রাঙ্গার বক্তব্যে সাবেক ছাত্রনেতাদের সমালোচনার ঝড়

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

রাঙ্গার বক্তব্যে সাবেক ছাত্রনেতাদের সমালোচনার ঝড়

মাহমুদুল হাসান ১০:০৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৯

রাঙ্গার বক্তব্যে সাবেক ছাত্রনেতাদের সমালোচনার ঝড়

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত শহীদ নূর হোসেনকে  ‘ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর’ উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইছে।

তার বক্তব্যকে ‘চরম ধৃষ্টতা’ দাবি করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের তৎকালীন ছাত্রনেতারা রাঙ্গাকে রাজনীতি থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন। একইসঙ্গে স্বৈরাচারের এসব দোসর যাতে বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার না পায়, সেজন্যও জনগণকে সোচ্চার হতে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নূর হোসেনকে নিয়ে জাপা মহাসচিবের বক্তব্যকে ‘অর্বাচিনসূলভ ও স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীর’ ধৃষ্টতা হিসেবে দেখছেন  স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যর আহ্বায়ক জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ওই সময়ের সভাপতি আমান উল্লাহ আমান ।

বিদেশে অবস্থান করা ডাকসুর সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) আমান বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করা নূর হোসেন সম্পর্কে ওই লোক এতবড় সাহস কোথায় পায়? জাতি তা জানতে চায়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের  উপদেষ্টা আমান আরও বলেন, ‘রাঙ্গার এদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকারই নেই। নূর হোসেন সম্পর্কে এ ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দেয়ার অপরাধে তার বিচার করতে হবে।’

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক তৎকালীন আওয়ামী ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব।

তিনিও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত নূর হোসেন সম্পর্কে রাঙ্গার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য আত্মউৎর্গীত একজন শহীদ নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়ার ধৃষ্টতা দেখানোয় ওই স্বৈরাচারের পা-চাটাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা দরকার।’

হাবিব বলেন, ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়া এরকম একজন শহীদ সম্পর্কে এ ধরণের ঘৃণ্য বক্তব্য রাঙ্গার মতো নিকৃষ্ট লোকের মুখেই মানায়। এরা যাতে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সাহস না পায় সেদিকে দেশের জনগণেরও খেয়াল রাখা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘নূর হোসেন সারা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। কাগজ ব্যবহার না করে নিজের বুক-পিঠকে কবিতার জমিন বানিয়ে যে গণতন্ত্রের কবিতা লেখা যায়, তা সারা দুনিয়াকে শিখিয়েছেন নূর হোসেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের বন্দুকের নলের সামনে অকুতভয় থেকে নিজের বুক পেতে দিয়েছেন। নিশ্চিত মৃত্যুকেও পরোয়া করেননি। আর সেই সাহসী বীরকে নিয়ে কোথাকারকে রাঙ্গার এত নোংরা বক্তব্য দেশের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ কখনও মেনে নিতে পারে না। মেনে নিতে পারে না স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেল-জুলুম-হুলিয়া উপেক্ষা করে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র সমাজ।’

মশিউর রহমান রাঙ্গা

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অসিম কুমার উকিল বলেন, ‘নূর হোসেনের বিষয়ে জাপা মহাসচিব রাঙ্গা অত্যন্ত নিম্নমানের কথা বলেছে। এই লোকটিই ওই লাইনের (ইয়াবাখোর-মাদকখোর)। তাই সে ওসব বিষয়ে খোঁজ রাখেন।’

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক উকিল আরও বলেন, ‘১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় নূর হোসেন যুবলীগের নেতা ছিলেন। তিনি গণতন্ত্রের জন্য শহীদ হয়েছেন।’

নূর হোসেনকে নিয়ে কটূক্তি করার প্রতিবাদের রাজধানীতে সোমবার প্রতিবাদ মিছিলও করেছে যুবলীগ। সংগঠনটি রাঙ্গাকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছে। অন্যথায় তাকে রাজনীতিতে অবাঞ্ছিতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে রাঙ্গার কুশপুত্তলিকাও দাহ করেছে যুবলীগ।

৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ছাত্র নেতা ও গণতান্ত্রিক ছাত্র লীগের তৎকালীণ সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি বলেন, ‘শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে রাঙ্গার দেয়া বক্তব্য অনৈতিক ও শিষ্টাচার বর্হিভূত। সে এ ধরণের বক্তব্য দিয়ে প্রমাণ করলো তারা আসলেই স্বৈরাচারের রক্তের উত্তরাধিকারী। ১৯৮৭ সালে সামরিক শাসন বিরোধী অগ্নিগর্ভ উত্তাল রাজপথে শহীদ নূর হোসেন ছিলেন আগুনে তৈরি জীবন্ত পোষ্টার। রাঙ্গা তখন রংপুরের কোন স্তরের নেতা তা ভেবে দেখতে হবে?’

তার জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান বর্তমানে ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মনি।

প্রসঙ্গত, রোববার জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে ‘গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে  আলোচনা সভায় মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে সুন্দরবনে, যদি বিশ্বজিৎ ও আবরারকে হত্যা করা না হতো তাহলে বলতাম গণতন্ত্র রয়েছে। শিক্ষককে পানিতে ফেলে দেয়া হচ্ছে। জাবি ভিসির পদত্যাগের জন্য আন্দোলন করছে ছাত্ররা। ইয়াবাখোর ফেনসিডিলখোর ছিলেন নুর হোসেন। তাকে নিয়ে নাচানাচি করছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি। তাদের কাছে ইয়াবা-ফেন্সিডিল খোর ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের গুরুত্ব বেশি। এরশাদ সাহেবের কাছে এরা কোনো গুরুত্ব পাননি। যারা গণতন্ত্রের গ-ও বুঝে না, অ্যাডিক্টেড একটি ছেলে নূর হোসেন। পুলিশ গুলি করলো সামনে থেকে আর ঘুরে গিয়ে পেছন থেকে লাগল। কি হাস্যকর যুক্তি। তখনতো একজন মারা গেছে, এখন প্রতিদিনই মানুষ মরছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচার এরশাদ না, খালেদা জিয়া স্বৈরাচার। খালেদা স্বৈরাচার হলে শেখ হাসিনাও স্বৈরাচার। কারণ এখন প্রতিদিনই মানুষ গুম-খুন হচ্ছে। সর্বত্র মানুষের আহাজারি। একুশ বছর পর এরশাদের অনুগ্রহে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আর সেই আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়। নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ বিএনপি গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। ওদের মুখে গণতন্ত্র মানায় না। এই গণতন্ত্র মুখে দেয় নাকি মাথায় দেয়। আগে গণতন্ত্র বুঝতে হবে।’

এদিকে সোমবার এক প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে  রাঙ্গার বক্তব্যের বিরুদ্ধে মামলা করা ঘোষণা দেন  নূর হোসেনের মা মরিয়ম বিবি।

তিনি বলেন, আমার শহীদ ছেলেকে নেশাখোর বলেছে মশিউর রহমান রাঙ্গা, আমি এর বিচার জনগণের কাছে চাই। আমার ছেলে নেশাখোর হলে দেশের জন্য জীবন দিত না। মসিউর রহমান রাঙ্গার দেওয়া এই বক্তব্য প্রত্যাহার এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ত্রিশ বছর আগে আমার এই ছেলেটি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। আর এই ত্রিশ বছর পর এ ধরনের অহেতুক কথাবার্তা তিনি কেন বললেন? আমি মা হিসেবে সাক্ষী দিতে চাই আমার ছেলে পাগল অথবা নেশাখোর ছিল না।

আপনার শহীদ ছেলের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্যের মানহানি মামলা করবেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তার মা মরিয়ম বিবি বলেন, মামলা করা দরকার। বিষয়টি নিয়ে আমরা পারিবারিকভাবে আলোচনা করবো, এরপর সিদ্ধান্ত জানাবো। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মামলা করার পক্ষে।

এসময় শহীদ নূর হোসেনের বড় ভাই আলী হোসেন বলেন,  আমার ভাই দেশের জন্য শহীদ হয়েছে। আজ সে দেশেই তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অবান্তর কথা বলা হচ্ছে!

এমএইচ

 

রাজনীতি: আরও পড়ুন

আরও