নিমেই বিশ্বজয়! (ভিডিও)

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

নিমেই বিশ্বজয়! (ভিডিও)

সালাহ উদ্দিন জসিম, রাজবাড়ি থেকে ফিরে ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০২, ২০১৯

ঔষধি গাছ নিম। এর উপকারিতা কমবেশি সবার জানা। ডাল দিয়ে দাঁত পরিস্কার, পাতার বড়ি দিয়ে চর্মরোগের সমাধানসহ প্রথাগতভাবে নানা কাজে ব্যবহার হয় এই গাছ। কিন্তু এ থেকে ১০৪ টি উদ্ভাবন বিশ্বের কেউ করেনি। এই নিমের ওপর গবেষণা করে এসব উদ্ভাবনে বিশ্বজয় করেছেন রাজবাড়ির ড. এম এ হাকিম।

রাজবাড়ির বালিয়াকান্দির বহরপুরের সন্তান এম এ হাকিম, এলাকায় নিম হাকিম নামে পরিচিত। উদ্ভিদ বিদ্যার এক জ্যান্ত জ্ঞানকোষ। গত ৩৮ বছর যাবত তিনি এই নিম নিয়েই কাজ করছেন। ধাপে ধাপে বহরপুরে ৪৩ একর জমি কিনে ‘শান্তি মিশন’ গড়েছেন।

এ শান্তি মিশন; ধরিত্রী রক্ষা, দারিদ্র বিমোচন ও প্রাণি উদ্ভিদকুলের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য। এরই মধ্যে নিম থেকে নানা উৎপাদনে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।

নিম হাকিমের শান্তি মিশন ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে গড়ে ওঠেছে ঔষধি উদ্ভিদের একমাত্র জিনব্যাংক। যেখানে ৬৯৭ প্রজাতির উদ্ভিত আছে। পৃথিবীর অনেক বিলুপ্ত ও বিরল প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদও রয়েছে সেখানে। বিলুপ্ত প্রায় দেশিয় প্রাণিকুলের অবাধ বিচরণ রয়েছে এই শান্তি মিশনে। এই মিশনেই রয়েছে দেশের একমাত্র ইকোপন্ড।

সমগ্র কমপ্লেক্সটি একটি অর্গানিক বা ইকো কমপ্লেক্স। দেশিয় প্রজাতির অনেক ফলজ ও বনজ বৃক্ষের সমাহার রয়েছে। এখানে নিজেদের তৈরি করা কেঁচোকম্পোস্ট সার দিয়ে ঔষধি উদ্ভিদের চাষ করা হয়।

পাশাপাশি এখানে ঔষধি উদ্ভিদের মা গাছ থেকে চারা ও বীজ উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারণ চলছে। এখানে উৎপাদিত জৈব বা অর্গানিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে- সৌদি আরব, মিশর, জাপান, কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায়।

এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে, প্রাকৃতিক উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল মেডিসিন), আন্তর্জাতিক ভেষজ গবেষণাগার ও উন্নয়ন কেন্দ্র। যা পৃথিবীর কোথাও এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও উৎপাদিত ঔষধি উদ্ভিদের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তার থেকে প্রসাধনী সামগ্রী ও ফাংশনাল ফুড এখানেই তৈরি হয়। অন্তত ২৮টি পণ্য ইতিমধ্যে বাজারজাত করছেন নিম হাকিম। তার পণ্য সেনাবাহিনীর সিএসডি, অনলাইন শপসহ বিভিন্ন সুপারশপে পাওয়া যায়।

এসবের মূল লক্ষ্য- নিরাপদ ঔষধ ও খাদ্য সামগ্রির প্রমোশন করা। প্রাকৃতিক ঔষধ ও ফাংশনাল ফুড এবং প্রসাধনী তৈরির কলাকৌশল হাতে কলমে শেখানো এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর আন্তার্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রণয়ন করা। এতে করে ধরিত্রী রক্ষা হবে, হবে দারিদ্র বিমোচন এবং প্রাণি উদ্ভিদকুলের স্বাস্থ্য নিরাপদ থাকবে।

এছাড়া ৬৯৭ প্রজাতির উদ্ভিদের ছবিসহ ক্যাটালগিংয়ের কাজ চলছে। এতে উঠে আসবে প্রতিটি ঔষধি উদ্ভিদের জীবনবৃত্তান্ত, উপকারিতা, এবং কীভাবে মানব শরীরে কাজ করে তারও বিবরণ। এই কাজটি বাংলাদেশে এই প্রথম হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের হারবাল ফার্মাকোপিয়া তৈরির কাজ চলছে, যা এরআগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করেনি।  এছাড়া ড. এম এ হাকিমের নিমের প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কপিরাইটও পেয়েছে।

কে এই নিম হাকিম?

রাজবাড়ির বালিয়াকান্দির উপজেলার বহরপুরের সন্তান এম এ হাকিম। নিমের গবেষণা ও কর্মের জন্য এলাকায় তাকে নিম হাকিম নামে চেনে। নিজ গ্রামে স্কুল ও ঢাকায় কলেজ শিক্ষার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (অনার্স) ও সমাজকল্যাণে মাস্টার্স করেন।

ফার্মাকালচার এন্ড ইকো-ভিলেজ ডিজাইনের ওপর তিনি অস্ট্রেলিয়ার পিআইএ থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। ডেনমার্কের গ্লোবাল ইকো ভিলেজ নেটওয়ার্ক ও অস্ট্রেলিয়ার ইকুলজিক্যাল সলিউশনস এন্ড সাসটেইনেবল ফিউচারস থেকেও তিনি কোর্স করেছেন। ওয়াশিংটন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিম হাকিম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত থেকে বেনারসে মহাত্মাগান্ধী কাশী বিদ্যাপীঠে (বিশ্ববিদ্যালয়) ওয়ার্ল্ড নিম অর্গানাইজেশনের গ্লোবাল অনুষ্ঠানে ‘নিমরত্ন অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি তার উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সেমিনারে উপস্থাপন করে পুরস্কৃত হয়েছেন।

ড. এম এ হাকিম পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানান, ‘তার সারাজীবনের ধ্যান জ্ঞান এতে। মরার পরও এই নিমের খাদ্য হতে চান তিনি। তার শান্তি মিশনে একটি কবরস্থানও করেছেন। যার ভেতরে বাইরে শুধুই নিম গাছ। মৃত্যুর পর এখানেই তাকে দাফন করা হবে। সেখানে পঁচে গলে তার লাশও যেনো নিম গাছের জন্য সার হয়। ’

তিনি বলেন, ‘ইউরোপ আমেরিকায় প্রাকৃতিক ডিফেন্স ম্যাকানিজম নেই। কিন্তু আমাদের আছে। আমরা সেটার সঠিক ব্যবহার করছি না। আর পশ্চিমা কোম্পানিগুলো সে ব্যবহার থেকে আমাদের কৌশলে দূরে রাখছে। অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ আর অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ আমাদের প্রকৃতি প্রদত্ত এ ডিফেন্স ম্যাকানিজমে আমরা খুব ভাল ও সুস্থ সুখের জীবন যাপন করতে পারি। ’

'আমাদের এই প্রাকৃতিক ডিফেন্স ম্যাকানিজমটা সবার কাছে পরিচিত করতে ও সারাদেশে ছড়িয়ে দিতেই আমার এতসব উদ্যোগ', যোগ করেন নিম হাকিম।

এসইউজে/পিএসএস

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও