দুই বলয়ের বাইরে যাচ্ছে না কৃষক লীগ

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

দুই বলয়ের বাইরে যাচ্ছে না কৃষক লীগ

সালাহ উদ্দিন জসিম ৬:৩৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৫, ২০১৯

দুই বলয়ের বাইরে যাচ্ছে না কৃষক লীগ

বেলা ওঠলেই কৃষক লীগের জাতীয় সম্মেলন। কৃষকের বাড়ির আদলে সভামঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বুধবার কৃষকের ওই বাড়িতে গিয়ে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের এ সহযোগী সংগঠনে আসবে নতুন নেতৃত্ব।

কারা আসবেন এই সংগঠনের নেতৃত্বে? কেমন হতে পারে নয়া কমিটির আকার? এ নিয়ে চলছে শেষ পর্যায়ের আলোচনা। পদ প্রত্যাশীরাও ‘নিয়ন্ত্রক’ নেতাদের দ্বারে দ্বারে শেষবারের মতো হাজিরা দিচ্ছেন। তবে, কমিটির আকার বাড়লেও প্রতিষ্ঠিত দুই বলয়ের বাইরে যাচ্ছে না কৃষক লীগ।

এক সময়ে গরীব মেহনতি খেটে খাওয়া কৃষকের এই সংগঠন সম্প্রতি নেতাদের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সংগঠনে কৃষক না থাকলেও কৃষিবিদদের প্রতিযোগিতা বেশি। আছে ভিন্ন পেশার মানুষদেরও দৌরাত্ম্য। তবে এবার সেই দৌরাত্ম্য ঘুচবে বলে আশা সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। তবে কৃষকলীগ নেতারা বলছেন, ‘এখানে কৃষক বা কৃষিবিদ বড় কথা নয়, কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ নিয়ে যারা কাজ করবে তারাই নেতৃত্বে আসতে পারবেন।’

জানা গেছে, জনসংখ্যার ৯০ ভাগ কৃষিনির্ভর দেশে কৃষকদের সংগঠিত করা, তাদের অধিকার আদায় ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য কৃষকলীগ প্রতিষ্ঠা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল গঠিত  এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় সেসময়কার কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে। সে থেকে এ সংগঠনটি কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। অর্জনের ঝুলি সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অতিসম্প্রতি পড়েছে বিতর্কের মুখেও।

বিদ্যমান কমিটির সভাপতি-সম্পাদকের নেতৃত্বে টাকায় কেন্দ্রীয় কমিটির পদ বিক্রি, নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে প্রয়োজনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, আবুধাবি, কুয়েত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কমিটি দেয়া এবং কৃষিজমি ও কৃষক না থাকা সত্ত্বেও রাজধানী বনানী ও গুলশানে কমিটি করা নিয়ে নানা সময়ে বিতর্ক হয়েছে। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন তুলেছেন, ‘গুলশান বনানীতে কৃষক লীগের কাজ কী?’

এছাড়াও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল আলম ফিরোজের ক্যাসিনো ব্যবসায় চূড়ান্ত সমালোচনার মুখে পড়েছে সংগঠনটি। অবশ্য, সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, অতীতের ভুল শুধরে নিয়ে আগামীতে বিতর্কের উর্ধ্বে ওঠে নতুন পথ চলবে কৃষক লীগ।

কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অডভোকেট সামছুল হক রেজা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, পুরনো গ্লাণি মুছে নতুন কমিটি নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। সংগঠনের সম্মেলন নিয়ে তিনি বলেন, ‘সব সময় কাউন্সিলররা নেত্রীর ওপর আস্থা রাখেন। তারা নেত্রীকে নেতা বাছাইয়ের দায়িত্ব দেন। এবারও তাই হবে আশা করি।’

কারা আসবে নেতৃত্বে, কৃষক না কৃষিবিদ? জাবাবে সামছুল হক রেজা বলেন, ‘কৃষক বা কৃষিবিদ বড় কথা নয়, নেত্রী যাদের মনোনীত করবেন, তারাই আসবেন এবং কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে কাজ করবেন। ’

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাই মূল অভিভাবক হলেও কৃষক লীগের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতার হাতে। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ আ. ফ. ম. বাহাউদ্দিন নাছিম। কৃষিবিদ ড. রাজ্জাক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কৃষিবিদ নাছিম বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। এই দুই নেতাই কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন। এসব কারণে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন ও কৃষক লীগে তাদের অঘোষিত বলয় রয়েছে।

আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, এই দুই নেতার ‍গুডবুকে যারা আছেন, তারাই আসবেন নেতৃত্বে। তারাই প্রধানমন্ত্রীর গুডবুকে জায়গা পাবেন।

সূত্র বলছে, এই দুই বলয়ের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হলেন কৃষকলীগের বর্তমান যুগ্ম সম্পাদক সমীর চন্দ্র, সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বনাথ সরকার বিটু, সাখাওয়াত হোসেন সুইট ও সহ সভাপতি বদিউজ্জামান বাদশা। এদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে।

এছাড়া নেত্রোকোনার সাবেক সাংসদ ছবি বিশ্বাসের নামও শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি আলোচনায় আছেন- বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজা, সহ-সভাপতি খান আলতাফ হোসেন ভুলু, হারুনুর রশিদ হাওলাদার, বর্তমান সহ-সভাপতি শরীফ আশরাফ আলী, ওমর ফারুক, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী, বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন ও আতিকুল হক আতিক।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘যদিও এটি কৃষকদের সংগঠন, এখানে অপেক্ষাকৃত তরুণদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বিতর্কিতদের যায়গা হবে না। তবে যারা দীর্ঘদিন সংগঠনটি করেছে, তাদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব আসবে। দুঃসময়ে ছিল, ত্যাগি ও আপসহীনদেরই নেতৃত্বে আনা হবে। বাইরে থেকে এনে কাউকে মূল পদে দেয়ার সুযোগ নেই।’

এবারের সম্মেলনে কৃষক লীগের গঠনতন্ত্রে বেশ পরিবর্তন আসছে। এরমধ্যে ১১১ সদস্যের কমিটির বদলে ১৫১, বিদেশ কমিটির অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিবর্তনসহ নানা বিষয় থাকছে এরমধ্যে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই সম্মেলনের মাধ্যমে মোতাহার হোসেন মোল্লাকে সভাপতি ও শামসুল হক রেজাকে সাধারণ সম্পাদক করে ১১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। দীর্ষ ৭ বছর পর সংগঠনটির সম্মেলন হচ্ছে। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেজেছে কৃষকের সাজে। সেখানে ৯০ ফুট দীর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থ সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, যেটি কৃষক লীগের সভা মঞ্চ। মূলত কৃষকের কাচারি ঘরের আদলেই তৈরি করা হয়েছে ওই মঞ্চ। মঞ্চের পাশেই আছে ‘আমার বাড়ি-আমার খামার’র একটি মডেল। এতে দেখা যাচ্ছে, কৃষক তার উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করছেন। প্রধান অতিথি ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গাড়ি থেকে যেখানে নামবেন, সেখান থেকে সবুজ ঘাসে প্রবেশ পথ তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার চারপাশে লাগানো হয়েছে বাঁশবাগান, ফলদ ও ঔষধি গাছ।

এসইউজে/এইচকে

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও