মুজুনের সিরিয়ার মালালা হয়ে উঠার গল্প

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

মুজুনের সিরিয়ার মালালা হয়ে উঠার গল্প

পরিবর্তন ডেস্ক ১২:১৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৮

মুজুনের সিরিয়ার মালালা হয়ে উঠার গল্প

আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই কেটে যাচ্ছিল ছোটবেলা। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া, পড়াশোনা। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা। সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে আবার একটু পড়াশোনা। এটাই ছিল মুজুনের রোজনামচা।

মুজুন, মানে মুজুন আলমেলেহান। জাতিসংঘের কনিষ্ঠতম শুভেচ্ছাদূত। তবে এই তিনটা শব্দেই তার পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে জর্ডনের শরণার্থী শিবির। তার পর এখন ব্রিটেনের নিরাপদ আশ্রয়ে। অনেকটা পথ হেঁটে আজ এখানে এসে পৌঁছেছেন মুজুন। কেমন সেই পথচলা? শুনে নেওয়া যাক তার নিজের মুখেই। কলকাতাভিত্তিক আনন্দবাজারকে দেওয়া ই-মেইল সাক্ষাৎকারটি পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘আমার জন্ম সিরিয়ার দেরা শহরে। সেখানেই কেটেছিল জীবনের প্রথম বারোটা বছর। মা-বাবা, চাচা-চাচি সবাইকে নিয়ে নির্বিঘ্নে, আনন্দে দিন কাটছিল। ছবিটা পাল্টে গেল ১৩ বছরে পা দেওয়ার মাস খানেক আগে।’

২০১১-র মার্চ। সিরিয়ায় শুরু হলো গৃহযুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাথ বাহিনীর সঙ্গে সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর লড়াই। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস সেই পরিস্থিতিকে আরও রক্তক্ষয়ী করে তুলল। বোমা, গুলি আর ক্ষেপণাস্ত্রে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল মুজুনের মতো অনেকের শৈশব।

সিরিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না মুজুনের মা-বাবার সামনে। দুই কিশোরী কন্যা ও ছোট দুটি ছেলেকে নিয়ে দেশ ছাড়েন এমান ও রাকান আলমেলেহান। ঠাঁই মেলে জর্ডানের জাতারি শরণার্থী শিবিরে। মুজুনের কথায়, ‘সব কিছু ফেলে রেখে চলে আসতে হয়েছিল আমাকে। ফেলে এসেছিলাম আমার শৈশব। চাচা-চাচিমা, চেনা মহল্লা, পাড়ার বন্ধুরা, স্কুল— সব কিছু। কিছুই আনতে পারিনি সঙ্গে করে, শুধু স্কুলের কয়েকটা বই ছাড়া। আর একটা খাতা, যেখানে বন্ধুরা সবাই দুই-চার লাইন করে লিখে দিয়েছিল।’

মুজুন বললেন, ‘প্রথম প্রথম খুব ভয় লাগত। তবে জাতারি শিবিরে গিয়ে দেখলাম, স্কুল রয়েছে। পড়াশোনা চালানোর সুযোগ রয়েছে। আস্তে আস্তে ভয় কমল। মনে হলো, বাঁচতে আমাকে হবেই। লড়াই থামালে চলবে না।’

কেমন ছিল শরণার্থী শিবিরের সেই লড়াই? ‘খুব কঠিন’ বললেন মুজুন। ‘তত দিনে বুঝে গেছি, ঠিক মতো বাঁচতে হলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে।’ শুধু নিজের নয়, পড়াশোনা চালানোর এই অদম্য ইচ্ছেকে মুজুন ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল শরণার্থী শিবিরের আর পাঁচটা বাচ্চার মধ্যেও।

মুজুনের কথায়, ‘বাচ্চাদের বোঝানোর চেষ্টা করতাম, ঘুরে না বেড়িয়ে পড়াশোনা করা দরকার। তার সঙ্গে তাদের মা-বাবাকেও বোঝানোর দরকার ছিল। সেটা আরও কঠিন লড়াই। শরণার্থী শিবিরের অনেক মা-বাবা বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে বয়সে অনেক বড় লোকেদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তাদের বোঝাতে চেষ্টা করতাম, শুধু ছেলে নয়, মেয়েদেরও পড়াশোনা করা খুব জরুরি।’

এই জাতারি শরণার্থী শিবিরেই মুজুনের সঙ্গে প্রথম দেখা পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাইয়ের। পাক কিশোরী মালালার নামের পাশে তখনও ‘শান্তির নোবেলজয়ী’ শব্দবন্ধটি বসেনি। তবে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে ‘মালালা তহবিল’, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দুঃস্থ শিশুদের শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। সেই তহবিলের কাজেই সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে এসেছিল কিশোরী মালালা। পরে এক সাক্ষাৎকারে মালালা জানিয়েছিলেন, জর্ডানের সেই শিবিরেই এক সিরীয় কিশোরী তাকে বলেছিল, ‘তোমার কথা শুনেছি বটে। তবে আমাদের রোল মডেল— মুজুন! ও-ই আমাদের ঠেলে ঠেলে স্কুলে পাঠিয়েছে!’ শরণার্থী শিবিরে ঘুরতে ঘুরতে মালালার সঙ্গে যে বন্ধুত্বের সূত্রপাত, ব্রিটেনে আসার পর তা আরও গাঢ় হয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের অনুষ্ঠানেও মুজুনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মালালা। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমই মুজুনকে ‘সিরিয়ার মালালা’ নাম দিয়েছে।

২০১৫ সাল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ব্যবস্থাপনায়, সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে শুরু করে ব্রিটেন। প্রথম যে এক হাজার শরণার্থী সেদেশে পা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিল মুজুনের পরিবারও।

গত বছর শিশুদের প্রকল্প ‘ইউনিসেফ’-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে মুজুনকে বেছে নিয়েছে জাতিসংঘ। এর আগে কোনও শরণার্থী এই পদে আসেনি। পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে মুজুন গিয়েছিলেন জর্ডানের সেই জাতারি শরণার্থী শিবিরে। ‘আলাপ হলো সেদ্রার সঙ্গে। আমার মতোই সিরিয়া ছেড়েছিল মাত্র দশ বছর বয়সে। দুই বছর স্কুলের মুখ দেখেনি। কিন্তু এখন আবার পড়াশোনা শুরু করেছে। শুরু করেছে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে। সেদ্রার মতো মেয়েরাই শরণার্থী জীবনে আশার রোশনাই,’ লিখেছেন মুজুন।

জাতিসংঘের কাজ, তার সঙ্গে পড়াশোনা। ব্যস্ততার ফাঁকে আর কী করেন? ‘রান্না করতে ভাল লাগে। আর ভাইয়ের সঙ্গে ফুটবল খেলতে। তা ছাড়া, ছবি তোলা আমার নেশা। সময় পেলেই ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সাংবাদিক হব।’

আরপি