দোকানের বন্ধ শাটার যখন হয়ে ওঠে ক্যানভাস

ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

দোকানের বন্ধ শাটার যখন হয়ে ওঠে ক্যানভাস

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৩৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

print
দোকানের বন্ধ শাটার যখন হয়ে ওঠে ক্যানভাস

ঢাকা কিংবা আরো দূরের কোনো শহর থেকে নিজের জন্মভূমি শহরে ভোরে বাস থেকে নেমেই দেখলেন নিজের শহরের সবকিছুকে মোটিফ বা গ্রাফিটিতে রাঙিয়ে রঙিন সব ছবি আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। চোখ জুড়িয়ে গেল, মন জুড়িয়ে গেল, নিশ্চুপ রাজপথের দুধারে সারি সারি দোকানের শাটারের উপর মোহনীয় সব গ্রাফিটি, মোটিফ চিত্র। রঙ যা কেবল আপনার শহরের কথাই নানাভাবে, আপনাকে বলে যাচ্ছে। কেমন বোধ হবে ভাবুন তো?

অথবা আপনি যখন রিকশা চেপে নতুন কোনো যাবেন ওই শহর জেগে ওঠার আগেই চোখ মেলে দেখে গেলেন এইসব চিত্র। পথে পথে, বন্ধ দোকানের শাটারে আঁকা সারা শহর একটা গল্প বলে গেল আপনাকে, সেই গল্পের মানে আপনি একভাবে এঁকে নিলেন, আবার আপনার রিকশাচালক আরেকভাবে নিলো। যে যার মতো।

এই শহরে নতুন কেউ এলে ডাগর চোখে দেখবে, মুগ্ধ হবে, একটা শহরের নতুন এক পরিচিতি হবে রঙের জন্য। দিনে সূর্য্যের আলোতে, আর সন্ধ্যার নিয়ন অলোতে! একই শহরের ভিন্ন রূপ দেখতে পাবেন। চিত্রকর্মের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যেতেই আপনাকে আজ আমরা নিয়ে যাবো খুলনার ৫৭ শের ই বাংলা রোড, আমতলায় নোনাভূমি ও একজন কিশোরের সাথে। যাদের চোখে আপনি দেখবেন একটি নতুন খুলনাকে।

গ্যালারির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে যাদের শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখার সুযোগ ঘটবেনা কোনো দিনও, তাদের জন্যে শাটার এর উপরে রঙের বুননে বর্ণিল সব ছবি চিত্রকলার নতুন এক ক্যানভাসে সাজিয়ে দিলো শহরটা, সাধারণ মানুষেরা দোকানের বন্ধ শাটারের উপর এইসব ছবি দেখে যেমন দোকানটিকে চিনে রাখবে তেমনি শহরের নতুন এক রূপ তাদের জন্যে নতুন এক পরিচয় তৈরি করে দিবে। রঙিন শহরের এই বোধটা ছড়িয়ে গেল, সার্বজনীন হলো চিত্রকর্ম। শহরের অলি গলি হয়ে উঠলো চিরকালীন উৎসবের রঙে মাখা ক্যানভাস।

দোকানের শাটারগুলো এক সার্বজনীন রুপ নিয়ে খুলবে, বন্ধ হবে। যখনই বন্ধ হবে দোকান, তখন শাটার তার শিল্প উম্মুক্ত করবে সবার জন্য। আর বন্ধের দিনগুলোতে পুরো শহর ধারণ করে আরেক রুপ, সারি সারি শাটারগুলোর জন্য।

কিশোর পরিবর্তন ডটকমকে জানান, পৃথিবীর কিছু শহরে এমন কাজ অনেক হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের খুলনায়, এটাই প্রথম।
তবে এই কাজ কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই এই কাজ করার জন্যে চাই ডেডিকেটেড টিম মুভমেন্টের মতো একটি পদক্ষেপের। আর আমি পেয়েও গেলাম তেমন একটি জায়গা। সেটি হচ্ছে ‘নোনাভূমি’

তিনি জানান, খুলনার ৫৭ শের ই বাংলা রোড, আমতলায় একটা বুটিক শপের নাম নোনাভূমি, তাকে ঘিরে শিল্প সাহিত্যের সংবাদপত্রের নানা ঘরানার নানা মতের সৃষ্টিশীল মানুষের আনাগোনা, তাদের কেউ কেউ ভালোবেসে নোনাভূমিকে খুলনার শান্তি নিকেতন ডেকে থাকে! তাদের সাথে যোগ দিলাম আমি।

কিশোর আরো জানান, ঢাকার দামি চাকরি ছেড়ে, বাংলাদেশ রাজধানী ঢাকা বলে পরিচিত অবহাওয়া থেকে ক্রমশ চিড়ে চেপ্টা পরিবেশ ভুলে নিজেকে ডিসেন্ট্রালাইজ করার বাসনা আর জন্মভূমির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চল্লিশোর্ধ বয়সের সময়ে নিজেকে নিয়ে নতুন এক সংগ্রাম এর স্বপ্ন নিয়ে পথ চলার শুরুতেই খুঁজে পেলাম নোনাভূমিকে।

শাটার আর্ট দিয়ে রঙে রঙে সজীব জীবন্ত শহর আর সাধারণ মানুষের জন্যে স্বপ্নটা ছিল শিপার, মনি মাঝির মতো খুলনা চারুকলার ব্যাচ ৯৯ আর-০২ ব্যাচের কয়েকজন তরুণের। শুনলাম ওদের স্বপ্নের কথা।

নিজে কার্টুনিস্ট বলে রীতিমতো কনসেপচুয়াল ভিজুয়ালাইজেশন করা শুরু করলাম। বিজ্ঞাপনী সংস্থায় দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় বুঝলাম, টাকা বা বাজেটের জন্যে এই স্বপ্ন থেমে থাকতে পারেনা।

দু'মাসের বাসা ভাড়া বাকী রেখে ওদের অনুপ্রেরণা দিতে রঙ তুলি কিনে ফেললাম।

ইমরোজ, স্বন্দ্বীপ, উৎসব, শিপার, উপল দলে জুড়ে গেল, দিন রাত জেগে রাঙিয়ে তুললো নোনাভূমির শাটারগুলো। সেখানে নোনাভূমি ক্যাফে, নোনাভূমি বুটিক, নোনাভূমি পিউরিটি শপ এক ছাদের নীচে সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে শুরু করলো নতুন এক অভিযাত্রার। অভিবাদন শীর্ষক নতুন এক আর্ট মুভমেন্ট এর।

খুলনা, একটি ট্যুরিজমের অপার সম্ভাবনার শহর, অথচ শহরে পর্যটক দেখা যায় না বললেই চলে। ট্যুর অপারেটররা ট্যুরিস্টদের যশোর হয়ে বিমান থেকে নামিয়ে সরাসরি চলে যান সুন্দরবনে কিংবা শহর থেকে দূরে কোনো স্থাপনায়। শহরে তাই ট্যুরিস্টদের আকর্ষণের নাগরিক কোনো আয়োজন নেই বললেই চলে, অথচ এই শাটার আর্টগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন ঘরানার ট্যুরিষ্ট আকর্ষণের নবযাত্রা শুরু হতে পারে। এই আর্টগুলোকে কেন্দ্র করে সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে হতে পারে নতুন মেলার আয়োজন, ঘরে তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র ট্যুরিস্টদের জন্যে ডালা সাজিয়ে বসতে পারে যে কেউ।

একটা নগরীর দোকানের শাটার পড়বে আর একটা আর্ট শো শুরু হবে? বন্ধ দিয়ে যার শুরু।

তার মানে এই নয় যে দোকান বন্ধ করে রাখতে হবে! বরং নতুন ধরনের এই শাটার আর্ট শো যে কোনো দোকানের বাইরের সৌন্দর্যের এক বোধ তৈরি করবে তার টানে দোকানে ভিড়বে কাস্টমার।
দোকান মালিকের সৌন্দর্যপ্রীতির প্রশংসা করবে সবাই।

রাস্তার পাশে সারি সারি দোকানের শার্টারে রঙিন সব আঁকিবুকি, মোটিফ, আল্পনা, গ্রাফিটি, নতুন ধরনের আবেশ তৈরি করবে নগরবাসীর মনে। সবার চোখে রঙিন এক সর্বজনীন ছবি হয়ে ঐক্যের কথা বলবে।

এটা হতে পারে খুলনার নতুন হয়ে ওঠা কিংবা স্বকীয়তা তৈরির একটি চেষ্টা, একটি মুভমেন্ট।

নোনাভূমি'র অভিবাদন আর্ট মুভমেন্ট তাই খুলনার বুকে নতুন এক পথচলার ডাক। নাগরিক নতুন এক ক্যানভাসে, নতুন করে গল্প বলার প্রয়াস। সেই গল্প প্রাণ পাবে অন্ধকারে, বন্ধে, আলোতে, নিয়ন কিংবা রৌদ্রের উত্তাপে। কিংবা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এইসব শাটার'র সামনে, এক চিলতে আশ্রয় এর নীচে ঠাই নিতে নিতে, এইসব শাটার'র আঁকিবুকি দেখে কোনো কোনো যুগল হয়তো উষ্ণতার নতুন গল্প খুঁজে নেবে। নিক।

ইসি/

 
.


আলোচিত সংবাদ