কেন এই ধরপাকড়?

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

কেন এই ধরপাকড়?

সালাহ উদ্দিন জসিম ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

কেন এই ধরপাকড়?

হার্ডলাইনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের ভেতরের অপরাধীদেরও ধরা শুরু করেছে। সমাজের অসঙ্গতি দূর করে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চায় তারা। এ জন্য দলীয় অপরাধীদেরও ছাড় নয়- নীতিতে এগুচ্ছে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ। তবে এই উদ্যোগকে সবাই সাধুবাদ জানালেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন অনেকে।

‘চাঁদাবাজির অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করা হয়েছে। যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা খালেদ মাহমুদ ভূইয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্তত ৫০০ নেতা টার্গেটে আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এসব নিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগে আতঙ্ক বিরাজ করছে। খোদ আওয়ামী লীগ নেতারাও ব্রিবত ও ক্ষুব্ধ।

অর্থাৎ সরকারের এই হার্ডলাইনের কারণে অনেকেই বাহবা দিলেও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে দলে। নেত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলার রেওয়াজ না থাকায় সবাই চুপ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ পুষছেন। তাদের বক্তব্য, ‘দলীয় নেতারা অপরাধে জড়ালে সতর্ক করা, প্রয়োজনে লঘু শাস্তি দেয়া, এতেও কাজ না হলে গুরুদণ্ড দেয়া যেতে পারে। এগুলো নিজেদের মধ্যকার বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে গেলে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলেও ইমেজ সংকটে পড়ে দল।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াও অপারেশন ক্লিন হার্ট চালিয়ে নিজের দলের অনেক প্রভাবশালী নেতাকে শায়েস্তা করেছেন। পরিণাম কী হয়েছে? আমাদের সবার চোখের দেখা।’

তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, এটা ঠিক আছে। তার মানে এই নয়, মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলবেন। ঢালাওভাবে কাজ করতে গিয়ে অন্যদের কাছে দলকে হাস্যরসের বস্তু বানাবেন? শক্তিসামর্থহীন করে দিলে দল তো টিকবে না। মনে রাখবেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে পেশিশক্তি অপরিহারর্য।’

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে ‘চাঁদাবাজি’সহ নানা অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন সংগঠনটির সাংগঠনিক নেত্রী। পরে ১নং সহ-সভাপতিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ১ নং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদককে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই বৈঠকেই যুবলীগের কিছু নেতার কার্যকলাপ নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘ওরা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ।’ এ সময় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ডে কাউকে ছাড় না দেয়ার কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর পর বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। নগদ টাকা, বিপুল পরিমাণ জুয়ার সরঞ্জাম ও বিদেশি মদ উদ্ধারের পাশাপাশি দেড় শতাধিক লোককে আটক করা হয়। ওই দিনই সন্ধ্যায় গুলশানের বাসা থেকে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের সভাপতি খালেদ মাহমুদ ভূইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, খালেদেরে গ্রেফতারের পর মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতার হতে পারেন- এই শঙ্কায় সহস্রাধিক নেতাকর্মী তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। অবশ্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেফতার হননি তিনি। তবে গ্রেফতার হতে পারেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বেশ গরম বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ ইঙ্গিতে অনেককে ‘থ্রেট’ও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা বলছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে। ওই ৬০ যায়গার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি আঙুল চুষছিলো এতদিন? যেখানে এই ক্যাসিনো আছে, সেখানকার পুলিশ-র‌্যাবকে ধরতে হবে। আমাকে অ্যারেস্ট করবেন? আমি এক শ বার অ্যারেস্ট হবো, কারণ আমি রাজনীতি করি। তবে আপনাকেও অ্যারেস্ট হতে হবে, কারণ আপনি এগুলোরে প্রশ্রয় দিয়েছেন। আমি জানি না এগুলো চলে। আমি ক্যাসিনো চালাই না। ক্যাসিনো দেখার আমার বেশ সখ জেগেছে। কেউ আমাকে নিয়ে যাবেন ক্যাসিনোতে।’

এদিকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ‘সারাদেশে অপরাধে জড়িত প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মীর তালিকা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতির হাতে রয়েছে। এরা দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের বিষয়ে একে একে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।’ 

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

গণভবন সূত্রে জানা গেছে, গতকালের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযান অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন সরকার ও দলীয় প্রধান।

এই খবরে আতঙ্ক বিরাজ করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মাঝে। রাজনৈতিক গুরুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে নিজের অবস্থা জানার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজসহ নেতাদের কিছু অংশ এই ধরপাকড়কে স্বাগত জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘দরকার আছে। এমন শুদ্ধি অভিযান হলে সরকারে আস্থা বাড়বে মানুষের। জনপ্রিয়তা বাড়বে।’

অনেকে বলছেন, ‘সব কিছুরইতো সীমা আছে, লাগাম টেনে ধরাটাই যুৎসই।’

তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এতে নাখোশ। তাদের যুক্তি; সরকার গঠন বা ক্ষমতায় আসার পূর্বশর্ত একটি শক্তিশালী দল। দলের শক্তি ক্ষয় হলে প্রকারান্তে সরকারও দুর্বল হয়। এ জন্য নিজেদের পরিশুদ্ধির জন্য দলীয় ব্যবস্থাই যথেষ্ট।

কিন্তু হার্ডলাইনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তিনি বলেছেন, ‘ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। একে একে সব ধরবো। আমি জানি, এটি কঠিন কাজ, বাধা আসবে, কিন্তু আমি করবোই। সমাজের অসঙ্গতি দূর করবো।’

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই এর পক্ষে কথা বলেছেন। আবার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও স্বীকার করেছেন।

এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে রিপোর্ট নেয়ার জন্য, কোথাও কোনো অপকর্ম হলে যথাযথ তথ্য দিতে। ভবিষ্যতে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনে দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানো হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। যেকোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এসইউজে/আরপি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও