অনাথ মেয়েদের অভয়াশ্রম ‘চাঁদমনি’

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

অনাথ মেয়েদের অভয়াশ্রম ‘চাঁদমনি’

নুর আলম, নীলফামারী ৬:৩২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০১৯

অনাথ মেয়েদের অভয়াশ্রম ‘চাঁদমনি’

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের চাওড়া ডাঙ্গী গ্রামে তিস্তা প্রধান খাল ঘেষে গড়ে উঠেছে অনাথ ও দুস্থ বালিকাদের কল্যাণ কেন্দ্র ‘চাঁদমনি’। এখানে আশ্রিতদের কারও বাবা নেই, কারও নেই মা। আবার কারও বাবা-মা কেউই নেই।

‘চাঁদমনি’ আশ্রম অনাথ বালিকাদের দিয়েছে মাথা গোজার ঠাঁই। বাবা-মায়ের আদর-ভালবাসা, লেখাপড়ার সুযোগ ও ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থাসহ দিয়েছে জীবনের নিশ্চিত নিরাপত্তা।

এটি পরিচালনায় রয়েছেন সেই এলাকার একজন সাদামনের মানুষ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা পিজিরুল আলম দুলাল(৭৫)।

প্রতিষ্ঠানটি অসহায় ও অনাথ বালিকাদের আশ্রয়স্থল হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত।

‘চাঁদমনি’ আশ্রিত ৫০ জন অসহায় ও অনাথ বালিকার ‘অন্ধের যষ্টি’।

এই প্রতিষ্টানের পরিচালক নিঃসন্তান পিজিরুল আলম (দুলাল) নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার চাওড়াডাঙ্গী বালাপাড়া গ্রামে একজন সাদা মনের মানুষ। ছিলেন উত্তরা ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক।

পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া ১০ শতক জমিতে ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে চাঁদমনি। এরপর থেকে এখানে আশ্রয় নেওয়া বালিকাদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করাটাই হয়ে যায় পিজিরুলের ধ্যানজ্ঞান।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জনের মতো অনাথ চাঁদমনিতে থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। এখান তেকে গিয়ে কেউ চাকরি করছে আবার কেউ মনযোগী হয়েছে সংসারে। এদের মধ্যে দুইজন কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স এবং ছয়জন অনার্স শেষ করেছেন।

চাঁদমনিতে বর্তমানে থাকছে ৫০ জন অনাথ। তাদের পেছনে প্রতিমাসে খরচ হয় ৭০ হাজার টাকার মতো। এর পুরোটাই বহন করছেন পিজিরুল আলম এবং তার আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্খিরা। চাঁদমনির সার্বিক বিষয় দেখভালের জন্য রয়েছেন দুইজন পুরুষ শ্রমিক। রয়েছে দুজন নারী বাবুর্চি। প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলম (দুলাল) জানান, ১৯৯৬ সালে উত্তরা ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি। তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করা স্ত্রী মোতাহারা আলম ২০১০ সালে মারা গেলে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন তিনি।

তিনি বলেন, আমার মৃত্যুর পরও যেন চাঁদমনি ভালোভাবে চলতে পারে এজন্য ১১ সদস্য নিয়ে একটি পারিবারিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমার অবর্তমানে আমার ভাগ্নি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কণা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদা টুম্পা এর দেখভাল করবেন।’

চাঁদমনিকে আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বিশেষ করে বোন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মাসুদা বেগম, ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল কাদের ও চাচাতো ভাই ডা. শামীমের সহযোগিতা তাকে এ কাজে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

একইসঙ্গে তিনিও বিনা শর্তে যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে থাকেন।

বর্তমানে চাঁদমনিতে পাকা টিনশেডের ১০টি রুমে বসবাস করেন অনাথ বালিকারা। যেখানে রয়েছে শোয়ার ঘর, নামাজ ঘর, রান্নাঘর ও বাথরুম। খেলাধুলার জন্য পেছনে রয়েছে প্রশস্ত জায়গা। লাইব্রেরি থাকলেও সেটি তেমন একটা সমৃদ্ধ নয়। সামান্য কিছু বই রয়েছে। সংগ্রহ শালায় পুরানো রেডিও, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘানি ইত্যাদি রাখা হয়েছে। এবছর ডিসেম্বরে হস্তশিল্প মেলার আয়োজন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। লোকজ সংস্কৃতির ওই মেলা আয়োজনে ব্যয় হবে প্রায় ৩ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলম জানান, অনাথ বালিকা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হয়েই এই আশ্রমে নিয়া হয় বালিকাদের। বাল্যবিবাহ দেওয়া যাবে না এবং ইন্টার মিডিয়েট পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে এই শর্তে তাদের নিয়ে আসা হয়। তবে সমাজসেবার চিন্তা ও নিঃসন্তান হওয়ার কারণে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলেও জানান তিনি।

সরেজমিনে সেখানে আশ্রিত নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া জবা আক্তার (১৪) জানান,বাবা-মা মারা যাওয়ার পর নীলফামারীর ডিমলা চাঁদমনিতেই নয় বছর ধরে আশ্রিত সে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালককে আমরা সবাই মামা বলে ডাকি।

চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মায়াও এক বছর আগে এখানে এসেছে। তার মা আছে কিন্তু বাবা নেই। এখানে আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশ বালিকার অবস্থাই একই রকম। জাকিয়া আক্তার (১৪) নামে বাবা হারা এক মেয়েও পড়ছেন এইচএসসিতে। একইভাবে বর্তমানে ৫০ জন অনাথ বালিকা এখানে রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

পিজিরুল আলম দুলাল তার পেনশনের সব টাকা চাঁদমনির কাজেই ব্যয় করেছেন। এছাড়া তার পৈত্রিক ও নিজের প্রায় সবটুকু জমি চাঁদমনি প্রতিষ্ঠার কাজে দিয়ে দিয়েছেন। চাঁদমনির বার্ষিক ব্যয় প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকা।

এখানে আশ্রয় নেওয়া বালিকাদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করাটাই  ধ্যানজ্ঞান বলেও জানান চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা পিজিরুল আলমের।

এনএ/এমকে

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও