পর্যটকদের পদচারণায় জমজমাট ভাসমান পেয়ারা বাজার (ভিডিও)

ঢাকা, ১ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

পর্যটকদের পদচারণায় জমজমাট ভাসমান পেয়ারা বাজার (ভিডিও)

জহিরুল ইসলাম জলিল, ঝালকাঠি ৪:৪৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৪, ২০১৯

‘ঝালকাঠির পেয়ারা’ ঐতিহ্যের বাহক। স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় এই পেয়ারার সুখ্যাতি রয়েছে দেশে-বিদেশে।

এ পেয়ারাকে ঘিরে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভীমরুলি গ্রামের চারটি খালের মোহনায় গড়ে উঠেছে বৃহত্তর ভাসমান পেয়ারা বাজার। প্রতিদিন শতশত পর্যটক আসছেন এই ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে।

জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলিতে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই ভাসমান পেয়ারা বাজার (Floating Guava Market)।  

সদর কিত্তীপাশা, শতাদশকাঠি ও ভিমরুলিসহ ১০টি গ্রাম এবং পাশের পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানার বিস্তৃত এলাকায় রয়েছে দেশের তথা এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাগান।

প্রায় শত বছর ধরে এলাকার কৃষকরা ৫০০ হেক্টর জমিতে চাষ করে আসছেন পেয়ারার। প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকার পেয়ারা উৎপাদিত হয় এ বাগানগুলোতে। আর স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় পেয়ারা পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বলেই ‘বাংলার আপেল’ নামে পরিচিত এ পেয়ারা।

এখন পেয়ারার ভরা মৌসুম। কৃষকরা ব্যস্ত বাগান থেকে কচকচে কাঁচা ও পাকা পেয়ারা তুলে বাজারজাত করার কাজে। এখানকার পেয়ারা বাজারজাত করার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীমরুলির খালে বসছে ভাসমান পেয়ারার বাজার। ছোট ছোট নৌকায় করে চাষিরা বাগান থেকে ভাসমান বাজারে নিয়ে আসেছেন পেয়ারা।

পাইকাররা এই পেয়ারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। এবারের পেয়ারার ভরা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলায় অব্যাহত বন্যার কারণে বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পেয়ারা সরবরাহ বা বাজারজাত বন্ধ রয়েছে। এতে ঝালকাঠিসহ দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার পেয়ারা চাষি পেয়ারার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এছাড়ও সংরক্ষণে ব্যবস্থা না থাকায় হাজার হাজার পেয়ারা চাষি হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে এ বছরে পেয়ারার ভরা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলায় অব্যাহত বন্যার প্রভাবে চাষিদের মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত ওই সব এলাকায় ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পেয়ারা সরবরাহ বা বাজারজাত বন্ধ রয়েছে।

হিমাগার ও পেয়ারানির্ভর কোনো শিল্প-কারখানা না থাকার কারণে দ্রুত পচনশীল এ ফল ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে সরবরাহ, বিক্রি ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চাষিরা বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে পাইকারদের কাছে পেয়ারা বিক্রি করছেন। বড় বড় শহরে এ পেয়ারার কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা হলেও এখানে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকা কেজি।

এভাবে প্রতি বছরই চাষিদের কষ্টে উৎপাদিত ফসল নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছে পাইকার নামক মধ্যসত্ব ভোগীরা। বিনাশ্রমে তারা অর্জন করছে বিপুল মুনাফা।

পেয়ারা চাষি রিপন হালদার বলেন, এ বছর আমাদের পেয়ারা খুব ভালো ফলন হয়েছে। তারপরেও আমাদের লাভ হচ্ছে না। পাইকার কম আসায় আমার দাম পাই না। সারা বছর কঠোর পরিশ্রম  ও অর্থ ব্যয় করেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটছে না, বরং দিনে দিনে ঋণের বোঝা বইছে ভুক্তভোগী এসব চাষি। 

পর্যটক নুসরাত জাহান তুলি বলেন, ‘আমি বন্ধুদের কাছে শুনে এখানে ফ্লোটিং মার্কেট দেখতে আসছি। এতো সুন্দর একটি ভাসমান পেয়ারা হাট দেখে আমি মুগ্ধ। যা শুনেছি নিজের চোখে তারচেয়েও বেশি সুন্দর দেখছি। তবে যোগাযোগব্যবস্থা আরো উন্নত করা হলে এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকেন্দ্র হবে।’

পেয়ারা চাষি ফনিভূশন ঢালী বলেন, এবার আমি সাড়ে তিনবিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ করেছি। এ বছর বিভিন্ন জেলায় বন্যার কারণে পেয়ারার দাম কমে গেছে। একজন শ্রমিকের মজুরি দিয়ে আমাদের কিছু থাকে না। বাগান থেকে পেয়ারা পাড়তে শ্রমিককে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। বর্তমানে এক মণ পেয়ারা ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ঝালকাঠি জেলায় ৫৭০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা হবে। যোগযোগব্যবস্থার উন্নতি কিংবা জ্যাম-জেলির কারখানা স্থাপিত হলে দরিদ্র এসব কৃষক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে পারত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

বাংলাদেশের ফ্লোটিং মার্কেট ভীমরুলি গ্রামের ভাসমান পেয়ারা হাট পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আল রবার্ট মিলার। এখানকার পেয়ারা বাগান পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তিনি।

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ফজলুল হক জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পেয়ারা চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এখানে একটি হিমাগার ও জেলির কারখানা করা হলে পেয়ারা চাষিদের উপকার হবে বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও