পর্ব-২: দেশের প্রাণিজ আমিষের ৪০-৪৫% যোগায় পোল্ট্রি শিল্প

ঢাকা, বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ | ৩ মাঘ ১৪২৫

পর্ব-২: দেশের প্রাণিজ আমিষের ৪০-৪৫% যোগায় পোল্ট্রি শিল্প

তাসলিমুল আলম তৌহিদ ১:২৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৬, ২০১৯

পর্ব-২: দেশের প্রাণিজ আমিষের ৪০-৪৫% যোগায় পোল্ট্রি শিল্প

বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য, প্রাণিজ আমিষ এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি শিল্প অসামান্য অবদান রাখছে। দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই যোগান দেয় পোল্ট্রি শিল্প। পোল্ট্রি খাতই সবচেয়ে সস্তায় প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করে চলেছে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বাড়ার কারণে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে হলে পোল্ট্রি শিল্পের বিকল্প নেই। কেননা বৃহত্তর কৃষি সেক্টরে এটিই একমাত্র সেক্টর যা ভার্টিক্যালি বাড়ানো সম্ভব, অন্য কোনো সেক্টর বাড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন পোল্ট্রি সংশ্লিষ্টরা।

তবে এই পোল্ট্রির শিল্পের মাংস বা ডিম কতটুকু নিরাপদ এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংশয় থাকে। এক ধরনের অরুচি কাজ করে মাংসে।

এ বিষয়ে জনতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাখওয়াত আলীর কাছে।

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এক কথায় বলতে গেলে এই ডিম সর্বোচ্চ নিরাপদ। এখানে কোনো ভেজালের সুযোগ নেই। পুষ্টির দিক থেকে অনেক ভালো।

পোল্ট্রির মাংসের ব্যাপারে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণে আমরা সবসময় ‘রেড মিট’ এর পরিবর্তে ‘সাদা মাংস’ নিরাপদ বলে থাকি। সেই তুলনায় বরং খারাপ গরুর বা ছাগলের মাংস। আর তাছাড়াও মুরগির মাংসে ফ্যাট কম থাকে।

তিনি বলেন, অন্যান্য প্রোটিন পিছে যত টাকা খরচ হবে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে দ্বিগুণ প্রোটিন লাভ করতে পারবে মানুষ এই পোল্ট্রির ডিম বা মাংস থেকে। উদাহরণ হিসেবে জানান- ইলিশ ২২ গ্রাম প্রোটিন দাম ৯০ টাকা, দুধে ২৫ গ্রাম প্রোটিন দাম ৫৪ টাকা। সেখানে ৪টা ডিমে ২৫ গ্রাম প্রোটিন লাভ করা যাবে মাত্র মাত্র ৩২ টাকায়। 

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ সম্প্রতি ডিমের উপকারিতা নিয়ে একটা প্রতিবেদনে বলেন, ডিমে হাউকোয়ালিটি প্রোটিন আছে। এছাড়া সু-স্বাদু ও আকর্ষণীয় শুকনা খাবার। কম খরচে মানুষকে কর্মশক্তি সম্পন্ন করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটনারি এন্ড অ্যানিমল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কেএম মোস্তাফিজুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ব্রয়লার মুরগি অবশ্যই আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী। এখানে অনেকে হয়তো মনে করে ওষুধের কারণে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু যখন আপনি রান্নার জন্য হিট দিচ্ছেন যদিও কোনো অ্যান্টিবায়োটিক থাকে তা হিটের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই এটাকে ক্ষতিকর বলার সুযোগ নেই।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে পোল্ট্রি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে বছরে অন্তত ৪৩ দশমিক ৮০ কেজি প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির (বিপিআইসিসি) মতে- বাংলাদেশের মানুষ প্রোটিন গ্রহণ করে গড়ে মাত্র ১৫ দশমিক ২৩ কেজি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা মতে- দেশে দৈনিক মুরগির মাংসের ঘাটতি জনপ্রতি প্রায় ২৬ গ্রাম এবং ডিমের ঘাটতি প্রায় ২৩ গ্রাম। ফলে শূন্য থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৮.৭ শতাংশ খর্বাকৃতির, ৩৫.১ শতাংশ কম ওজনের এবং ১৬.৩ শতাংশ ক্ষীণকায় হচ্ছে।

বাংলাদেশ আরবান হেলথ সার্ভে-২০১৩ রিপোর্ট অনুযায়ী ৫ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশির প্রায় ৫০ ভাগ বস্তিবাসী শিশু এবং ৩৩ শতাংশ বস্তির বাইরে বসবাসকারী শিশু খর্বাকৃতির হচ্ছে। এর মূল কারণ হিসেবে অপুষ্টিকেই দায়ী করা হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, পুষ্টি-স্বল্পতা এবং অপুষ্টি মোকাবেলা করতে হলে মাংস খাওয়ার পরিমাণ বছরে অন্তত: ৭.৩ কেজিতে উন্নীত করতে হবে। আর এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বছরে মাথাপিছু ৩৩ কেজি লীন মিট অথবা ৪৫ কেজি মাছ অথবা ৬০ কেজি ডিম অথবা ২৩০ কেজি দুধ খেতে হবে।

পুষ্টিকর খাদ্য ডিম ও মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অনেক নিচে

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে- বছরে জনপ্রতি অন্তত: ১০৪টি ডিম খাওয়া দরকার। অথচ বাংলাদেশের মানুষ খাচ্ছে গড়ে মাত্র ৯০টি ডিম। এশিয়ার দেশ জাপানের মানুষ খায় বছরে গড়ে প্রায় ৬০০টি ডিম।

স্বাস্থ্যগত কারণে সারাবিশ্বেই ‘রেড মিট’র পরিবর্তে ‘সাদা মাংস’ অর্থাৎ মুরগির মাংসের চাহিদা বাড়ছে।

বিপিআইসিসির প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে- উন্নত বিশ্বের মানুষ বছরে মুরগির মাংস খায় প্রায় ৪০-৪৫ কেজি। আর সেখানে বাংলাদেশের মানুষ খাচ্ছে বছরে গড়ে মাত্র ৬.৩ কেজি। কাজেই ওই ঘাটতি পূরণ করতে হলে ডিম এবং মুরগির মাংসের উৎপাদন অনেকগুণ বাড়াতে হবে। এই ঘাটতি পূরণ যা কেবল পোল্ট্রি শিল্পই পূরণ করতে পারে বলে মনে করেন বিপিআইসিসি।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা স্বাস্থ্যবান মেধাবী জাতি গড়ার ক্ষেত্রে পোল্ট্রি শিল্পের ভূমিকা কতখানি?

২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে সামিল হবে। মাথাপিছু আয় ২০০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে সরকার।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে- অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা স্বাস্থ্যবান মেধাবী জাতি গড়ার ক্ষেত্রে পোল্ট্রি শিল্পের ভূমিকা কতখানি?

২০১৬ সালের শুরুর দিকে বিপিআইসিসি’র করা হিসাব অনুযায়ী- ২০২১ সালের চাহিদা মেটাতে হলে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ ডিম অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডিম উৎপাদন করতে হবে এবং দৈনিক প্রায় ৫ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদন করতে হবে।

সার্বিক বিচারে পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগ হতে হবে প্রায় ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের সাথে যুক্ত করতে হবে আরও প্রায় ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা। কারণ এ শিল্পের সাথে ডিম এবং মিট ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও, ব্রিডিং ও হ্যাচারি ইন্ডাস্ট্রি, ফিড ইন্ডাস্ট্রি, লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি, ওষুধ, কাঁচামাল এবং সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি জড়িত। কাজেই এ শিল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ ঘটতে থাকবে। 

পারিবারিক পুষ্টি

একজন মানুষ যখন খামার করেন তখন তার পরিবারে ডিম এবং মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ বাড়ে। এটা সহজ সাধারণ হিসাব। কারণ তখন তাকে টাকা দিয়ে ডিম কিংবা মুরগি কিনতে হয় না। আবার অন্যভাবে দেখুন- একজন স্বল্প আয়ের মানুষ ৮ বা ৯ টাকায় একটি ডিম কিনতে পারে। দরিদ্র পরিবারে ২টা ডিম দিয়ে ৪ জনের একবেলার তরকারি হয়ে যায়। এত কম খরচে অন্য কোনো প্রাণিজ আমিষের কথা কল্পনাও করা যায় না।

পোল্ট্রি শিল্পের অগ্রগতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রোটিন ইনটেকের পরিমাণ বেড়েছে এবং বাড়ছে। আমরা যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই তাহলেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন দেখতে পাব।

সেভ দ্য চিলড্রেনের Malnutrition In Bangladesh (মার্চ ২০১৫) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ১৯৯৭ সালে শিশুদের chronic malnutrition হার যেখানে ছিল ৬০ শতাংশ, ২০১১ সালে তা ৪১ শতাংশ নেমে এসেছে। বর্তমানে এ হার আরও নিম্নগামী। দেখা যাচ্ছে উন্নতি প্রায় ১৯ শতাংশ। ২০০৯-১১ সালে পোল্ট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮-২০ শতাংশ।

বিপিআইসিসির মতে- পোল্ট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধির সাথে অপুষ্টির হার কমার ক্ষেত্রে এক ধরনের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা বলছিনা যে কেবল মাত্র পোল্ট্রি’র কারণেই অপুষ্টির হার কমেছে। তবে পোল্ট্রি’র ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদনও যে অবদান রেখেছে তা বলা যেতে পারে।

পরিবেশবান্ধব পোল্ট্রি শিল্প

এদিকে শুধু পোল্ট্রি খাওয়ার ক্ষেত্রে ভালো তা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্প হচ্ছে পোল্ট্রি। সবচেয়ে কম জমির ব্যবহার, সবচেয়ে কম দূষণ, সবচেয়ে কম পানির খরচ, সব ধরনের বর্জ্যই রিসাইকেল হয়।

এ শিল্পে বর্জ্য বলে কিছু নেই। মুরগির ডিম ও মাংস আমরা খাই। এছাড়া ডিম দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন সামগ্রী। ডিমের খোসা দিয়ে তৈরি হয় জৈব সার, আর্ট ওয়ার্ক, ঘর-সাজানোর সরঞ্জামাদি। পোল্ট্রি’র বিষ্টা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বায়োগ্যাস, জৈবসার, বিদ্যুৎ। চিকেন ফেদার মিল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বায়োডিজেল, কাগজ, প্লাস্টিক, ফাইবারসহ আরও অনেক পণ্য।

বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে যে পরিমাণ বিষ্টা উৎপাদিত হচ্ছে তা যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় তবে তা রিসাইকেল করে প্রচুর পরিমাণ জৈব সার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে মনে বিপিআইসিসি।

বিপিআইসিসি সভাপতি মসিউর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, পোল্ট্রির এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সরকার এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্খিত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।

টিএটি/এসবি

আরও পড়ুন...
পর্ব-১: বহুজাতিক কোম্পানিতে জিম্মি পোল্ট্রি খামারিরা