ভাষাসৈনিক কয়েস উদ্দিন, জামালপুরের জীবন্ত কিংবদন্তি (ভিডিও)

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

ভাষাসৈনিক কয়েস উদ্দিন, জামালপুরের জীবন্ত কিংবদন্তি (ভিডিও)

শওকত জামান, জামালপুর ২:০৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯

ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত ইতিহাস কয়েস উদ্দিন। জীবনের সিংহ ভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি দুঃখী মানুষের সেবায়।

ভাষা আন্দোলনে সময় জামালপুর শহরের মোড়ে মোড়ে চুঙ্গা ফুঁকিয়ে মানুষকে আন্দোলিত আর গান গেয়ে করেছেন উজ্জীবিত।

সংসার আর করা হয়ে ওঠেনি। চিরকুমার রয়ে গেছেন এখনো। একাকী বসবাস করছেন জামালপুর রেলওয়ে জংশনের পাশে জড়াজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে। 

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক দানশীল মানুষ তাকে জায়গা-জমি ও বাড়িঘর তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন। শত অভাবেও সেই প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিয়েছেন নিলোর্ভ মানুষটি।

নবনির্মিত জামালপুরে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রয়োজনে মরণোত্তর দেহদান করেছেন।

জীবনের পড়ন্ত বিকেলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা দেখতে না পেয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন এই ভাষাসৈনিক। মৃত্যুর আগে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার দেখে যেতে চান তিনি।

১৯২৪ সালে জামালপুর শহরতলির বেলটিয়া গ্রামে এই ভাষাসৈনিক জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কৃষক মরহুম ছইম উদ্দিন সরকার। বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি সংসারে অভাব থাকায়। ছোটবেলা থেকেই কাজের ফাঁকে নিজে গান রচনা, সুর ও গান গাইতেন। মানুষের অধিকার ও মানুষের সেবার সুযোগ পেলেই এগিয়ে যেতেন।

ঢাকা থেকে সারা দেশের মতো আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে জামালপুরেও। এ অঞ্চলের ছাত্রজনতা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। ভাষা আন্দোলনের খবর পেয়ে টগবগে যুবক কয়েস উদ্দিন বেলটিয়া গ্রাম থেকে শহরের বকুলতলায় গোপালদত্তের মাঠে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সভা-সমাবেশে অংশ নিতেন।

বকুলতলা মোড় থেকে যোগ দিতেন ভাষার মিছিলে।  ভাষা আন্দোলনের ওপর গান লিখে নিজেই গেয়ে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। চুঙ্গা ফুঁকিয়ে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিতেন জনতার মাঝে। শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গান রচনাও করেছেন তিনি। নিজেই তাতে সুরারোপ করেন এবং তা গেয়ে বেড়ান।

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বেত্রাঘাত এবং ময়মনসিংহ ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বছর জেল খেটেছিলেন এই ভাষাসৈনিক। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই ভাষাসৈনিক ভোরে শহীদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে মাইক নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েন।

রাস্তায় রাস্তায় মোড়ে মোড়ে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তার রচনা ও সুর করা গানগুলো গেয়ে নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। তার বিপ্লবী গণসংগীত শুনতে প্রভাতফেরিতে আসা মানুষজনের ভিড় জমে যায়।

কয়েস উদ্দিনের এখন বয়স হয়েছে। জীবনের ৯৫টি বসন্ত পার করেছেন একাকী। দেখে বোঝার উপায় নেই। তিনি এখনো চিরতরুণ। তবে বয়সের কারণে শরীরে নানা রোগ  বাসা বেধেছে। মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যান। মাস কয়েক আগে পড়ে হাত ভেঙে গিয়েছিল। এখনো ঠিক হয়নি পুরোপুরি।

কিন্তু তাতে কি? এই অসুস্থ শরীর নিয়েই দরিদ্র অসহায়  মানুষের সাহায্য-চিকিৎসায় ছুটে যাচ্ছেন। অংশ নিচ্ছেন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

ভাষাসৈনিক কয়েস উদ্দিন প্রসঙ্গে কবি সাজ্জাদ আনসারী বলেন, মানবিক চেতনায় কয়েস ভাই সমস্ত অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করছে। অসহায় মানুষের যেকোনো বিপদের দিনে হাজির হয়ে যান। জামালপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরণোত্তর দেহদানের ঘোষআ দিয়েছেন আনুষ্ঠানিকভাবে।

তার দেহ যেন মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে—এ চেতনায় তিনি মৃত্যুবরণ করতে চান। এটাই তার জীবনের শেষ চাওয়া।

সরকারি আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক মনোয়ার হোসেন বলেন, সারাজীবন তিনি দেশের  জন্যে, ভাষার জন্যে ও জাতির জন্যে কাজ করেছেন। আজ তার অনেক বড় জায়গায় থাকার কথা ছিল। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি নিজেকে সব সময় গুটিয়ে রেখেছেন, জনগণের মধ্যে থাকেন বলে তাকে মানুষ সেভাবে চেনে না।

আমরা যদি সত্যিকার জীবনের ইতিহাস জানতে পারতাম তাহলে অনেক বড় জায়গায় দেখতে পারতাম। আমরা যেন তাকে ভুলে না যাই।

তার কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানতে চাইলে স্মৃতিকাতর পড়েন এই ভাষাসৈনিক। শহরের স্টেশন রোডে জড়াজীর্ণ ঘরে পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে কথা হয় ভাষাসৈনিক কয়েস উদ্দিনের।

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমি অন্তরে লালন করি মাওলানা ভাসানীর দর্শন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম। মানুষের অধিকার, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতায় হানাহানির খবর কানে গেলে বৃদ্ধ বয়সেও রক্ত টগবগ করে ওঠে।

আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। আমি মায়ের ভাষা অটুট রাখার জন্য ভাষা আন্দোলন, দেশপ্রেমের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন করেছি। এখনো মানবতা বিপন্নের কথা শুনলেই ছুটে যাই আমি। প্রতিবাদ করি। মিছিল-মিটিং সমাবেশে উপস্থিত হই।

কোনো কিছু পাওয়ার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে বিলিয়ে দেইনি। যে বাসনা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। মরার আগে বৈষম্য, শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও সর্বস্তরে বাংলাভাষা ব্যবহার দেখে যেতে চাই।

এসজে/এমএ