প্রচারণাতে রবি’র ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি প্রতারণা!

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

প্রচারণাতে রবি’র ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি প্রতারণা!

আশিক মাহমুদ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০১৮

প্রচারণাতে রবি’র ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি প্রতারণা!

দেশব্যাপী অধিকতর ইন্টারনেট স্পিড ও নিরবচ্ছিন্ন কাভারেজের লক্ষ্যে সম্প্রতি চতুর্থ প্রজন্মের টেলিকম সেবার (ফোর-জি) লাইসেন্স কেনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড। ফোর-জি উদ্বোধনের পরদিনই আকর্ষণীয় অফারের নামে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের সব জেলায় থ্রি-জি’র দামেই ফোর-জি সেবা চালু করে।

কম খরচে ‘আকর্ষণীয়’ এই সেবা পেতে এরই মধ্যে গ্রাহকরা ফোর-জির দিকে ঝুঁকছেন। তবে এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেবার মান থ্রি-জির মধ্যেই আটকে আছে।  এমন অভিযোগ তুলে অনেক গ্রাহক ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।

শুধু তাই নয়, ফোর-জির প্রচারণাতেও রবি প্রতারণা করছে বলেও অভিযোগ গ্রাহকদের।

জানা গেছে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে ফোর-জি লাইসেন্স নিয়েছে রবি। তবে লাইসেন্স ফোর-জির নিলেও তারা বিজ্ঞাপনে প্রচার করছে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি।

এই মোবাইল ফোন অপারেটরটির দাবি, তাদের এই প্রযুক্তি অন্যান্যদের থেকে কিছুটা আপডেট।

তবে এ বিষয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে মোটেও এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং কেউ কেউ ‘বাফারিং’ যুক্ত নিউজফিডের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার দিয়ে তীর্যক মন্তব্য করছেন।

ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি’র নামে রবি আসলে কি ধরনের সেবা দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।

এদিকে, অনেক গ্রাহকই অতিষ্ঠ হয়ে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করা যায় কিনা সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন।

গ্রাহকদের বড় একটি অংশের অভিযোগ- ‘অন্য কোম্পানিগুলো যেখানে ফোর-জি চালু করেছে- সেখানে রবি একধাপ এগিয়ে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি চালুর মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে পরোক্ষভাবে প্রতারণা করছে।’

রাজধানীর বনানীর বাসিন্দা রাশেদ খান। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ব্যবহার করে আসছেন রবির থ্রি-জি সেবা।

উন্নত সেবা পেতে ফোর-জি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে নিয়েছেন সিম। তবে নতুন করে ৪.৫ জি ব্যবহারেও তার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

ইন্টারনেটের গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘ভেবেছিলাম গতি বাড়বে। তবে আসলে গতি বলতে কিছুই নেই।’ আর সেটারই প্রকাশ ঘটেছে গত ২ মার্চ ফেসবুকে দেওয়া তার এক স্ট্যাটাসে।

নিজের ফেসবুক ওয়ালের স্ক্রিনশট পোস্ট করে তিনি লিখেছেন- ‘রবি ৪. ৫ জি!’ আর ওই স্ক্রিনশর্টেই বাফারিংয়ের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে।

আরেকজন রবির গ্রাহক ধানমন্ডির বাসিন্দা মো. খোরশেদ আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘১০০ টাকা খরচ করে ধানমন্ডির রবি সেন্টার থেকে সিম পাল্টে নিয়েছি। কিন্তু কোথাও ফোর-জি পাচ্ছি না। বরং অনেক জায়গায় টু-জি শো করছে।’

রবি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে আব্দুর রহমান নামের একজন লিখেছেন, ‘একটা পোস্ট করতে গিয়ে তিনবার রিট্রাই করে চতুর্থবারে পোস্ট হয়েছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারবার রবি ৪.৫ জি’র বিজ্ঞাপন....’

জাহিদুল ইসলাম সুজন নামের আরেক গ্রাহক লিখেছেন, ‘সরকার ফোর-জি’র অনুমোদন দিয়েছে, অথচ রবি ৪.৫ জি’র বিজ্ঞাপন দিচ্ছে!’

ফারুখ হোসেন তার ফেসবুকের ওয়ালে লিখেছেন, ‘কেউ বলছে সাড়ে চার-জি, কেউ বলছে ফোর-জি প্লাস, আবার কেউ বলছে ফোর-জি এলটিই… আসলে ফোর-জি কত?’

পাবলিক সার্ভিসেস হেল্প গ্রুপ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে রবির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করা যাবে কি-না জানতে চেয়েছেন নাইমুল ইসলাম রুবেল।

নেটওয়ার্ট ব্যবহারের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমি কি রবি মোবাইল কোম্পানির নামে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করতে পারবো? কারণ তারা তাদের বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে ফোর পয়েন্ট ফাইভ জি, যেখানে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সেবাই ফোর-জি। .... এই ক্ষেত্রে কি ভোক্তা অধিকারে মামলা করা যাবে? আর এক্ষেত্রে তো কোনো ক্যাশ ম্যামো নাই আমার কাছে। আর রবির ফ্যানপেজ এর কমেন্টগুলো দেখলেই বুঝবেন তারা কতো বাজে সেবা দিচ্ছে।’

কমেন্টের উত্তর হিসেবে ওই স্ট্যাটাসের মন্তব্য অংশে মাহবুব কবির মিলন নামের একজন লিখেছেন, ‘মোবাইল কোম্পানির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করা যায় না। তারা হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছেন।’

রবির দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ৬৪ জেলায় তাদের ফোর-জি সেবা চালু রয়েছে। সারাদেশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রবির ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি বিটিএসএর সংখ্যা ২৫০০। আর তাদের মতে, ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি ফোর-জি’র চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি।

রবি আজিয়াটা লিমিটেডের হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমরা যে প্রযুক্তির যাত্রা শুরু করেছি তা একটু অগ্রসরমান, যাকে বলা হয় ফোর-জি অ্যাডভান্স। আর ৪.৯ জি’কে বলা হয় এলটি এ্যাডভান্স। থ্রি-জিতেও আমাদের থ্রি পয়েন্ট ফাইভ-জি ছিল। আর ফোর-জিতেও আমরা ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি ব্রান্ডিং করছি।’ 

অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট (কর্পোরেট কমিউনিকেশন্স) ইকরাম কবির পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘গ্রাহকের ডিজিটাল লাইফ স্টাইলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে রবি সবার আগে ৬৪ জেলায় ফোর-জি সেবা চালু করেছে। ফোর-জি সেবার জন্য গ্রাহকের ফোর-জি ব্যবহার উপযোগী হ্যান্ডসেট, সিম এবং কভারেজ থাকার প্রয়োজন। ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলে বাফারিংয়ের সম্ভাবনা নেই।’

গ্রাহকেরা প্রতারণার অভিযোগ করছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রবির এক কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘তাদের অভিযোগ থাকলে তারা বিটিআরসিকে জানাতে পারে। রবি গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছে না- বরং অন্য অপারেটগুলোর চেয়ে আধুনিক ও উন্নত সেবা দিচ্ছে।’

তবে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনও রবির এ ধরনের সেবাকে প্রতারণা বলছে।

জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘পূর্বেও রবি একই কাজ করেছে। সরকার যখন থ্রি-জি’র লাইসেন্স দিয়েছে, তখন তারা থ্রি পয়েন্ট ফাইভ জি বলে প্রচারণা চালিয়েছে। এখনও একই কাজ করছে। যেহেতু সরকার তাদের ফোর-জি’র লাইসেন্স দিয়েছে, হয়তো তাদের প্রযুক্তি একটু আপডেট হতে পারে- তবে তাদের এ ধরনের সেবা শুধু জনগণের সঙ্গেই নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গেও প্রতারণা।’

ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের মতে, রবি’র ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি সেবা দেওয়া যুক্তিযুক্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইল তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমরা ফোর জি’র লাইসেন্স দিয়েছি। আর ৪.৯৯ পর্যন্ত চতুর্থ প্রজন্মের সেবার মধ্যেই পড়ে। তাই তারা ৪.৫ জি সেবা দিতে পারে।’ 

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘সেবার মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ভালো সেবা দিতে না পারার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, তা আমরা দূর করার চেষ্টা করছি। তবে সেবা ভালো না হওয়ার দায় কিন্তু অপারেটরদেরই।’

এদিকে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি’তে রবি আসলে কি ধরনের সেবা দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ।

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘রবির ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি’কে প্রথমত আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তবে ফোর-পয়েন্ট ফাইভ-জিতে তারা আসলে কী ধরনের সেবা দিচ্ছে, এটি আসলে আমি ঠিক জানি না। আমরা যে ফোর-জি’র লাইসেন্স দিয়েছি- তারা যে সেবা দিচ্ছে এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটছে কি-না, তা আমরা পর্যালোচনা করবো।

এএম/বিএইচ/