সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে নির্বাচনের আগেই নতুন ইউনিট

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে নির্বাচনের আগেই নতুন ইউনিট

প্রীতম সাহা সুদীপ ১০:০৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৮

সাইবার ক্রাইম ঠেকাতে নির্বাচনের আগেই নতুন ইউনিট

অনলাইন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, সেগুলোকেই বলা হয় সাইবার অপরাধ। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে এ ধরনের অপরাধও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অনলাইনে বিভ্রান্তি ও উস্কানিমূলক কিছু পোস্ট করলে, ছবি বা ভিডিও আপলোড করলে সেগুলোও সাইবার অপরাধের আওতায় পড়ে।

সম্প্রতি নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয় উস্কানিমূলক তথ্য ও গুজব। আর সেই গুজবে কখনো কখনো সহিংসতার মতো ঘটনাও ঘটছে। যে কারণে সাইবার অপরাধ ঠেকাতে খুবই নড়ে চড়ে বসেছে প্রশাসন। এমনি আগামী নির্বাচনে সাইবার ক্রাইমকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে একাধিকবার দাবি করেছেন খোদ পুলিশের মহাপরিচালক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। 

সাইবার ক্রাইম দমনে এতদিন বাংলাদেশে আলাদা কোনো ইউনিট ছিল না। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, র‌্যাব ও সিআইডির টিম আলাদা আলাদাভাবে সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করে আসছিল। তবে এবার সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে করা হচ্ছে ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ নামে একটি আলাদা ইউনিট। ইউনিটটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করলেই সেটি চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। 

নির্বাচনের আগেই নতুন এই ইউনিট কাজ শুরু করতে পারে বলে পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সূত্র পরিবর্তন ডটকমকে নিশ্চিত করেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্যান্য অপরাধের মামলার পাশাপাশি সাইবার ক্রাইমের মামলার সংখ্যা দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। আর এসব মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। তারা অন্যান্য মামলার চাপের জন্য এসব মামলার তদন্তে তেমন গতি আনতে পারছেন না। ফলে বছরের পর বছর এসব সাইবার অপরাধ মামলার তদন্ত ঝুলে আছে। এবার সেই মামলার তদন্তে গতি আনবে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো। 

সংশ্লিষ্টরা এও মনে করছেন, এই ইউনিটটির মাধ্যমে খুব সহজেই সাইবার অপরাধীকে খুঁজে বের করা এবং তদন্তের কাজ করা যাবে। মামলার চার্জশিটও খুব অল্প সময়েই দেয়া সম্ভব হবে। আলাদা এ ইউনিটটি বাস্তবায়িত হলে, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোসহ সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। 

৩৪২ জন নিয়ে হবে শুরু

পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রথম দিকে এই ইউনিট গঠনের জন্য ৫৮৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। পরে তা কমিয়ে ৩৬৯টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। সর্বশেষ তা করা হয়েছে ৩৪২ জনে। এরমধ্যে রয়েছে ডিআইজি ১টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ২টি, পুলিশ সুপার ৩টি, এডিশনাল এসপি ৬টি, এএসপি ১৯টি, ইন্সপেক্টর ৬৫টি, এসআই (নিরস্ত্র) ১৩০টি, এএসআই ৩৯টি ও কনস্টেবলের ৭০টিসহ বিভিন্ন পদ। এই ৩৪২টি পদ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় অনু শাখায় রয়েছে। সেই প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রধানমন্ত্রী সেই ফাইলে সই করলেই তা চূড়ান্ত হবে এবং এর কার্যক্রম শুরু হবে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে জানান, পৃথিবীর যেসব শহরে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি, তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে ব্যাংকক। এরপরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে পৌনে ৭ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা আড়াই কোটি। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি ভয়াবহভাবে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। এই ধরনের অপরাধের শিকার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ মামলার আশ্রয় নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করেন। নতুন এই ইউনিট এলে মানুষের আস্থা আরো বাড়বে। 

সিআইডির প্রধান কার্যালয় হবে অফিস

সিআইডি সূত্র জানায়, এই ইউনিটটির অফিস হবে বর্তমানে রাজধানীর মালিবাগস্থ সিআইডির কার্যালয়ের ভেতরে। সেখান থেকেই এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সিআইডি কার্যালয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেটিভের অর্থায়নে ইউনিটটির সেন্টার করতে ২৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেন্টার হবে এটি। এই সেন্টারটিই মূলত সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর প্রধান কার্যালয় হিসেবে কাজ করবে। 

নতুন ইউনিটে যারা থাকবেন

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এই ইউনিটে ৩৪২ জনের জনবল থাকবে। বিষয়টির অনুমোদন চূড়ান্ত করার জন্য ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি সই করলেই সব চূড়ান্ত হয়ে কার্যক্রম শুরু করা যাবে। বর্তমানে সিআইডিতে প্রায় শতাধিক আইসিটি মামলা রয়েছে। সেসব মামলার তদন্ত করছে সিআইডির বিভিন্ন কর্মকর্তারা। তারাই নতুন এই বিশেষ ইউনিটে যুক্ত হবেন এবং নতুন করে আরো কিছু জনবল নিযুক্ত করা হবে। 

তিনি বলেন, ইউনিটটি আলাদাভাবে তাদের তদন্ত কার্যক্রম চালাবে। দেশজুড়ে সাইবার ক্রাইমসহ অনলাইনে গুজব বা উস্কানি প্রতিরোধে বিভিন্ন মামলার জট খুলে অল্প সময়ে তদন্তের জন্যই এই আলাদা ইউনিট করা হচ্ছে। শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, পর্যায়ক্রমে এর কার্যক্রম সাব অফিস বা জেলা পর্যায়েও করার প্রস্তাব করা হবে। 

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল আহসান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো চালুর প্রস্তাবটি সচিব কমিটিতে আছে। সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তারা অনুমোদন দিলেই এর কার্যক্রম শুরু হবে। 

তদন্তে গতি আনবে এই ইউনিট

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাইবার অপরাধকেই আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি। এ ধরনের অপরাধ সংগঠিত হলে, প্রচলিত আইসিটি অ্যাক্ট ও সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আলোকে সাইবার ক্রাইম ইউনিট তার তদন্ত করবে। এর পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো চালু হলে আমাদের ওইসব অপরাধ তদন্তের কাজে গতিশীলতা বাড়বে। 

তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, সাইবার ক্রাইমকে সনাক্ত করার জন্য আমাদের প্রযুক্তিগত কাঠামো খুবই দুর্বল। আমাদের সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে মাত্র ১টি। ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব নেই। কিন্তু সারাদেশে সবার হাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি। সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম রয়েছে খুবই সীমিত। নতুন এই ইউনিট গঠন হলে হয়তো এই কার্যক্রম কিছুটা হলেও বাড়বে। 

পিএসএস/এসবি/আইএম