নির্বাচন নিয়ে পুলিশের যত প্রস্তুতি

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

নির্বাচন নিয়ে পুলিশের যত প্রস্তুতি

প্রীতম সাহা সুদীপ ৫:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

নির্বাচন নিয়ে পুলিশের যত প্রস্তুতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সরগরম হয় উঠছে ভোটের রাজনীতি।

এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমার কার্যক্রম শেষ করেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারগ্রহণ শেষে মনোনয়ন যাচাই- বাছাই শুরু করবে দলটি। 

অন্যদিকে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমার কার্যক্রম শুরু করেছে। 

নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো এখন উৎসবের আমেজ। নির্বাচনী হাওয়া বইছে চায়ের দোকান, গণপরিবহন থেকে শুরু করে সব জায়গায়। 

ভোটারদের মধ্যেও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা আর আলোচনা সমালোচনা।

নির্বাচনী এলাকাগুলোতে পুরোদমে প্রচার প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। 

নির্বাচনের মাঠ যখন সরগরম তখন নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতা নিয়ে ‘ভয়’ করছে জনসাধারণের মনে।

কারণ গত শনিবার রাজধানীর আদাবর এলাকায় মনোনয়ন নিতে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাদেক খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের মধ্যেই একটি পিকআপের চাপায় আরিফ ও সুজন নামে দুইজন নিহত হন। 

তবে পুলিশ বলছে, নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকাতে তারা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।  

সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দফতরে মাসিক অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

সভায় আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল নির্বাচনী সহিংসতা। নির্বাচনে সহিংসতা হতে পারে এমন শঙ্কা ব্যক্ত করে সভায় খোদ ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।  

ঝুঁকিপূর্ণ আসন চিহ্নিত করতে রাজধানীকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ: 

ডিএমপি সদর দফতরের ওই সভায় নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলোকে চিহ্নিত করে রাজধানী ঢাকাকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র পরিবর্তন ডটকমকে নিশ্চিত করেছে। 

সূত্র জানায়, সভায় রাজধানীর আসনগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোকে এক ক্যাটাগরিতে রেখে, এরপর কম ঝুঁকিপূর্ণ ও কম গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোকে বাকি দুইটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এই তিন ক্যাটাগরির আসনগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক পৃথকভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে আসনগুলোতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কোন্দলও বিবেচনায় আনতে বলা হয়েছে। 

এসব এলাকায় যখন যা ঘটবে তাৎক্ষণিকভাবে তা সিনিয়র কর্মকর্তাদের জানানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কোনো তথ্য আড়াল করা যাবে না। সুই পরিমাণ কোনো ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। 

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি মিডিয়া মো. সোহেল রানা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো বাছাই করা হয়েছে। এসব আসনে যাতে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতি নিতেই ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো বাছাই করে আলাদা করা হয়েছে।   

পুলিশের নিরাপত্তার স্বার্থে রায়ট গিয়ার বাধ্যতামূলক: 

দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কিছু বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার। দায়িত্ব পালনের সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট, লেগ গার্ড ও রায়ট গিয়ার সামগ্রী বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে বলেছেন তিনি। পাশাপাশি ডিউটির সময় মোবাইলফোন ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন কমিশনার।  

নির্বাচনে কোনো গোষ্ঠী সহিংসতার চেষ্টা করতে পারে, চড়াও হতে পারে পুলিশের ওপর। তাই পুলিশকে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে রায়ট গিয়ারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সভায় উপস্থিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা। 

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের ছাড় না দেয়ার নির্দেশ: 

নির্বাচনী আচরণবিধি যারা ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাও জারি করেছে পুলিশ। সোমবারের বৈঠকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনাও দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।  

সভায় কমিশনার বলেন, সবকিছু মাথায় রেখেই নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনী আচারণবিধি যেই লঙ্ঘন করুক না কেন, তিনি যে দলেরই হোক না কেন তাকে ছাড় দেয়া যাবে না, দেবেন না। 

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় থাকবে বিশেষ নজরদারি: 

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা রোধে পুলিশ সদর দফতর ও এলিট ফোর্স র‌্যাব থেকে মাঠপর্যায়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র। 

সূত্র জানায়, সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিশেষ নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। 

এরই মধ্যে রাজধানীতে বাড়ানো হয়েছে র‌্যাব-পুলিশের টহল, নগরীর প্রবেশদ্বারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পোশাকধারী বাড়তি পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে বিপুল সংখ্যক সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ। সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামান। 

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, শুধু রাজধানী নয়, দেশব্যাপী র‌্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে, যেন জননিরাপত্তার বিঘ্ন না ঘটে সেজন্য সারাদেশে র‌্যাবের প্রত্যেকটি ব্যাটালিয়নের টহল জোরদার করা হয়েছে।  

রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেফতার নিষিদ্ধ: 

পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে কাউকে গ্রেফতার না করার নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।  

সম্প্রতি এক ক্ষুদে বার্তায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে কোনো রাজনৈতিক মামলাও করা যাবে না বলে এই নির্দেশনায় জানানো হয়েছে। 

ডিএমপির একাধিক ডিসি-এডিসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবর্তন ডটকমকে এই নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করেন। 

তারা জানান, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় নতুন করে আর রাজনৈতিক মামলা ও ধরপাকড় নিষেধ করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা রয়েছে বা যারা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, তাদেরকে গ্রেফতারে কোনো সমস্যা নেই। এছাড়া, রাস্তায় সরাসরি কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। 

পিএসএস/এসবি