অযত্ন-অবহেলায় নওগাঁর ২শ বছরের ভিমের পান্টি

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

অযত্ন-অবহেলায় নওগাঁর ২শ বছরের ভিমের পান্টি

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ ৪:৫৮ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০১৯

অযত্ন-অবহেলায় নওগাঁর ২শ বছরের ভিমের পান্টি

নওগাঁ জেলায় বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে ভিমের পান্টি অন্যতম। এছাড়া এ উপজেলায় জগদ্দল বিহার, আলতাদীঘি, মাহিসন্তোষ, আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান শালবন রয়েছে। তবে ঐতিহাসিক এ ভিমের পান্টিটি অযত্ন আর অবহেলায় দিন দিন ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

জানা যায়, ধামইরহাট উপজেলার একেবারে পূর্বপ্রান্তে জয়পুরহাট জেলার সীমানা ঘেঁষে জাহানপুর ইউনিয়নের মুকুন্দপুর-হরগৌরী এলাকায় একটি মাঝারি (বেড় ১৭০ মিটার এবং উচ্চতা ১০ মিটার) আকারের ঢিবি ও ১৪টি বিভিন্ন আকারের পুকুর রয়েছে। ধামইরহাট-জয়পুরহাট সড়কের মঙ্গলবাড়ী নামক বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে মুকুন্দপুর গ্রামে হরগৌড়ি মন্দির ভীমের পান্টি অবস্থিত।

মঙ্গলবাড়ী থেকে পাকা রাস্তাযোগে কাজীপাড়া যাওয়ার পথে ভিমের পান্টি পাওয়া যাবে। পাকা রাস্তা থেকে মাত্র ৪শ মিটার ইট বিছানো ও মেঠো পথ দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে একটি পুকুর অমৃতকুণ্ড ও অপরটি কোদাল ধোয়া নামে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত একটি ঢিবিতে কী রয়েছে তা আজও জানা সম্ভব হয়নি। তবে এর সর্বত্র ইটপাটকেল ও খোলাকুচির ছড়াছড়িসহ কোথাও কোথাও কাদায় গাঁথা ইটের গাঁথুনির পলেস্তরাবিহীন চিহ্ন দেখা যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে বীরেশ্বর-ব্রহ্মচারী নামে এক সাধক এ ঢিবিতে একটি কালো পাথর উৎকীর্ণ মাঝারি আকারের মূর্তি পেয়েছিলেন। তাই তিনি ওই ঢিবির ওপর ছোট আকারের চারটি মন্দির নির্মাণ করে ওই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওই সময় ঢিবির ওপর উত্তর-পশ্চিম কোণে ২.৩৯ মিটার ও ৯১ সেন্টিমিটার পরিসরের এক কোঠা বিশিষ্ট একটি পূর্বমুখী স্থাপনা ছিল।

১৯৭৮ সালে ওই ঢিবি থেকে একটি চোকলাতলা কালো পাথরের উমা মহেশ্বর মূর্তি উদ্ধার করে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ওই ঢিবির দক্ষিণে ৫৮ সেন্টিমিটার দূরত্বে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা অনুরূপ আরো একটি ভাঙা দেয়াল ছিল। সেই দেয়ালের উচ্চতা ১.২২ মিটার। এগুলোকেই বীরেশ্বর ব্রহ্মচারী স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা যায়।

বর্তমানে এগুলোর নিদর্শন নিশ্চিহ্ন করে সেখানে নতুন মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। ঢিবির পাদদেশ থেকে দক্ষিণ দিকে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি শুরু। দূরে একটি উঁচু পাড়ওয়ালা পুকুরও রয়েছে। তবে এ প্রত্নস্থলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো একটি একখণ্ড কালো পাথরের থাম। এটির নামই ভিমের পান্টি। যা ঢিবিটি থেকে মাত্র ৮১ মিটার দক্ষিণে ফসলি জমির মাঝে সামান্য হেলে সম্পূর্ণ অরক্ষিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

স্থানীয়দের কাছে এটি ভিমের পান্টি আবার কেউ কেউ কৈবর্ত রাজা ভিমের লাঠি বলে থাকে। দেখতে অনেকটা প্রলম্বিত মোচার মতো। এ থামের গা অত্যন্ত মসৃণ। পাদমূলে এর বেড় ১.৮০ মিটার বর্তমান উচ্চতা ৩.৭৯ মিটার। অতীতে এর ওপর একটি বিষ্ণুর বাহন অর্ধ নর ও অর্ধ পাখির মূর্তি বসানো ছিল। কিন্তু বজ্রপাতের আঘাতে সেটি নিশ্চিহ্ন হওয়াসহ থামের মূল অংশের একটি ফালি ধসে গেছে। তবে অক্ষত থাকা অংশের ৫৬.৭ সেন্টিমিটার ও ৪৯.৩ সেন্টিমিটার পরিমাপের একটি চতুষ্কোণাকার উপরের অংশে আজও ২৮ পংতির একটি সংস্কৃত ভাষ্য উৎকীর্ণ রয়েছে। এ থামটি বরেন্দ্রর পাল রাজা নারায়ণ পালের মন্ত্রী ভটুগুরুভ ৮৯৬-৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে ওই রাজবংশসহ মিশ্র বংশপঞ্জি বর্ণিত রয়েছে। এটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে।

মঙ্গলবাড়ী সাহিত্য আড্ডা সংগঠনের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ভিমের পান্টি বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রাচীন নিদর্শনটি এখনি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এছাড়া লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে ঘের দেয়া প্রয়োজন। এখানে কালীমন্দির, শিবমন্দির, হরগৌড়ী মন্দির এবং ভিমের পান্টি থাকায় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে।

ভিমের পান্টি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি বিজয় চন্দ্র মণ্ডল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, হিন্দুদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থান। কিন্ত এখানে পাকা রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই এবং লোকজনের থাকার কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় পুণ্যার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

জাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওসমান আলী পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ইউনিয়নের পরিষদ থেকে ২শ মিটার রাস্তা ইট বিছানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৪শ মিটার রাস্তাটি পাকাকরণের পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণপতি রায় বলেন, ভিমের পান্টি সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া তিনটি মন্দির থাকায় ওই রাস্তাটি অচিরে পাকাকরণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং মানুষের থাকার সুব্যবস্থার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

এইচআর