কী রয়েছে সংলাপের ভাগ্যে?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

কী রয়েছে সংলাপের ভাগ্যে?

সালাহ উদ্দিন জসিম ১০:০২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

কী রয়েছে সংলাপের ভাগ্যে?

প্রত্যাশার পারদ চড়েছে, সংলাপ ঘিরে। ক্ষমতাসীনদের ভাষায়, শান্তির সুবাতাস। বাতাস এখনো বইছে। তবে তা কতটুকু শান্তি আনবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে আসছে।

আশাবাদী একটি পক্ষ যেমন আছেন। মাত্র দু’দিনের সংলাপেই বহু নৈরাশ্যবাদী লোকের দেখা মিলছে। তাদের যুক্তির অস্ত্র, অতীত। এ যাবৎ যে সাতবার রাজনৈতিক সংলাপ হয়েছে, তাতে লেগে আছে কলঙ্কের তিলক। একবারও সফল দূরে থাক, আলোর মুখই দেখেনি।

এই যে ১ নভেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপ করছেন, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের এই দাবিটিও কিন্তু একদিনের নয়। তবে বিগত ১০ বছর ধরে দেশ শাসন করা আওয়ামী লীগ ৫ বছরই তাদের সংলাপের দাবি নাকচ করে আসছে। ফলে হঠাৎ করেই শুরু হওয়া সংলাপের সফলতা নিয়েও রয়েছে একরাশ প্রশ্ন।

প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গত ২৮ অক্টোবর সংলাপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন। এতে সাড়া দিয়ে ৩০ অক্টোবর চিঠি দেয় আওয়ামী লীগ। একাধারে ১ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, ২ নভেম্বর যুক্তফ্রন্ট, ৫ নভেম্বর জাতীয় পার্টি ও ৮ নভেম্বর বাম দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের শিডিউল দেয়া হয়।

এতে রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সাধুবাদ পায় ক্ষমতাসীনরা। রাজনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার হয়। তবে গত দু’দিনে দুই জোটের সঙ্গে সংলাপের পর সবাই বলছেন, এই আশা দীর্ঘস্থায়ী হবে তো? সংলাপ নিয়ে পূর্ব ব্যর্থতার কালো তিলক কী এবার মুছবে?

এমন প্রশ্নে রাজনীতিক ও বিশিষ্টজনরা সংলাপকে ইতিবাচকভাবে নিলেও আশার আলো দেখাতে পারেননি।

গত ১ নভেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ করেন প্রধানমন্ত্রী। ড. কামাল ছাড়াও এই জোটের বড় দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ ৬ জন নেতা সংলাপে অংশ নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন।

পরের দিন ২ নভেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সংলাপ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দু’দিনের সংলাপ শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সংলাপ গঠনমূলক ও ইতিবাচক হয়েছে। একে ফলপ্রসূ বলা যায়।’

তার ভাষ্যে, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন তো আলোচনা ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন। আর যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী বলেছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ। আমাদেরও মনে হয়েছে, সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে।’

তবে আওয়ামী লীগের বাইরে বাংলাদেশের রাজনীতির একমাত্র শক্তিশালী দল বিএনপি বলছে, সংলাপ নিয়ে আশার মুকুল ঝরতে শুরু করেছে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাষ্যে, সংলাপ নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আন্দোলন চালিয়ে যাব।

সংলাপে চলমান সংকটের সমাধান হয়েছে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরাও। তারা বলছেন, আপাতত কোনো সমাধান দেখছি না। ফলে আগামী কয়েক মাস দেশবাসীকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটাতে হবে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সংলাপের নামে যা হলো, তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে অবাকও হইনি, হতাশও নই। অবাক হইনি কারণ, কোনো পক্ষেরই বিশেষ করে সরকারের অবস্থানের নড়চড় হবে এমনটি আশা করিনি। আর হতাশ হইনি কারণ, সংলাপটা হোক, সাময়িক হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তি আসুক, এটা চেয়েছিলাম। তা হয়েছেও, মানতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যারা এসবের বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন, তারা খুবই হতাশ হয়েছেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন নির্বাচন নিয়ে কিছু একটা দফারফা হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নির্ধারণের এখতিয়ার জনগণের হাতেই থাকার কথা। সেটি নিশ্চিতে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র কতটুকু প্রস্তুত হবে, তা নির্ধারণ সংলাপের মাধ্যমে হবে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের নেই। এবারও তার ব্যতিক্রম কিছু হবে না। অতএব, সামনের কয়েকটি মাস উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় কাটবে দেশবাসীর।’

সংলাপের ভবিষ্যত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সংকটটা তো অনেক বড়। সব রেখে আপাতত সংলাপে সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি জোর দেয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সাংবিধানিক কিছু বিষয়েতো সরকার অনড়, বলছে পরিবর্তন করা যাবে না। আবার সংবিধানে আছে এমন দুটি বিষয় যেমন: নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে সংকট পুরোপুরি না হোক, উত্তরণের পথ সৃষ্টি হবে। এমনি হলে সংলাপের ভবিষ্যত ভালো। আর না হলে অন্ধকার।’

এদিকে, সংলাপ সফল বা ব্যর্থ যাই বলা হোক না কেন, প্রধান প্রধান বিরোধী দল অংশ নিয়ে আরেকটি উইনওভার দিয়েছেন বলে মনে করছেন সরকারি দলের নেতারা।

এখন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি বা যে কেউ আন্দোলনে নামলে তাদের দমনেরও বৈধতা পেয়ে গেল সরকার। যেমনটি শনিবারই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

জেল হত্যা দিবসের আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘আলোচনা চলছে, এরই মধ্যে দেখলাম আন্দোলনের কর্মসূচি। একদিকে আলোচনা করবেন, আবার আন্দোলনের কর্মসূচি দিবেন, এটা কী ধরনের সংলাপ? সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য না। জানি না, দেশবাসী এটা কীভাবে নেবেন?’

প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও সরস আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি কঠোর ভাষায় বলে দিলেন, ‘আমরা সংলাপ করছি, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সেইসঙ্গে কেউ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করলে তার সমুচিত জবাব দিতেও প্রস্তুত রয়েছি।’

এসইউজে/আইএম