মনিকাদের আঁতুড় ঘরের বেহাল দশা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

মনিকাদের আঁতুড় ঘরের বেহাল দশা

প্রান্ত রনি, রাঙ্গামাটি ৪:০৬ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০১৯

মনিকাদের আঁতুড় ঘরের বেহাল দশা

বাংলাদেশের নারী ফুটবলার মনিকা চাকমা (১৬)। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে একটি দর্শনীয় গোল করে, যেটি ফিফার দর্শক জরিপে সেরা পাঁচে স্থান পেয়েছে। সেই থেকে আলোচনায় এখন মনিকা চাকমা। দুর্গম পাহাড় থেকে কীভাবে তিনি উঠে এলেন জাতীয় পর্যায়!

মনিকাদের পথচলা এতটা মসৃণ ছিলো না। তাদের আঁতুড় ঘর (অনুশীলনের মাঠ) রয়েছে বেহাল দশায়। অনুশীলনের জন্য মাঠটি যুগোপযোগী নয়, নেই পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলাধুলার সরঞ্জাম।

কিন্তু অদম্য চেষ্টা ও নিজেদের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা এতটা পথ পাড়ি দিয়ে মুগ্ধ করেছে ক্রীড়ামোদী মানুষকে। বিশ্বদরবারে উজ্জ্বল করেছে দেশের নাম।

মনিকা চাকমার জন্ম খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দুর্গম সুমন্ত পাড়া গ্রামে। তার বাবা বিন্দু কুমার চাকমা একজন কৃষক। মা রবিমালা চাকমা গৃহিনী। কিন্তু তার জন্ম দুর্গম পাহাড়ে হলেও বেড়ে উঠেছেন রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়াতে। ঘাগড়ার মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে এখন ঘাগড়া কলেজে পড়াশোনা করছেন মনিকা চাকমা। ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি তার প্রচণ্ড ঝোঁক। মেয়ে হয়েও শত বাধা ডিঙিয়ে ফুটবলশৈলীর মাধ্যমে অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলে ডাক পান মনিকা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরু থেকেই নানা টানা পোড়নের মধ্যে দিয়েই তাদেরকে ফুটবল খেলায় টিচিং দিয়ে যাচ্ছেন কোচ শান্তি মনি চাকমা। বিভিন্ন ধরনের সংকট রয়েছে তাদের, রয়েছে খানাখন্দ ভরা মাঠ। সে মাঠে সামান্য বৃষ্টি হলেই জমে কাদা। আর এখানেই তাদের দু’বেলা অনুশীলন করতে হয়। মাঠে একটি গোলবার থাকলেও অন্যটি বাঁশের তৈরি। ১৫-১৬ জনকে মাত্র দুইটি বল নিয়ে অনুশীলন করতে হয়। জার্সি থেকে শুরু করে অন্যান্য সরঞ্জামের সংকটতো রয়েছেই।

অন্যদিকে এখানে তাদের থাকতে হয় হোস্টলে। সকাল-বিকেল দু’বেলা অনুশীলনের ফাঁকেই নিজেদের রান্না করতে হয়। পরিবারের কাছ থেকে আনা অর্থ দিয়ে মাস কাটে তাদের। এরমধ্যে পড়াশোনার চাপতো আছেই। সবমিলিয়ে শতকষ্টের মধ্য দিয়ে তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা। এই মাঠ থেকেই মনিকা চাকমা ছাড়াও নারী জাতীয় দলে খেলছেন অ্যানাই মগিনী, আনুচিং মগিনী, ঋতুপর্ণা চাকমা ও রূপনা চাকমা।

‘ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা অনেক কষ্টে পড়াশোনা করছে। তারা বিভিন্ন ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে সকাল-বিকেল এই মাঠে দু’বেলা অনুশীলন করে’- জানালেন কৃতি ফুটবলার মনিকা চাকমা।

আক্ষেপ করে মনিকা জানালেন, ‘এই মাঠের অবস্থা খুবই খারাপ। এই মাঠ যদি ভালো হয় তাহলে আমাদের অনুশীলন আরো ভালো হবে। ছেলে-মেয়েরা যেভাবে বল পুশ-পাস করে তাদের এগুলো এনাফ না। যার কারণে বলগুলো দৌড়ে অন্যদিকে যায়, এ কারণে বল রিসিভও ভালো হয় না।’

এই নারী ফুটবলার বলেন, যেহেতু আমি শুরু থেকে এই মাঠে খেলেছি, অনুশীলন করেছি তাই আমি দাবি রাখবো- সরকার যেনো মাঠটা খেলার উপযোগী করে দেয়। এই বিদ্যালয়ের মাঠে এভাবে অনুশীলন করে আমরা ন্যাশনাল টিমে পাঁচজন খেলছি। এসব বিষয়ে সরকার নজর দিলে এখান থেকেই আরো অনেক মেয়ে ন্যাশনাল টিমে খেলতে পারবে।

মনিকা চাকমাদের কোচ শান্তি মনি চাকমা বলেন, ‘২০১১ সালেই বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই মনিকাদের নিয়ে আমাদের যাত্রা। ২০১১ সালে সারা দেশে মগাছড়ি সরকারি বিদ্যালয় টিম চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৩ সালে আমরা আবার জাতীয় পর্যায়ে রানার্স-আপ হই। তখন থেকেই আমরা এই টিম ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো নিরলসভাবে কাজ করলে বিভিন্ন এলাকায় থেকে খেলোয়াড় উঠে আসতো। সে ধরনের উদ্যোগের অভাবে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসছে না।’

কোচ শান্তি মনি চাকমা বলেন, ‘এখানে মেয়েদের অনুশীলনের জন্য খাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটিই একমাত্র মাঠ। এছাড়া আর কোনো ভালো মাঠ নেই। এ মাঠেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা। উঁচু-নিচু স্থান, এরমধ্যে পাথর-কুচি। খালি পায়ে বাচ্চারা অনুশীলন করতে পারে না। সামান্য বৃষ্টি হলেই মাঠে জমে যায় কাদা।’

এলাকার বাসিন্দা শান্তিময় চাকমা বলেন, ‘মাঠটি আগে খুবই করুণ অবস্থায় ছিলো। সেনাবাহিনী তাদের বুলডোজার এনে কিছুটা সমান করে দিয়েছে। যেহেতু এটি একটি ঐতিহাসিক মাঠ, এই মাঠ থেকেই ৫/৬ জন জাতীয় দলে খেলছে। তাই আমি সরকারের কাছে মাঠটি সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছি। এটি দ্রুত সংস্কার করে দিলে এলাকার ছেলে-মেয়ে ও বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা উপকৃত হবে। এখানকার ছেলে-মেয়েদের তেমন ভালো খেলাধুলার সরঞ্জাম, বুট, জার্সি, ফুটবলও নেই। সে ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসা দরকার।’

রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আজম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু করা সম্ভব না হলেও আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছে তিনি শিগগিরই সেখানে যাবেন। ছেলে-মেয়েদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনবেন এবং ফুটবলার মনিকার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করবেন। এছাড়া ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলার সুবিধায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।’

জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে তথ্য রয়েছে। আমি রোজার পরেই তাদের পাশে দাঁড়াবো। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সব উপকরণ দেয়া হবে।’

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও