ভারি গাড়ি গেলেই কেঁপে ওঠে স্কুলটি

ঢাকা, ১৫ মে, ২০১৯ | 2 0 1

ভারি গাড়ি গেলেই কেঁপে ওঠে স্কুলটি

মো. জাহিদ হাওলাদার, বরগুনা ৯:২৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০১৯

ভারি গাড়ি গেলেই কেঁপে ওঠে স্কুলটি

বরগুনা পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চরকলোনী হামিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জরাজীর্ণ এই বিদ্যালটিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকরা। যেকোনো সময় এই বিদ্যালয়টি ধসে পড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা। ভবন ধসের আতঙ্কে আছে শিক্ষার্থীরাও।

বরগুনা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস ভবনটিকে মৌখিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও লিখিত কোনো নির্দেশনা পায়নি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাই পরিত্যক্ত বিদ্যালয়ে আতঙ্কের মধ্যেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন এমএ হামিদ মিয়া। এরপর ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করা হয়।  স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১৯৮৯ সালে এখানে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১৪ জন শিক্ষক নিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৫১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত অবস্থায় আছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টির অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে রড বেরিয়ে গেছে এবং বৃষ্টি হলে ছাদ চুয়ে পানি পড়ে। স্কুলভবনের কক্ষের ভিতরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। দেওয়ালগুলো হয়ে গেছে স্যাঁতস্যাঁতে। রাস্তা দিয়ে কোনো ভারি যানবাহন  গেলে ভবনটি কাঁপতে থাকে। এমন অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মারজুক জানায়, সামনে তাদের পরীক্ষা। এজন্য বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাধ্য হয়ে তারা ক্লাস করছে।

স্কুল ধ্বসে পড়ার আতঙ্কে পাঠে ভালোভাবে মনোযোগী হতে পারে না বলেও জানায় সে।

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রহিমা বেগম বলেন, বর্ষাকালে ক্লাসের মধ্য পানি পড়ে। বেশি শব্দে ভবনটি কেঁপেও ওঠে।  এভাবে কি লেখাপড়া করানো যায়?

আরেক অভিভাবক মোসাম্মৎ আখি বলেন, স্কুলের পলেস্তারা খুলে খুলে পড়ছে। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যেই থাকি।

চলতি বছরের মার্চ মাসের ১৩ তারিখ জেলা পর্যায়ে আন্ত:প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শেফা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান। এসময় প্রধানমন্ত্রী এখানে নতুন ভবন দেওয়ার আশ্বাস দেন।

শেফা পরিবর্তন ডটকমকে বলেছে, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তাকে আমাদের বিদ্যালয়ের কথা বলি। এসময় তিনি আমাকে এখানে নতুন ভবন দেওয়ার কথা বলেন।

বুধবার (১৭ এপ্রিল) সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম কবীর বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে। পরে তিনি প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন বইতে  লেখেন, এই বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যেই বিদ্যালয়ে পাঠদান হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এই ভবনে পাঠদান না করানোর অনুরোধ করা  হলো।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম কবীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আমি অথবা আমার বিভাগ এটা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে পারে না। তাই আমরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিদ্যালয় ভবনটিতে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছি।

বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা মৌখিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছি। আগামী শনিবার থেকে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসনা হেনা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন,  বিদ্যালয়টি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে বলে আমাদেরকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো লিখিত চিঠি পাইনি।

তিনি আরো বলেন, এই বিদ্যালয়টিতে পাঠদান বন্ধ করতে বলা হলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মৌখিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে এটাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হবে।

প্রসঙ্গত, চলতি  মাসের  ৬ এপ্রিল তালতলী উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনের বিম ধসে পড়ে এক শিক্ষার্থী নিহত এবং ৫ জন আহত হয়। এছাড়া ১০ এপ্রিল বরগুনা সদর উপজেলা ১৬ নম্বর মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলার সময় ছাদের  পলেস্তারা খসে পড়ে এবং ১২ এপ্রিল আমতলী উপজেলার দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া জগৎচাঁদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এএসটি/

 

ফিচার : আরও পড়ুন

আরও