এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

পরিবর্তন ডেস্ক ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৮

এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

‘আর তারা আপনার কাছে এতিমের হুকুম ও অধিকারের বিষয়ে জানতে চায়। আপনি বলে দিন, তাদের যাবতীয় বিষয়ে সত্যনিষ্ঠপন্থা উত্তম। আর যদি তাদের (ব্যয়) তোমরা নিজেদের সঙ্গে মিশিয়ে নাও, তাদের তোমরা নিজেদের ভাই মনে করবে। বস্তুত কারা তোমাদের মধ্যে অমঙ্গলকামী আর কারা মঙ্গলকামী আল্লাহ জানেন। আল্লাহ যদি চান তাহলে তোমাদের ওপর কাঠিন্যতা আরোপ করতে পারেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা-বাকারা, আয়াত : ২২০)

এতিম আরবি শব্দ, যার অর্থ নিঃসঙ্গ। আবিধানিক ইবনে মঞ্জুর তাঁর লিসানুল আরব অভিধানে বলেছেন, ‘পরিভাষায় এতিম বলা হয়, যে সব শিশু সন্তানের বাবা মারা গিয়েছে এবং বালেগ তথা বুঝমান প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তারা এতিম হিসেবে গণ্য হবে। এরপর তাদের আর এতিম বলা হবে না। আর কন্যা সন্তান বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত এতিম হিসেবে গণ্য হবে। বিয়ের পর তাঁর থেকেও এতিমের হুকুম রহিত হয়ে যাবে।’

কেন না, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বালেগ হওয়ার পর আর কেউ এতিম থাকে না। (মেশকাত : পৃষ্ঠা নং ২৮৪)

এতিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার বিষয়ে পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের বহু জায়গায় দিকনির্দেশনা ও সতর্কবাণী উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা এতিমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের পেটে কেবল আগুনই ভক্ষণ করছে এবং অতি সত্ত্বর তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা-নিসা, আয়াত : ১০)

ইসলাম এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। বিশেষ করে, এতিম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি ১০টি অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম।

১. এতিমের সম্পদ অন্যদের স্পর্শ করা নিষিদ্ধ।
২. কঠোরতা বা জোর করা নিষিদ্ধ।
৩. মর্যাদার অধিকার।
৪. রুঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ।
৫. খাদ্যের অধিকার।
৬. আশ্রয় প্রদানের অধিকার।
৭. বয়োঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ।
৮. ইহসান বা ভালো ব্যবহারের অধিকার।
৯. ইনসাফ বা ন্যায় সঙ্গত বিচারের অধিকার।
১০. মালে ফাঈ বা যে মাল কাফেরদের সঙ্গে বিনা যুদ্ধে মুসলিমদের হস্তগত হয় (যেমন: খারাজ, জিযিয়া ইত্যাদি), তার ওপর অধিকার।

আল্লাহর হাবিব, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং ছয় বছর বয়সে মা আমিনাকেও হারান। তারপর তাঁর প্রতিপালনের দায়িত্ব নিলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। কিন্তু, তিনিও মাত্র দুই বছর পর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। সে হিসেবে তিনি ছিলেন সবদিক থেকেই এতিম।

তাই আল্লাহতাআলা বলেন, তিনি কি আপনাকে এতিম রুপে পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন! তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন। সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। (সুরা দুহা : ৬-৯)

এতিম প্রতিপালনের ফযিলত
একদিকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ছিলেন এতিম, অন্যদিকে, এতিমরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায়। নবী করীম (সা.)-এর দুধমাতা হালিমা (রাযি.) বর্ণনা করেন যে, এতিম হওয়ার কারণে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লালন-পালন করার জন্য কেউ নিতে সম্মত হয়নি। আমার উট ছিল দুর্বল তাই আমি সবার শেষে গিয়ে পৌঁছি। ইতোমধ্যেই অন্য সব শিশুদের অন্যরা নিয়ে গেছে। শুধু মুহাম্মদ ছিল। আমি এতিম মুহাম্মদকে গ্রহণ করি। মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার উট এমন সবল হলো যে, আমি আমার গোত্রের সবার আগে পৌঁছে গেলাম। আমার স্তন দুধে পূর্ণ হয়ে গেল, বকরি ও অন্যান্য সকল বস্তুতে এই এতিম বালকের কারণে কল্পনাতীত বরকত হতে থাকল।

তাই এতিমদের সঙ্গে আল্লাহর অশেষ করুণা ও রহমত আছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিম প্রতিপালনে অনেক ফজিলত বর্ণিত রয়েছে। নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হচ্ছে;

এক. এতিম প্রতিপালনে জান্নাতের উচ্চাসন লাভ হয়। সাহল বিন সাদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্যমাঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মাঝে সামান্য ফাঁকা করলেন। (বুখারি)

এ হাদিসে এটাই প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তি জান্নাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথী হতে চান সে যেন এই হাদিসের ওপর আমল করেন এবং এতিম প্রতিপালনে ব্রতী হন।

সার্বিক দিক থেকে তার প্রতি গুরুত্ব দেয়। কারণ, আখেরাতে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো স্থান হতে পারে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারীর অবস্থান জান্নাতে এই দুই অংগুলির ন্যায় পাশাপাশি হবে। চাই সেই এতিম তার নিজের হোক অথবা অন্যের। (বর্ণনাকারী) মালেক বিন আনাস (রা.) তর্জনী ও মধ্যমাঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করলেন। (সহিহ মুসলিম)

দুই. এতিম প্রতিপালনে রিযিক প্রশস্ত হয় এবং রহমত ও বরকত নাজিল হয়। আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, দুর্বল অসহায়দের আবেদনে আমাকে সাহায্য কর। তোমাদের দুর্বল-অসহায়দের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিযিক প্রাপ্ত হও। (আবু দাউদ)

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম যে বাড়িতে এতিম রয়েছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি যে বাড়িতে এতিম আছে, অথচ তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। অতঃপর তিনি তার আঙ্গুলির মাধ্যমে বললেন- আমি এবং এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব। (ইবনে মাজাহ)

তিন. এতিম প্রতিপালনে হৃদয় নম্র হয়। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার অন্তর কঠিন মর্মে অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, যদি তুমি তোমার হৃদয় নরম করতে চাও তাহলে দরিদ্রকে খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথা মুছে দাও। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৮৭)

চার. এতিম প্রতিপালন ও তাদের প্রতি সদয় আচরণে অত্যাধিক সওয়াব হাসিল হয়। আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ছেলে অথবা মেয়ে এতিমের মাথায় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে হাত বুলিয়ে দেয়, মাথার যত চুল দিয়ে তার হাতটি অতিক্রম করবে তার তত সওয়াব অর্জিত হবে। আর এতিমের প্রতি সে যদি ভাল ব্যবহার করে তাহলে এই দুই আঙ্গুলের ন্যায় সে এবং আমি জান্নাতে অবস্থান করব। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুই আঙ্গুলকে মিলিয়ে দেখালেন। (মুসনাদে আহমদ)

এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারীর শাস্তি
রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, সাবধান! যদি এতিমের সম্পদ হস্তগত হয় তাহলে ওই সম্পদ ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে। এমন যেন না হয় যে যাকাত দিতে দিতে তার সম্পত্তি শেষ হয়ে যায়। এই মর্মে হযরত উমর (রা.) থেকেও একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, তোমরা এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে, যেন যাকাত তার সম্পদ নিঃশেষ করতে না পারে।

একদা জনৈক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করল হে আল্লাহর রাসুল, আমার হৃদয় অত্যন্ত পাষাণ হয়ে গেছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন, এতিমের মাথায় হাত রাখ, মিসকিনদের আহার করাও। এতে অনেক পুণ্য রয়েছে। প্রতিটি চুলের বিনিময় নেকি দেয়া হবে।

এতিমের সম্পদে অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের জন্য ভীষণ শাস্তির হুমকি রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই যারা এতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে, আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। (সুরা নিসা : ১০)

জাহেলি যুগে মানুষেরা এতিমদের ধন-সম্পদ থেকে উপকার হাসিলে সীমালঙ্ঘন করত। এমন কি সম্পদের লোভে কখনো বিয়ে করত অথবা সম্পদ যাতে হাত ছাড়া না হয়ে যায় সেজন্য নিজের ছেলেকে দিয়ে বিয়ে করাত এবং বিভিন্ন পন্থায় তাদের সম্পদ ভক্ষণের চেষ্টা করত।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন। আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে ইবনে জারির (রহ.) বলেছেন, এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী কিয়ামতের দিন এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার পেটের ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা মুখ, দুই কান, নাক ও দুই চক্ষু দিয়ে বের হতে থাকবে। যে তাকে দেখবে সে চিনতে পারবে যে, এ হচ্ছে এতিমের মাল ভক্ষণকারী। (ইবনে কাসীর)

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন এক সম্প্রদায় নিজ নিজ কবর হতে এমতাবস্থায় উত্থিত হবে যে, তাদের মুখ থেকে আগুন উদগীরণ হতে থাকবে। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন, তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, আল্লাহতাআলা বলেন, যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষণ করে না। (ইবনে কাসীর)

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে রাতে আমাকে ভ্রমণ করানো হলো (অর্থাৎ ইসরার রাতে), সেখানে এমন এক সম্প্রদায়কে দেখলাম তাদের রয়েছে উটের ঠোটের ন্যায় ঠোট, যারা তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা ওই সকল লোকদের মুখের চোয়াল খুলে হা করাচ্ছে তারপর তাদের মুখ দিয়ে আগুনের পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে পাথরগুলি তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিবরাঈলকে বললাম, এরা করা? তিনি বললেন, এরা হচ্ছে এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী। (ইবনে কাসীর)

এফএস/আইএম