আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাট বানাতে চান যশোরের কারিগররা

ঢাকা, ১ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাট বানাতে চান যশোরের কারিগররা

যশোর ব্যুরো ৩:৪৮ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০১৯

আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাট বানাতে চান যশোরের কারিগররা

সাকিব, তামিম, কোহলিদের খেলার জন্য আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করতে চান যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুরের কারিগররা। এখানকার ক্রিকেট ব্যাটের কদর রয়েছে সারাদেশে।

বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরিতে দরকার ওক কাঠ, যা এদেশে পাওয়া যায় না। কাঠ আমদানি করতে পারলে  সেইমানের ব্যাট তৈরিতে প্রস্তুত মিস্ত্রিপাড়ার এই কারিগররা।

বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরির স্বপ্ন

প্রায় ২৫ বছর ধরে ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন যশোরের নরেন্দ্রপুর গ্রামের মিস্ত্রিপাড়ার কারিগররা। এবার তারা বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরির স্বপ্ন দেখছেন। উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও ব্যাট তৈরির প্রধান উপকরণ কাঠ আমদানি করতে পারলে সাকিব, তামিম, কোহলিদের খেলার ব্যাট তৈরি সম্ভব বলে জানিয়েছেন এই কারিগররা।

এই এলাকার সুবল মজুমদার ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করছেন গত ২৫ বছর ধরে। এ কাজ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের তৈরি ব্যাট সারাদেশে সাড়া ফেলেছে। তবে আক্ষেপ একটাই সাকিব, তামিমদের খেলার ব্যাট তারা তৈরি করতে পারেননি। উন্নতমানের কাঠে অভাবে তারা তা তৈরি করতে পারছেন না।

সুবল মজুমদার বলেন, বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরিতে যে কাঠ দরকার, সেটি আমাদের দেশে নেই। বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারলে আমরা তৈরি করে দিতে পারবো।

একই সুরে আরেক কারিগর তরিকুল ইসলাম বলেন, কাঠের অভাবেই আমরা বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করতে পারি না। কাঠ আমদানি হলে উন্নতমানের ব্যাট তৈরি কোনো ব্যাপার না।

সুবল মজুমদার কিংবা তরিকুল ইসলাম নয়, এই এলাকার কারিগর আরও অনেকেই বললেন একই কথা।

বংশ পরম্পরার পেশা এখন ব্যাট তৈরিতে নির্ভরশীল

বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন নরেন্দ্রপুর মিস্ত্রিপাড়ার মজুমদাররা। কাঠের কাজ তাদের বংশ পরম্পরায়। সময়ে বিবর্তনে বদলে গেছে কাজের ধারা। তবুও ধরে রেখেছেন তাদের কাজ। আগের মতো হরেক রকমের কাঠের জিনিস আর তৈরি হয় না। যুগের চাহিদায় এখন ক্রিকেট ব্যাট তৈরিই তাদের প্রধান কাজে পরিণত হয়েছে। 

প্রবীণ কারিগর মনোরঞ্জন মজুমদার বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই আমরা কাঠের কাজ করছি। হালে প্রতিবেশী অন্য সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ এ পেশায় এসেছে। আগের মতো আর তেমন কাজ নেই। পুঁজির অভাবে নিজেই অন্যের কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছি। যা পাই, তাই দিয়েই চলে সংসার।

পেশার বিবর্তন প্রসঙ্গে কারখানা মালিক সুবল দাস পরিবর্তন ডটকমকে জানান, বাবা-ঠাকুরদাদার আমলে গরুর গাড়ির চাকা তৈরির কাজ ছিল সবচেয়ে বেশি। পরবর্তীতে হালের লাঙল, দাঁড়িপাল্লার শলা, বসার পিঁড়ি, রুটি বেলার বেলন, দা, কুড়াল, কাস্তের আছাড়ি, বিভিন্ন অফিসের কাঠের সিল, আয়নার ফ্রেম, বিদ্যুতের মিটার বোর্ড ইত্যাদি কাজ করেছি।

তিনি জানান, এসব এখন আর কাঠের তৈরি হয় না। লোহা, প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়েছে কাঠ। বর্তমানে ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এজন্য ব্যাট তৈরি করেই জীবিকা নির্বাহ করছি। খুব বেশি লাভ না হলেও খেয়ে-পরে চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিস্ত্রিপাড়ার কারিগররা।

ক্রিকেট ব্যাটের কদর সারাদেশে

প্রতি বছর সাত ক্যাটাগরির প্রায় ৪ লাখ পিস ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয় নরেন্দ্রপুর মিস্ত্রিপাড়ায়। এই ক্রিকেট ব্যাটের সবচেয়ে বড় বাজার উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো। এছাড়া যাচ্ছে অন্যান্য জেলাতেও। প্রতিটি ব্যাটের পাইকারী মূল্য ২০ থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত।

সারা বছর ব্যাট তৈরি হলেও মূলত চারমাস জমজমাট থাকে। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র মাস ঘিরেই চাঙ্গা থাকে ব্যাট তৈরির কারিগররা। মৌসুমে ৩০-৩৫টি কারখানা সচল থাকলেও বাকি আট মাসে ১২-১৫টি কারখানায় ব্যাট তৈরি হয়। নানা সমস্যার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই টিকে আছেন এখানকার কারিগররা।

নরেন্দ্রপুর মহাজের পাড়ায় ক্রিকেট ব্যাটের কারখানা রয়েছে তরিকুল ইসলামের। তিনি জানালেন, এ বছর তার কারখানায় প্রায় ১৬ হাজার ব্যাট তৈরি হয়েছে। মানভেদে এসব ব্যাট ২০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

কারিগররা জানান, ভালোমানের ব্যাট তৈরি করতে ৭০-৭৫ টাকার কাঠ, মজুরি ৫০ টাকা, হাত ১০ টাকা, গ্রিপ, স্টিকার, পলিথিন ২০ টাকা খরচ হয়। এছাড়াও আনুষাঙ্গিক খরচ আছে।

ব্যাট তৈরিতে জীবন, নিম, গুল্টে (পিটলি), পুয়ো, ছাতিয়ান, ডেওয়া কাঠ ব্যবহার করা হয়। ভালোমানের ব্যাট তৈরিতে নিম ও জীবন কাঠ বেশি ব্যবহৃত হয়।

শরিফুল ইসলাম নামে আরেক কারিগর বলেন, ব্যাট বেচাকেনার মৌসুম চারমাস। বছরের বাকি সময় ব্যাট তৈরি করে মজুদ করা হয়। পাইকারদের চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ, মোটর প্রচলন হওয়ায় কাজে গতি এসেছে। কষ্ট কমেছে, উৎপাদন বেড়েছে।

ব্যাট কারখানার শ্রমিক সঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, এখানে কাজ করেই সংসার চালাই। প্রায় ২৫ বছর ধরে ব্যাট তৈরির কাজ করি। বড় সাইজের ব্যাট প্রতি ১০ টাকা ও ছোট সাইজের ব্যাট প্রতি ৬ টাকা হারে মজুরি পায়। সেই হিসেবে দিনে ৩৫০-৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।

একই কথা জানান কৃষ্ণচন্দ্র দাস। তিনি জানান, ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজেই চলে তার সংসারের চাকা।

নানা সমস্যায় মিস্ত্রিপাড়ার বাসিন্দারা

নরেন্দ্রপুর বটতলা থেকে শুরু হয়ে ইটের সোলিং। মিস্ত্রিপাড়ার শুরুতেই সেই সোলিং শেষ। এরপর কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়। মিস্ত্রিপাড়ার প্রধান রাস্তাটি দীর্ঘদিনেও পাকা না হওয়ায় ভোগান্তির শেষ নেই। এখনাকার বাসিন্দাদের দাবি, রাস্তাটি পাকা করে দিলে যোগাযোগ সহজ হবে। সম্ভাবনার শিল্পটিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

অপরদিকে, ব্যাংক ঋণ পেতে বেগ পেতে হয় ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারিগরদের। এজন্য তারা চড়া সুদে এনজিও ঋণে ঝুঁকছেন। ফলে লাভের চেয়ে সুদ গুনতেই হিমশিম খেতে হয়।

যশোরের জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নরেন্দ্রপুরের ক্রিকেট ব্যাট তৈরির সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করা হবে। তাদের উন্নয়নে সবকিছুই করা হবে। ওই গ্রামের রাস্তাটির বিষয়ে খোঁজ নেয়া হবে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে রাস্তা পাকাকরণের ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ঋণের ব্যাপারে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবো। তবে কারিগরদের প্রতিনিধিরা আমার সঙ্গে দেখা করলে ভালো হতো। তাদের ভালো কাজকে এগিয়ে নিতে আমরা উৎসাহিত করবো।

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও