শেকড়ের একখণ্ড মাটি নিয়ে ভারতে ফিরলেন তন্ময়

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

শেকড়ের একখণ্ড মাটি নিয়ে ভারতে ফিরলেন তন্ময়

লুৎফর রহমান সোহাগ ৯:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০১, ২০১৭

শেকড়ের একখণ্ড মাটি নিয়ে ভারতে ফিরলেন তন্ময়

জন্ম-বেড়ে ওঠা ভারতে, অথচ তরুণ কবি ও সাংবাদিক তন্ময় ভট্টাচার্যের কাছে বাংলাদেশ মাতৃভূমির চেয়েও বেশি কিছু। ভারতের স্বাধীনতা দিবসে তাই বাংলাদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের শেকড়ের সন্ধান, সাত দশক আগে যে জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল তার পূর্বপুরুষরা।

পূর্বপুরুষদের দেশত্যাগ, ভারতে স্থায়ী হওয়া ও বাংলাদেশে আসার কথা পরিবর্তন ডটকমকে জানিয়েছেন তন্ময় ভট্টাচার্য।

তিনি জানান, তার দাদা কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার বর্শিকুড়ার নারায়ন দহরের বাসিন্দা ছিলেন। নারায়ন দহর প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালের ৩ অক্টোবর, দেশভাগের ক্ষত নিয়ে বাংলাদেশের অনেক হিন্দুর মত তিনিও স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। গোয়ালন্দ হয়ে দেশত্যাগের আগে স্থানীয়ভাবে প্রতাপশালী ও ব্যাপক সম্পত্তির মালিক এই শিক্ষক কেবল দুটি টাঙ্ক ও জমির কাগজ সঙ্গে নিয়েছিলেন।

তন্ময় ভট্টাচার্য জানান, দেশ ছাড়ার পর কলকাতায় শুরু হয় তাদের পরিবারের উদ্ভাস্তু জীবন। পরে বেলঘুরিয়ায় আশ্রয় মেলে, এরই মধ্যে জন্ম হয় তার বাবা। পরবর্তীতে তিনি রেলওয়েতে চাকরি নিয়ে পরিবারের হাল ধরেন।

ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তাদের পরিবারের স্মৃতিপটে বাংলাদেশ ছিল জীবন্ত। ছোটবেলায় সেই স্মৃতিচারণ শুনেই বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়ে তন্ময়ের।

তার ভাষায়, ‘দাদীর মুখে শুনতাম বাংলাদেশের কথা। নিজেদের ভিটের কথা। এরপর দাদার ভাইয়ের কাছ থেকেও পূর্বপুরুষের বাড়ি সম্পর্কে জানি। বাড়ির পাশে রাস্তা, তার পাশে মন্দির ছিল- সেইসব স্মৃতির কথা শুনতাম।’

‘ঠিক জায়গাটা তো আমার চিনে উঠার কথা না। কিন্তু স্মৃতিচারণ শুনে মনের মধ্যে একটি ম্যাপ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই ভরসায় ভারতের স্বাধীনতার ৭০ বছরের দিনটিতে পূর্বপুরুষের ভিটেয় আসতে চেয়েছিলাম।’ বলেন তন্ময়।

পূর্বপুরুষের ভিটে খুঁজে বের করার সেই যাত্রাও ছিল অভিনব। তন্ময় সেজন্য বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে, তাতে সাড়াও মেলে।

তন্ময় বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই পরিকল্পনা করেছি শেকড়ের কাছে আসতে। ঠাকুরমার আর ঠাকুরদার কাছে বাংলাদেশের পূর্বপুরুষের ভিটার এত কথা শুনেছি, মনে ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের (ভারতের) স্বাধীনতার ৭ দশকের মুহুর্তটিতে বাংলাদেশে শেকড়ের খোঁজ করতে চেয়েছি। অনলাইনে হাসানের (একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনলাইন ভার্সনের রিপোর্টার হাসান আহমেদ) সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। সে আমাকে জায়গাটি খুঁজে পেতে সহায়তা করল।’

ফেসবুকে পোস্টে সহায়তা পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে গত আগস্টে বাংলাদেশে আসেন তন্ময়। এরপর কিশোরগঞ্জে গিয়ে খুঁজে বের করেন পূর্বপুরুষদের ফেলে যাওয়া ভিটে। ১৫ আগস্টে ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা দিবসে শেকড়ের কাছে থাকার স্বপ্নও পূরণ হয় তার।

তবে শেকড়ের বর্তমান চিত্র বদলে গেছে অনেক। সেই ভিটেতে নতুন বাড়ি উঠেছে, অচেনা তার বাসিন্দারাও।

তন্ময় বলেন, ‘যা শুনেছি তা তো নেই, বদলে গেছে। দাদার নাম বললে কেউ কেউ চিনেছে, কেউ কেউ চিনেনি; যারা চিনেছে তারা বাড়িটা দেখিয়ে দিয়েছে।’

শেকড়ের চিত্র বদলে গেলেও খালি হাতে ফেরেননি তন্ময়। সাত দশক আগে যে ভূমি থেকে খালি হাতে ফিরেছিলেন তার স্কুল শিক্ষক দাদা, সেখান থেকেই একখণ্ড মাটি নিয়ে গেছেন তিনি। যে মাটির টানে আবার ফিরে আসার কথাও জানালেন তিনি।

তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, ‘শেকড়ের মাটিটা সঙ্গে করে নিয়েছি, আর কিছু চাইনা। কিন্তু বারে বারে এ মাটির কাছে আসতে চাই। জানিনা হয়ে উঠবে কিনা।’

এলআর/এসবি

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও