টাঙ্গাইলে অসহায় শিশুদের জন্য ‘রাতের পাঠশালা’

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টাঙ্গাইলে অসহায় শিশুদের জন্য ‘রাতের পাঠশালা’

আব্দুল্লাহ আল নোমান, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৯

টাঙ্গাইলে অসহায় শিশুদের জন্য ‘রাতের পাঠশালা’

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে গ্রামের দরিদ্র অসহায় শিশুদের জন্য অবৈতনিক নৈশ বিদ্যালয় চালু করেছে শিক্ষিত যুবকরা। এখানে প্রায় ৭০ জন শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করছেন তারা।

তাদের অধিকাংশের অভিভাবকই সন্তানদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না। পারে না স্কুল থেকে দেওয়া বাড়ির কাজগুলো করে দিতে। ফলে কোন কোন শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই ঝরে পড়তে হয়। ঝরে পড়া রোধে এসব শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় যুব সমাজ।

উপজেলার আটিয়া শাহানশাহ্ আদম কাস্মিরী মাজারের পাশেই করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি যেন ‘রাতের পাঠশালা’। রাতে পড়ানোর ফলে শিশুদের দিনের বেলা স্কুলে যেতেও সমস্যা হচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবার পাশপাশি শিক্ষকদের ক্লাস নিতেও সমস্যা হচ্ছে না। উপকৃত হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।

সন্ধ্যায় বাড়িতে শিশুদের পড়ার টেবিলে থাকার কথা। স্কুলের বাড়ির কাজগুলো শেষ করে দেওয়া অভিভাবকদের দায়িত্ব। কর্মজীবি অভিভাবকদের সময় না পাওয়া এবং বর্তমান পাঠ্য বই সম্পর্কে ধারণা কম থাকায় অধিকাংশ অভিভাবক সন্তানদের পড়াতে পারেন না। ফলে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসব শিশুরা আসে অবৈতনিক ওই স্কুলে।

অভিভাবকদের যেমন করে সন্তানকে পড়ানোর কথা, ঠিক ওই দায়িত্বটি পালন করছেন শিক্ষিত যুবকরা। যেন তারাই শিশুদের অভিভাবক। প্রতিদিনের স্কুলের হোমওয়ার্ক আগের দিন সন্ধ্যায় প্রস্তুত করে দিচ্ছেন কর্তব্যরত শিক্ষকরা। ছোটদের জন্য এমন ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টায় শিশুদের উপকারের পাশাপাশি বিষয়টি স্থানীয়দের নজর কেড়েছে।

গত বছরের ২৪ আগস্ট আনষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। বছর খানেক আগে একটি ঘরে শিশুদের পড়ানো শুরু করলেও এখন প্রতিষ্ঠানটির নাম হয়েছে শহীদ মিজানুর রহমান অবৈতনিক নৈশ বিদ্যালয়। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর আটিয়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। মূলত তার নামেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়।

প্রথম পর্যায়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হলেও কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। হতদরিদ্রদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষা সামগ্রী। এ সেবা দ্রুতই দশম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা ভাবছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন ৫ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক।

ওবায়দুল ইসলাম, সুজন, পিয়ার আলী, আসিফ এবং জাহিদ খান মসলিজ মুকুল নিয়মিত শিক্ষা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দিনের বেলায় বিদ্যালয়ে যে পাঠদান করানো হয়, রাতে এই বিদ্যালয়ে তা ভাল ভাবে শিখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

কার্যক্রম শুরুর কিছুদিন পরই টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। পরির্শনকালে জেলা প্রশাসক যুবকদের ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। পরে প্রতিষ্ঠানের জন্য তাৎক্ষণিক দুই টন চাল বরাদ্দ দেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এতে আমরা খুশি। অনেক শিক্ষার্থীই এখানে এসে পড়ছেন। আমরা এখানে এসে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি।

অভিভাবকরা বলেন, এটি একটি ভাল উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটি সামনে যাতে আরো সফলতা পেতে পারে আমরা এই কামনা করছি। 

স্থানীয়রা বলেন, শিশুদের জন্য এমন সেবা বিরল। এতে শিশুরা পড়ালেখায় সক্রিয় হচ্ছে। ঝরে পড়া রোধ হচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এসএম শফিউল্লাহ ফোরকান বলেন, ‘অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। পড়া বুঝিয়ে দিতে পারেন না। এমন শিশুদের পাশে দাঁড়ানোটা অবশ্যই প্রসংশনীয়।’

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদের যুগ্ম-সম্পাদক জাহিদ হাসান মজলিস মুকুল বলেন, ‘শিক্ষার মান বাড়াতে ও ঝরে পড়া রোধ করতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি আমি এবং আমার সহকর্মীরা। তবে ভাড়া জায়গা একটু সমস্যা হচ্ছে, তাই স্থায়ী একটি জায়গার কথা ভাবছি আমরা।’

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক পুলিশ সুপার ও আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা বীরমুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান শরিফ।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দপ্তর সম্পাদক মীর শাফায়েত হোসেন শিপলু পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আরও ভাল ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

তিনি আরো বলেন, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে রাতে চালানো হচ্ছে। পাশেই সরকারি খাসজমি রয়েছে। সরকারিভাবে বিদ্যালয়ের নামে এই জমি বরাদ্দ ও ঘর তৈরি করে দেওয়া হলে গ্রামের দরিদ্র অসহায় ছেলে মেয়েরা এখানে পড়াশুনা করে ভাল ফলাফল করতে পারবে।

শিপলু বলেন, আমরা কয়েকজন বন্ধু আড্ডা দেয়ার সময়

আমাদের মাথায় এমন চিন্তা আসে। সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই আমরা এই কার্যক্রম শুরু করি। সামনে বয়ষ্কদের নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম করানোর চিন্তা রয়েছে।

এএএন/পিএসএস

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও