ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এরশাদ

ঢাকা, ৬ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এরশাদ

মাহমুদুল হাসান ৭:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৯

ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এরশাদ

সেনাবাহিনীর প্রধান থেকে রাষ্ট্রনায়ক। টানা ৯ বছর ক্ষমতায় আসীন ছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমনি নন্দিত হয়েছেন, তেমনি নিন্দিতও হয়েছেন। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্র ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এরশাদ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও রাজনীতিতে ছিলেন আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।

’৯০-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরশাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেন। জোটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাকে কাছে টানতে প্রতিযোগিতায় নামে। তিনিও জোটে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেন। ফলে গত ৩০ বছর ধরে দেশের জোটের রাজনীতিতে ‘ফ্যাক্টর’ ছিলেন এরশাদ। 

১৯৯০ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরই গ্রেফতার হয়ে জেলে যান এরশাদ। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসনে জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পেয়েছিল। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। ফ্রিডম পার্টি ১ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০টি আসনে জিতে। এ ছাড়া গোলযোগের কারণে বাকি আসনে ভোট স্থগিত হয়ে যায়।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকের পর জোট গঠনের অন্যতম দিক হচ্ছে এরশাদকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে টানাটানি। ১৯৯১-র বিএনপির শাসনকালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন একটি জোট গড়ে ওঠে। ওই জোটে এরশাদের জাতীয় পার্টিও যোগ দেয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে জাসদ (রব) ও জাতীয় পার্টি সরকারে যোগ দেয়। তবে তা বেশি দিন টিকেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্যের সরকার থেকে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে যায়। পরে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোট করে। বিএনপি-জাতীয় পার্টি ছাড়া চার দলের বাকি দল দুটি হচ্ছে- জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ চারদলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যান। তখন জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন দেখা দেয়। নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি অংশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে যায়।

পরবর্তিতে চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে রাজনীতিকে নতুন মেরুকরণ হয়। তখনও এরশাদকে পক্ষে নিয়ে দুই প্রধান দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নানা চেষ্টা চালায়। কিন্তু চারদলীয় জোটের বিপরীতে গঠিত হওয়া ৮ দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যোগ দিয়ে ১১-দলীয় জোটে পরিণত করে। ওই জোট গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বর্তমানের ঐক্যফ্রন্টের নেতা গণফোরামের ড. কামাল হোসেন। ১১ দল পরে ১৪ দল হয়ে মহাজোটে রূপ লাভ করে। ওই জোটে যোগ দেন এরশাদ।

চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে এরশাদকে বিএনপি জোটে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে এরশাদ পল্টনের মহাজোটের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে মহাজোটের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। ওই মঞ্চে বিকল্পধারার বি. চৌধুরী, এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমেদও যোগ দেন। কিন্তু নির্বাচন করেন পৃথকভাবে।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করে এবং সরকার গঠনে সক্ষম হয়। একইভাবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত বর্জন করলেও জাতীয় পার্টি অংশ নেয়। ১৫৩টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ ও এর শরিক দলগুলো। জাতীয় পার্টি পায় ৩৪টি আসন। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় সংসদে বিরোধী দল হয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলের নেতা হন রওশন এরশাদ। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হন এরশাদ।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনেই সর্বাধিকসংখ্যক (৪৯ জন) প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি ৫ দলের সঙ্গে জোট করে ভোট করতে চেয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে ৪২টি আসন দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয় জোটের শরিকদের। কিন্তু ৫ দল বেশি আসন দাবি করায় শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে নির্বাচন করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

সর্বশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে পাশে পেতে নানা কৌশল নেয়। অন্যদিকে বিএনপি থেকেও এরশাদকে পাশে পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। তবে এরশাদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটেই যোগ দেন। দেশে বড় পরিসরে জোটের রাজনীতিতে সর্বশেষ সংযোজন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নতুন এ জোটে সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল। দুই জোট মিলে অংশ নেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে। কিন্তু ভোটের লড়াইয়ে মাত্র ৮টি আসন পায় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোট। ২২টি আসনে বিজয়ী হলে জাতীয় পার্টি এখন বিরোধীদলে আছেন। এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন।

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল থেকে শুরু করে আর্থিক কেলেঙ্কারি, নারী কেলেঙ্কারি, রাজনীতিতে একের পর এক ‘ডিগবাজি’ নেতিবাচক অনেক ধারা সৃষ্টির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন এরশাদ। ‘বিশ্ব বেহায়া’ হিসেবে শিল্পীর তুলিতে চিহ্নিত। তবে এরশাদ নিজ দলের নেতাকরর্মীদের কাছে ‘নায়ক’র মতোই ছিলেন।

এমএইচ/এসবি

আরও পড়ুন...
ইতিহাসে অমোচনীয় স্বাক্ষর রেখেছেন এরশাদ: বি. চৌধুরী
এরশাদের মতো মানুষ আর আসবে না: ছেলে এরিক
এরশাদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
চার স্থানে এরশাদের নামাজে জানাজা
এরশাদের মৃত্যুতে বিদিশার আবেগঘন স্ট্যাটাস
এরশাদ আর নেই
এরশাদের দাফন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় জাপা!

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও