শেষ পর্ব: সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি সেক্টর, এগিয়ে যেতে বাধা কোথায়?

ঢাকা, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

শেষ পর্ব: সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি সেক্টর, এগিয়ে যেতে বাধা কোথায়?

তাসলিমুল আলম তৌহিদ ১:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

শেষ পর্ব: সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি সেক্টর, এগিয়ে যেতে বাধা কোথায়?

বিশ্বব্যাপী মাংস উৎপাদনে পোল্ট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল উপাদান। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও পুষ্টি বিবেচনায় পোলট্রি মাংস ও ডিমের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে বাড়ছে উৎপাদন। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন বিশ্ববাজারে পোলট্রি পণ্য প্রবেশের জন্য প্রস্তুত।

গার্মেন্টস শিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এ শিল্প। এ শিল্পে সরাসরিভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ জড়িত। আর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবমিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এখন এ শিল্পের সাথে জড়িত। আর এই বৃহৎ সংখ্যক মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। 

বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) তথ্য মতে, জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ২.৫ শতাংশ। তার মধ্যে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ১.৫-১.৬ শতাংশ। আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫শ’ কোটি টাকা। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। 

কিন্তু এতকিছুর পরেও ভালো নেই এই সেক্টরের খামারি বা উদ্যোক্তারা। 

বর্তমানে এই শিল্পের সাথে জড়িত ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীদের অবস্থা ভালো না, অনেক পোল্ট্রি খামারি তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। অনেকে ব্যবসা করতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। 

বিগত কয়েক বছরে ছোট ছোট খামারির সংখ্যা কমছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) তথ্য মতে,     সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে। 

আর জাতীয় পোল্ট্রি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ২০১০ সালের জুনে আমাদের একটা সার্ভে করা হয়েছিল সেখানে খামারির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৬। বর্তমান খামারি সংখ্যা ৮২ থেকে ৮৩ হাজার। অর্থ্যাৎ বিগত ৮ বছরে একাধিক খামার বন্ধ হয়েছে। 

এগিয়ে যেতে বাধা কোথায়? 

বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি (বিপিআইসিসি) বেশ কিছু কারণে অগ্রসরমান এ শিল্পটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করে। 

কর ও শুল্ক আরোপে খরচ বৃদ্ধি 

বিপিআইসিসি সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে পোল্ট্রি শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোল্ট্রি ফিডের প্রধান দু’টি উপকরণ (যা মোট ফিডের প্রায় ৮০ ভাগ) ভুট্টা ও সয়াবিন অয়েল কেকের ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ভুট্টার ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল আছে এবং সয়াবিন অয়েল কেকের কাস্টমস শুল্ক শূন্য করা হলেও নতুনভাবে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি আরোপ করা হয়েছে। 

টাকার অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ এবং কর ও শুল্ক আরোপের কারণে বিগত তিন বছরে উৎপাদন খরচ ক্রমেই বেড়েছে এবং আরও বাড়বে বলে তারা ধারণা করছে। 

ঋণে সুদের হার বেশি 

বিপিআইসিসির অভিযোগ, দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেক বেশি। বিদেশি কোম্পানিগুলো যেখানে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ হার সুদে ঋণ এনে এদেশে ব্যবসা করছে। সেখানে বড় খামারি বা উদ্যোক্তাগণও ১০ থেকে ১২ শতাংশের নিচে ঋণ পাচ্ছেন না। 

অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ তারা ব্যাংক থেকে সাধারণত কোনো ঋণ পান না। ফলে তারা এনজিও কিংবা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে টিকে থাকতে না পেরে ঝরে পড়ছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা। 

দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাংক ঋণের সুদের হারে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের বিশাল ব্যবধান আছে। যার কারণে এই শিল্পে টিকে থাকতে পারছে না ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারগুলো। 

বিপিআইসিসির মতে, পোল্ট্রির পাইকারি বাজারে খামারি কিংবা উদ্যোক্তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ সেক্টরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এত বেশি যে খামারিরা রীতিমত অসহায়। 

মাঠ পর্যায়ে এমনই অভিযোগ করেছেন লেয়ার ডিম উৎপাদনকারী খামারি টাঙ্গাইল সখিপুরের কবির হোসেন। 

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, সাধারণত টাঙ্গাইলে যারা খামারি আছেন, তারা সবাই মিডিয়াতে (ডিম ব্যবসায়ীদের সাথে মধ্যস্থতাকারী) ডিম দিয়ে আসি। মিডিয়া পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ডিম বিক্রি করে আমাদেরকে টাকা দেয়। এখন তারা যদি একটা ডিম ৫ টাকা বা ৫ টাকা ৫০ পয়সা বিক্রি হয়েছে বলে, সেটা আমাদের বিশ্বাস করে নিতে হয়। কিছু্ই করার থাকে না। এক কথায় তাদের হাতে বন্দি। 

পোল্ট্রি নীতিমালা 

পোল্ট্রি শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ‘পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০০৮’ প্রণয়ন করেছে। এই নীতিমালার সীমাবদ্ধতা কিংবা সংস্কার বিষয়ে পোল্ট্রি সংশ্লিষ্টরা সোচ্চার বেশ আগে থেকেই। নীতিমালায় যা কিছু বলা আছে তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। 

বিপিআইসিসির অভিযোগ, সারা দেশে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ কার্যালয় আছে কিন্তু শুধুমাত্র পোল্ট্রি নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় তাদের নেই; কারণ গরু, মহিষ, মাছ প্রভৃতি বিষয়ক কাজে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। তাছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারির সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়। 

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর কর আরোপ 

দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাংক ঋণের সুদের হারে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের বিশাল ব্যবধান আছে। ফলে প্রতি বছর ঝরে পড়ছে অসংখ্য দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তা। তাই লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর নতুন কিছু কর আরোপ কিংবা দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কিছু ছাড় কিংবা প্রণোদনার ব্যবস্থা করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। 

বর্তমানে ৭টি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের ব্যবসা করছে। এগুলো হলো- ভিএইচ গ্রুপ, গোদরেজ, সেগুনা, টাটা, অমৃত গ্রুপ, সিপি এবং নিউ হোপ। এসব কোম্পানি এরই মধ্যে পোল্ট্রি শিল্পের ৪০ শতাংশের বেশি বাজার দখল করে নিয়েছে। 

বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোন কোন খাতে তারা বিনিয়োগ করতে পারবে, সর্বোচ্চ কী পরিমাণ মার্কেট শেয়ার নিতে পারবে, কি পরিমাণ মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে কিংবা রি-ইনভেস্ট করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। 

অনিবন্ধিত খামার, ফিড মিল 

অনিবন্ধিত খামার, ফিড মিল এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই সরকারিভাবে নিবন্ধিত হতে হবে বলে মনে করে বিপিআইসিসি। 

একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে; সম্ভব হবে ডিম, মুরগির মাংস, পোল্ট্রি ফিডসহ অপরাপর পোল্ট্রি পণ্যের মান-নিয়ন্ত্রণ এবং মানোন্নয়ন করা। 

বার্ড-ফ্লু ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ 

পোল্ট্রি সেক্টরে সমস্যা হিসেবে বিপিআইসিসি চিহ্নিত করেছে। তার মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন ভাইরাস আক্রমণ। লো-প্যাথজেনিক ভাইরাসের (H9N2) কারণে খামারিরা বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ক্ষেত্র বিশেষে উৎপাদন ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে। বেশি ক্ষতি হচ্ছে ব্রিডার্স ইন্ডাস্ট্রিতে। 

খামারিরা হাইলি প্যাথজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস H5N1 এর ভ্যাকসিন আমদানি ও ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে খামারিরা, কিন্তু লো-প্যাথজেনিক ভাইরাস H9N2 এর ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি পায়নি এখনও। 

একদিকে যেমন ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি প্রয়োজন অন্যদিকে তেমনই দেশীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদন করাও জরুরি। কারণ জীবাণুরা খুব দ্রুত নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে পুরাতন ভ্যাকসিন, নতুন স্ট্রেইনের প্রতিষেধক হিসেবে কোনো কাজে আসে না। গুরুতর এ বিষয়টি নিয়ে এখনও উদাসীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।  

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বৃহত্তর স্বার্থে পোল্ট্রি সেক্টরকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কর অব্যহতি সুবিধা প্রদান করার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে। 

তিনি বলেন, ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ ডিম অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডিম উৎপাদন করতে হবে এবং দৈনিক প্রায় ৫ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদন করতে হবে।

সার্বিক বিচারে পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগ হতে হবে প্রায় ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করতে হবে আরও প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। আর এই জন্য সরকার থেকে শুরু করে সকল মহলের সহযোগিতা দরকার। 

টিএটি/এসবি
আরও পড়ুন...
পর্ব-১: বহুজাতিক কোম্পানিতে জিম্মি পোল্ট্রি খামারিরা
পর্ব-২: দেশের প্রাণিজ আমিষের ৪০-৪৫% যোগায় পোল্ট্রি শিল্প