রদে পানি কমে যাওয়া ও নাব্য সংকটে গত দুই মাস ধরে জেলা শহরের সঙ্গে ছয় উপজেলার লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ছয় উপজেলায় বসবাসরত প্রায় ২লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ। এখন এই চরম দুর্ভোগের দিনে প্রকৃতির দিকেই তাকিয়ে আছেন সবাই।

আয়তনে দেশের সবচে বড় জেলা পার্বত্য রাঙ্গামাটি। ৬ হাজার ১১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনে বিস্তীর্ণ এ জেলার দশটি উপজেলার মধ্যে ছয়টির সঙ্গেই যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যম নৌপথ। গত প্রায় দুইমাস (২২ এপ্রিল) থেকে রাঙ্গামাটি শহরের সঙ্গে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আয়তনে দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়িসহ লংগদু, জুরাছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি ও নানিয়ারচরের জেলার সঙ্গে এখন যোগাযোগ নাই বললেই চলে। হ্রদ সৃষ্টির ৬০ বছর পরও সড়ক পথ নির্মিত না হওয়া নৌপথই ভরসা এইসব উপজেলার মানুষের। ফলে এসব উপজেলায় বসবাসকারী প্রায় ২লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ ব্যাপক বিড়ম্বনায় পড়েছে।

এর মধ্যে বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচরে বেশ ঘুরাপথে সড়ক যোগাযোগ থাকলেও বাকি চার উপজেলায় নৌপথের কোনো বিকল্পই নেই। পানি কমে যাওয়ায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার বিশাল আয়তনের কাপ্তাই হ্রদের বুকে জেগে উঠা চর ও টিলাসমূহের কারণে ছোট ছোট  ইঞ্জিন বোট চলাও বেশ কঠিন হয়ে গেছে। ফলে ছয়টি উপজেলার মানুষের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ। পণ্য পরিবহণ কিংবা যাতায়াতে সময় ও  ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় বাড়ছেনা পানি, কাটছেনা সংকট।

এদিকে, দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির পরিমাণ ছিলো ৭৪.৮৭ এমএসএল (মেইন সি লেভেল)। অথচ এই সময়ে পানি থাকার কথা ৭৮ থেকে ৮০ এমএসএল।

কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএম আবদুজ্জাহের জানান, প্রতিবছরই এই সময়ে কাপ্তাই হ্রদে পানি কমে যায়। এবারের মতো কখনোই পানি এতো নীচে থাকে না। এই বছর এখনো বৃষ্টিপাত শুরু না হওয়ায় খুবই বিপাকে পড়তে হয়েছে আমাদের। আমাদের হ্রদে পানি ভর্তি অবস্থায় পাঁচটি ইউনিটে প্রায় ২৩০ মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। পানি প্রবাহ কমে আসায় কিছুদিন আগেও দুইটি ইউনিটে প্রায় ৭০ মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। এখন হ্রদের পানি এত কম যে, মাত্র একটি ইউনিট চালু আছে। এক ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৩৬/৩৮ মেগাওয়াট। তাই আমরা এখন বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছি।

জেলার অন্যতম বৃহৎ বাজার মাইনী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কামাল পাশা চৌধুরী বলেছেন, ‘হ্রদের পানি অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় বাজারের পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বড় বোটতো আসতেই পারছেনা, ছোট ছোট বোটে পণ্য পরিবহেন সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। পর্যাপ্ত পণ্যও আনা যাচ্ছে না। আবার অনেক দূর থেকে পণ্য বাজারে তুলতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়তি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি শনিবারের জমজমাট বাজারও এখন ঠিকমতো জমছে না, কারণ দূর থেকে মানুষজন আসতে পারছেনা।

কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল ও যাত্রী পরিবহন সংস্থার জেলা সভাপতি মঈনুদ্দিন সেলিম জানান, জেলার এই ছয়টি উপজেলায় প্রায় ৪৫টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করে। গত দেড়মাস যাবত সব বন্ধ। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আমাদের প্রায় ১৩০০ শ্রমিক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। মানুষের ভোগান্তিরও শেষ নেই। বৃষ্টি হওয়া ছাড়া আপাতত এর কোনো সমাধানও নেই।

তিনি আরও বলেন, তবে বিআইডব্লিউটিএ এবং স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিয়ে যদি সুভলং এর একটি পয়েন্টে সামান্য ড্রেজিং এর কাজ করতো তাহলে অন্তত নৌ-পথে লংগদু পর্যন্ত লঞ্চ চালু রাখা যেতো। কিন্তু তারা যেহেতু এটা করেননি। কাপ্তাই হ্রদের নৌ পরিবহন ও যাত্রীসেবা কিংবা উন্নয়ন নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র কোনো মাথা ব্যাথা নেই বলেও অভিযোগ করেন মঈনুদ্দিন।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, হ্রদে লঞ্চ চলাচল না হওয়ায় কিছুটা জনদুর্ভোগ বেড়েছে। তবে হ্রদ ড্রেজিংয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।

পিআর/এসইউজে

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও