অব্যবস্থাপনার কারণেই ফেনীর সীমান্ত হাটের দুরবস্থা

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

অব্যবস্থাপনার কারণেই ফেনীর সীমান্ত হাটের দুরবস্থা

আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী ৯:১২ অপরাহ্ণ, জুন ০৩, ২০১৯

অব্যবস্থাপনার কারণেই ফেনীর সীমান্ত হাটের দুরবস্থা

ফেনীর ছাগলনাইয়া-ত্রিপুরার সাব্রুমের শ্রীনগরের হাটটি তৃতীয় সীমান্ত হাট। ২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি হাটটি খোলা হয়।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সীমান্ত এলাকায় বৈধ বাণিজ্য নিশ্চিতে যাত্রা শুরু করেছিল সীমান্ত হাট কার্যক্রম। ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চারটি সীমান্ত হাট চালু করা হয়েছে।

চার বছর পেরিয়ে পাঁচ বছর অতিক্রম করছে হাটটি। শুরুর দিকটায় দুই পার বাংলার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে বেশ চাঙা ছিলো হাটটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়েছে হাটের কার্যক্রম, বিরাজ করছে মন্দা অবস্থা।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সেদেশের প্রশাসন মাত্র ৫শ লোক ছাড়া আর কাউকেই হাটে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না, যেমনটা শুরুর দিকে ছিলো না, এ কারণে বর্তমানে বাংলাদেশি দোকানগুলোতে বিক্রি কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে।

অপরদিকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ ক্রেতারা হাট থেকে পণ্য ক্রয় করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী নানা অজুহাত দেখিয়ে তা রেখে দেয়, যদিও ২শ ডলার সমমূল্যের পণ্য কেনার বৈধতা আছে। কেনা পণ্য বিজিবি রেখে দেয়ার কারণে ক্রেতারা হাটে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এ দুরবস্থার জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন হাট পরিচালনাকারী দুই দেশের অব্যবস্থাপনাকে।

সম্প্রতি হাটটিতে গিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষদের সাথে কথা বলে পাওয়া যায় আরো বিভিন্ন তথ্য। 

ভারতীয় পণ্যের কদর

শ্রীনগর সীমান্ত হাট অনেকটা দখলে ভারতীয় পণ্যের। দুই দেশের পণ্য বিকিকিনির হিসাবেও ঢের পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি মঙ্গলবার বসা এ হাটে দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা গাড়ি হাঁকিয়ে হুমড়ি খেয়ে হাটে ঢুকে অবাধে ভারতীয় মাল কিনছেন। অপরদিকে ভারতীয় অংশে কড়াকড়ি থাকায় অনেকটা ক্রেতাশূন্য হাটের বাংলাদেশি পণ্যের অংশ। দু’দেশের বৈধ পণ্যের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উভয় দেশের জনগণের মধ্যে ভাব বিনিময় ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন রচনা ছিল এ হাটের উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো।

ছাগলনাইয়া সীমান্ত হাটে সরেজমিনে দেখা যায়, ভারতীয় পণ্যের আধিক্য। নির্দিষ্ট পণ্য তালিকার বাইরের অনেক পণ্যসামগ্রীও বেচা-কেনা হচ্ছে। ফেনী, ছাগলনাইয়া ও বারইয়ারহাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ বাজার থেকে পণ্য চোরাচালান করে। দাম কম হওয়ায় বাংলাদেশিরা অনেকটা হুমড়ি খেয়ে ভারতীয় পণ্য কিনছেন দেদারছে।

বাংলাদেশি শেডের ব্যবসায়ীরা জানান, এ বাজারের শতকরা ৯০ শতাংশ ক্রেতাই বাংলাদেশি, তারা ভারতীয় পণ্য কিনেন। আর ১০ শতাংশ ভারতীয়, তারা বাংলাদেশি পণ্য কিনেন।

ক্রেতারা জানান, হাটে ভারতীয় অংশে বিক্রি হচ্ছে না কোনো ধরনের খুচরা পণ্য। হরলিক্স, গুঁড়ো দুধ, প্যাম্পার্সসহ ভারতীয় সব প্রসাধনী কিনছেন তারা।

বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি আতাউর রহমান বলেন, বাংলাদেশি বাজারে মাছ, শুঁটকি, মুদি মাল, বেকারি ও প্লাস্টিক পণ্য বিক্রি হলেও ভারত থেকে আসছেন না তেমন কোনো ক্রেতা। হাটে প্রবেশে সেদেশের কড়াকড়ি থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছে বাংলাদেশি বিক্রেতারা।

অসম বাণিজ্য

বাংলাদেশ ও ভারত, দু’দেশের পারস্পরিক সমঝোতায় সীমান্ত এলাকার মানুষের কল্যাণের জন্য চালু করা হয়েছিলো সীমান্ত হাটটি। কিন্তু বিগত চার বছরে হাটের কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা হলে দেখা যায় এতে বিরাজ করছে অসম বাণিজ্য। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণে পণ্য বিক্রি করলেও সে পরিমাণে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিক্রি খুবই নগণ্য।

ছাগলনাইয়া উপজেলার পূর্ব মধুগ্রাম এবং ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরার শ্রীনগরের মাঝে সীমান্ত এলাকার এই হাট নিয়ে শুরুর সময় দুই দেশের পক্ষ থেকেই অনেক আশার কথা বলা হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, আশপাশের পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় বসবাসরত দুই দেশের দেড় থেকে তিন হাজার মানুষ এই হাটে এসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার সুযোগ পাবেন। প্রতি মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হাট খোলা থাকবে।

কয়েকটি আধাপাকা ঘর নিয়ে গড়ে তোলা এই হাট শুরুতে স্থানীয়দের মধ্যেও বেশ সাড়া ফেলে। বিজিবি বা বিএসএফকে পাস বা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বাজারে প্রবেশের নিয়ম করা হয়। কোন দেশের বিক্রেতারা কী কী বিক্রি করতে পারবেন, তার একটি তালিকাও ঠিক করে দেয়া হয়। কিন্তু এখন বেশির ভাগ নিয়মই মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।

হাটটি বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়াকড়িতে সেদেশের ক্রেতারা হাটে আসে কম। তবে চুক্তি বহির্ভূত ভারতীয় পণ্য ঠিকই বাজারে আসছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশি একটি চক্র বিজিবি সদস্যদের ম্যনেজ করে ভারতীয় এসব পণ্য ঢোকার ব্যবস্থা করছে। ভারতের ক্রেতারা বাজারে না আসায় অসম বাণিজ্যের কারণে এ দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি হাটে বাংলাদেশের ২৭ দোকানি মিলে যেখানে ৭/৮ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারেন, তার বিপরীতে ভারতীয় ২৭ দোকানি মিলে বিক্রি করে ৬/৭ লাখ টাকারও বেশি পণ্য।

ফেনী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের তথ্য মতে, বিগত ছয় মাসের ২৫টি হাটে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেছে প্রায় তিন কোটি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, অপর দিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেছে ২ কোটি ২৫ হাজার টাকার মতো। এসিস্ট্যান্ড রেবিনিউ অফিসার ফজলুল এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তৈরি হয়েছিলো অচলাবস্থা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে অসম বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে টানা ৪টি হাট প্রায় ১ মাসের অচলাবাস্থা তৈরি হয়েছিল ফেনীর সীমান্ত হাটে। ধর্মঘটের কারণে দুই দেশের ক্রেতা-বিক্রেতারা বাজারে আসতে পারেনি। দূর-দূরান্ত থেকে হাটে এসে ফিরে গেছে ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। ধর্মঘট গড়ালে হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভারত ও বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বসে আবার হাট চালু করেন।

ফেনী সীমান্ত হাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউর বলেন, ‘নিয়ম করা হয়েছিল, একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুইশ ডলারের পণ্য কিনতে পারবেন। ভারতীয় ক্রেতারা পাঁচ কেজির বেশি পণ্য কিনলে বিএসএফ আটকে দেয়। আর বাংলাদেশি ক্রেতারা তিন/চারশ ডলারের পণ্য কিনলেও বিজিবি বাঁধা দেয় না।’

এই পরিস্থিতিতে অব্যাহতভাবে লোকসান গুণতে হচ্ছে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশি বিক্রেতারা গত ১৫ জানুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকেন। এরপর গত ১ মাস ধরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের মত কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের কারণে সীমান্ত হাটের ফটক বন্ধ রেখেছিলো বিজিবি। এ দেশের ব্যবসায়ীরা বাজারে না বসায় ক্রেতাশূন্য বাজারে ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও আসতে পারেনি।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ভারতীয় দোকানগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যও বিক্রি হয়। সেগুলো কম দামে কিনে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি চক্র আবার তার দেশে মুদি ও মনোহরি দোকানে বিক্রি করেন। আর গ্রামের মানুষ না বুঝে সেসব পণ্য কিনে ঠকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজজামান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাট পরিচালনা করার নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। হাটের চার পাশের ৫ কিলোমিটার এলাকার মানুষের জন্য এ হাটে প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেটিও মানা হচ্ছে।

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও