পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মা-বাবার ঠাঁই এখন ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে’

ঢাকা, ১৪ মে, ২০১৯ | 2 0 1

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মা-বাবার ঠাঁই এখন ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে’

নুর আলম, নীলফামারী ১০:২২ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৩, ২০১৯

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মা-বাবার ঠাঁই এখন ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে’

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে তিন ব্যক্তির উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। মাত্র এক বছরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ১১ জনের ঠাঁই হয়েছে এখানে।

চলছে নারীদের নিয়ে আলাদা একটি ইউনিট চালুকরণেরও। এজন্য একটি বাড়িভাড়া নেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন উদ্যোক্তাগণ।

‘নিরাপদ বিদ্ধাশ্রম’ কিশোরগঞ্জ উপজেলা সদরের কিশোরগঞ্জ ইউনিয়নের কিশোরগঞ্জ সরকারি কলেজ সংলগ্ন (রূপালী কেশবা) এলাকায় ২০১৮ সালের ১৮ জুন যাত্রা শুরু করে।

এটি গড়ে ওঠে উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়ভিটা সরকার পাড়া এলাকার কীটনাশক ব্যবসায়ী সাজেদুর রহমান সাজুর প্রচেষ্টায়।

এরপর থেকে এটির সাথে যুক্ত হন পুটিমারী ইউনিয়নের ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান এবং বড়ভিটা ইউনিয়নের স্নাতকোত্তর করা চাকরি প্রত্যাশী মাসুদ আলম।

তিনজনের সহযোগিতায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অসহায় দরিদ্র বাবা-মাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত জেলার একমাত্র বৃদ্ধাশ্রমটি।

এটি পরিদর্শন করেছেন নীলফামারী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরী, নীলফামারীর সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রশিদুল আলম চৌধুরী, বর্তমান চেয়ারম্যান শাহ আবুল কালাম বারী পাইলট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ জমির উপর টিনশেড বাড়ির চারটি কক্ষে বসবাস করছেন ১১ জন অসহায় বাবা। দশজন কিশোরগঞ্জ উপজেলার হলেও একজন পাশের উপজেলা সৈয়দপুরের।

এখানে যারা নিবাসী হয়েছেন তারা সবাই অতিদরিদ্র সহায় সম্বলহীন এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ছেলে বা সন্তানরাও খোঁজ রাখেন না তাদের।

বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে রয়েছেন বড়ভিটা ইউনিয়নের উত্তর বড়ভিটা এমপি পাড়ার আব্দুল কাফি। বয়স ৭৮। এক ছেলে, এক মেয়ে রয়েছে তার। মেয়ের বিয়ে হলেও ছেলে জীবীকা নির্বাহ করে রিকশা চালিয়ে।
ছেলে খবর রাখেন না বাবা কাফির। কীভাবে খান, কি করেন, কোথায় থাকেন তারও খোঁজ নেন না ছেলে কিংবা ছেলের পরিবার। এর ওর বাড়িতে গিয়ে দু’বেলা খেয়ে বেচেঁ ছিলেন তিনি।

এরই মধ্যে পরিচয় হয় সাজেদুর রহমান সাজুর সাথে। কষ্টের কথা শুনে তার ঠাঁই হয় ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ এ।

আব্দুল কাফি জানান, ‘অভাবের সংসার ছিলো আমার। ছেলেকে মানুষ করে উপার্জন করা শিখালাম। খবর রাখে না কীভাবে খাচ্ছি, কোথায় থাকি, কিছু খোঁজ নেয় না। এখানে ঠাঁই হয়ে অনেক ভালো হয়েছে। ভালোভাবে দিন কাটাতে পারছি। তিন বেলা খেতে পারছি।’

একই এলাকার সুলতান আলী (৮০)। বড়ভিটা ইউনিয়নের জহুরহাজী পাড়ার বাসিন্দা। দিনমজুর দুই ছেলে উপার্জন করলেও বাবাকে নিয়ে থাকেন না। অন্যের জমিতে বাস করেন ছেলেরা।

সুলতান নিজের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। তিনি জানান, ‘এখানে আসার এক বছর হলো কেউ খবর নেয় নি আমার। কি ছেলে কি মেয়ে।’

তিনি বলেন, ‘ছেলে-মেয়ের জন্মদাতা আমি। আজ বৃদ্ধাশ্রমে আমার বসবাস। বাকি জীবনটা যেন এখানে ভালোভাবে থাকতে পারি।’

অপর নিবাসী মতিয়ার রহমান বলেন, ‘সারাদিনে আমরা বিভিন্ন কাজ করে থাকি এখানে। কেউবা শাকসবজির পরিচর্যা, কেউবা কবুতরের খেয়াল রাখা, কেউবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় সহযোগিতা করে থাকি।’

‘এছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একসাথে আদায় করে থাকি এখানেই। বাকিটা সময় ইবাদত-বন্দেগি করে কাটে।’

উদ্যোক্তা আনিসুর রহমান বলেন, ‘নিবাসীদের তিনবেলা খাওয়ার জন্য একজন মহিলা নিয়োজিত রয়েছেন। তিনিও অসহায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। থাকেন প্রক্রিয়াধীন নারী ইউনিটে দু’জন মিলে। রান্নার কাজটি তিনিই সারেন স্বেচ্ছায়।’

তিনি আরো জানান, দৈনিক এখানে খরচ এক হাজার টাকারও বেশি। স্থানীয়ভাবে কেউবা চাল, কেউবা ডাল, কেউবা তেল দিয়ে সহযোগিতা করছেন নিবাসীদের খাওয়ার জন্য। একটি উন্নয়ন সংস্থা বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য দুটি টিউবওয়েল এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি স্যানিটানি ল্যাট্রিন করে দিয়েছে।’

উদ্যোক্তা সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতার সেই বিখ্যাত গান ‘বৃদ্ধাশ্রম’ এ অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ার পরিকল্পনা নিই। শুরুও করলাম গেল বছর। আমাকে সাহস শক্তি জুগিয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে ইউএনও আবুল কালাম আজাদ। তার পরামর্শ আমাকে এগিয়ে নিচ্ছে তিল তিল করে।



তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সরকারিভাবে চাল দেয়া হয়েছে, বিদায়ী জেলা প্রশাসক পরিদর্শন করে কম্বল, শাড়ি আর নগদ টাকা দিয়েছেন নিবাসীদের।

সাজেদুর রহমান জানালেন, প্রতিষ্ঠানটি আমি দাঁড় করাতে চাই। সবার সহযোগিতা চাই, যেন অসহায় দরিদ্র সন্তান পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষদের এখানে ঠাঁই হয়। তাদের যেন আমি সেবা করতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য একটি ইউনিট করার উদ্যোগ নিয়েছি। দুজন মহিলাকে পেয়েছি। তারা থাকতে চান। সহযোগিতাও করছেন। পাশের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে মহিলা ইউনিট করার প্রক্রিয়া করছি।’

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাহ আবুল কালাম বারী পাইলট বলেন, ‘মহৎ একটি উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। আমি এটির সফলতা কামনা করি।

এখানে যারা থাকবেন তাদের সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতার জন্য হাত বাড়াবো। প্রতিষ্ঠানটি যাতে সুনামের সাথে চলতে পারে এদিকেও খেয়াল রাখবো।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল কালাম আজাদ পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ‘প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছে কিছুদিন হলো। সেখানে যারা রয়েছেন সবাই অসহায় হতদরিদ্র মানুষ। সহায় সম্বলহীন। সরকারের সহযোগিতা এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হবে ‘নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রম’ কে। ইতোমধ্যে কিছু করাও হয়েছে সেখানে।’

সমাজসেবা অধিদপ্তর নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ইমাম হাসিম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এটি একটি মহতী উদ্যোগ। যারা করেছেন তাদেরকে স্বাধুবাদ জানাই। সমাজসেবা বিভাগের যতটুকু সহযোগিতা রয়েছে সেখানে করবো নিশ্চয়ই।’

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও