নার্সারি ব্যবসা করে গ্রামটায় বদলে দিলেন মোজাম্মেল

ঢাকা, ১৫ মে, ২০১৯ | 2 0 1

নার্সারি ব্যবসা করে গ্রামটায় বদলে দিলেন মোজাম্মেল

বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০১৯

নার্সারি ব্যবসা করে গ্রামটায় বদলে দিলেন মোজাম্মেল

গ্রামের নাম এখন নার্সারিপাড়া। চারিদিকে বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ সতেজ চারা। মাঝে মাঝে চোখ জুড়ানো বাহারি রঙের ফুল বাগান। এ সৌন্দর্য কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠেনি। কিছু লোকের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয়েছে সবুজের এ সমারোহ। তাদেরই একজন মোজাম্মেল হক।

কামিল পাস এ যুবক চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে শুরু করেন নার্সারি ব্যবসা। এ পেশায় আজ তিনি স্বাবলম্বী। নাম দেয়া হয়েছে ‘আল আমিন’ নার্সারি।

মোজাম্মেল হক বড়পই নার্সারিপাড়া গ্রামের মৃত আক্কাস আলী মণ্ডলের ছেলে। মাত্র ১২০ টাকা পুঁজি নিয়ে এ পথে যাত্রা শুরু করেন মোজাম্মেল। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাফল্যের সোনার হরিণটি হাতে পেয়েছেন তিনি। এখন তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রায় ২০ বিঘার বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তুলেছেন নার্সারি। তার এ নার্সারিতে প্রতিদিন কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ জন শ্রমিকের। দৈনিক ২৫০ টাকা মজুরিতে এসব শ্রমিক সকাল ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কাজ করেন।

নওগাঁর মান্দা উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে এই গ্রামের অবস্থান। মৌজা বড়পই হলেও নার্সারিপাড়া নামেই এখন অধিক পরিচিত গ্রামটি। বর্তমানে পাড়ার অন্তত ৬০ জন ব্যক্তি এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত ৩ শতাধিক শ্রমিকের। বেকারত্ব দূর হয়েছে আশপাশের আরও অনেকের।

নার্সারি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ১৯৯৪ সালে আমার বাবা আক্কাস আলী মারা যান। তখন আমি রেবা আখতার আলিম মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। এর দুই বছর পর আমার দু’ভাই আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুল মালেক পৃথক হয়ে যান। বাবা মারা যাওয়ার আগে অন্য দু’ভাইও পৃথকভাবে সংসার করছিলেন। পৈত্রিক সূত্রে বসতবাড়িসহ সাড়ে ৫ কাঠা জমি পাই। এ অবস্থায় মা মতিজান বিবিকে নিয়ে আমি দিশোহারা হয়ে পড়ি। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে।

মোজাম্মেল হক বলেন, মাত্র ১২০ টাকা পুঁজি নিয়ে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। ভগ্নিপতি হায়দার আলীর কাছ থেকে দেড় শতক জমি একবছর পরে পরিশোধের চুক্তিতে ১৫০০ টাকায় লিজজ নিয়ে পেঁপের চারা তৈরির কাজ শুরু করি। লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রামের অন্য নার্সারিতে শ্রম দিয়ে আয়ের টাকায় সংসার চালিয়ে নিই। এভাবেই অভাব-অনটনের মধ্যে ২০০১ সালে দাখিল পাস করি। এরপর পরানপুর মাদ্রাসা থেকে আলিম, বড়বেলালদহ মাদ্রাসা থেকে ফাজিল ও নওগাঁর নামাজগড় মাদ্রাসা থেকে কামিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই।

তিনি বলেন, ২০০১ সালে দাখিল পাসের পর একটি এনজিও’র মাধ্যমে নার্সারি বিষয়ে ময়মনসিংহ হর্টিকালচারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে চাকরির চিন্তা-ভাবনা না করে নার্সারি ব্যবসায় মনোনিবেশ করি। শিক্ষা ও মেধা কাজে লাগিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্যা করতে থাকি।
অল্পদিনের মধ্যেই এর সুফল আসতে শুরু করে। এরপর বছর চুক্তিতে জমি লিজ নিয়ে ব্যবসার প্রসার ঘটনা তিনি।

তার নার্সারিতে রয়েছে কলা, আম, আম ব্লাডস্টোর, গৌড়মতি, বারি-৪, হাইব্রিড রূপালী, হাড়িভাঙা, নাগফজলিসহ অন্তত ৩০ জাতের আমের চারা। এছাড়া ৫ জাতের কমলা, বারি মাল্টা-১, ৩ জাতের লেবু, থাই, চায়না, ভেডিগেড, পলি, মাধবিলতাসহ ৭ জাতের পেয়ারা, ৪ জাতের লিচু, বেদেনা আনার, কেরালা, ভিয়েতনাম, সুনরি ও দেশিজাতের নারকেল, লটকনসহ অনেক দেশীয় ফলদ গাছে চারা রয়েছে।

অন্যদিকে মেহগনি, আকাশমনি, বেজিয়ামসহ অনেক প্রজাতির বনজ চারা রয়েছে তার নার্সারিতে। এছাড়া এখানে পাওয়া যাবে ১০ জাতের গোলাপসহ বিভিন্ন ফুলের চারা। বর্তমানে প্রায় ২০ বিঘা জমির বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই নার্সারি। এটিই নওগাঁ জেলার বৃহত্তম নার্সারি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

নার্সারি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক আরো জানান, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় আমার নার্সারি পুরোটাই পানিতে তলিয়ে যায়। পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ছোট চারাগুলো নষ্ট হয়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেই ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারিনি। এছাড়া গত মৌসুমে ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় জলপাই, আমড়া ও কাঁঠালের ৪ হাজার চারা নষ্ট যায়। এ বিষয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বন্যায় ক্ষতির পরও কৃষি দপ্তর থেকে কোনো সহায়তা দেয়া হয়নি। নার্সারি পরিচর্যার ক্ষেত্রেও সহায়তা মিলে না কৃষি দপ্তরের। মিলে না সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও।

এই নার্সারির মালিক দাবি করেন, কৃষি অফিসের সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই পেশাকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। তৈরি হবে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও।

এইচআর

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও