ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআতে হাসানা, একটি ভ্রান্ত কথা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআতে হাসানা, একটি ভ্রান্ত কথা

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৮

ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআতে হাসানা, একটি ভ্রান্ত কথা

ঈদে মিলাদুন্নবী তথা নবীজি (সা.)- এর জন্মোৎসব পালন যে বিদআত (ধর্মের মাঝে নবোদ্ভাবিত একটি বিষয়), এ কথা যারা পালন করে তারাও বিশ্বাস করেন। তবে তারা দাবি করেন, মিলাদুন্নবী উদযাপন ‘বিদআতে হাসানা’ বা উত্তম বিদআতের আওতায় পড়ে। কেন না এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নবীজীকে (স.) প্রেরণের জন্য আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করা।

ইসলামের সঠিক কথা, বিদআত হলো একটি বিশেষ পরিভাষা, যা ধর্মের মাঝে নবোদ্ভাবিত বিষয়কে নির্দেশ করে, যা নিষিদ্ধ। অতএব, বিদআত বিদআতই। বিদআতের মধ্যে উত্তম বলে কিছু নেই।

নবীজী (স.) বলেছেন, ‘যে কেউই আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা এর কোনো অংশ নয়। তবে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (বুখারী)

নবীজি (স.) আরও বলেছেন, ‘প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা।’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী)

বিদআতের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হচ্ছে, এই যে সকল বিদআতই পথভ্রষ্টতার নামান্তর। কিন্তু, তাদের ভ্রান্ত যুক্তির কারণে তাদের ধারণা এই যে, সব বিদআতই দূষণীয় নয় বরং কিছু বিদআত আছে যেগুলো উত্তম।

শারহুল আরবাঈন বইতে হাফিয ইবনে রজব (র.) বলেছেন,
‘নবীজী (সা.)- এর বক্তব্য, ‘প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা’ একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক উক্তি যা সবকিছুকেই আওতাভুক্ত করে; এটি দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। এটা তাঁর এই বাণীর মতো, ‘যে কেউই আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা এর কোনো অংশ নয়। তবে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।’ (বুখারী, আল ফাতহ) যে কেউই এমন নতুন কিছু উদ্ভাবন করে ইসলামের সাথে একে সম্পৃক্ত করতে চায়, যার ভিত্তি এই দ্বীনে নেই। তবে সেটা পথভ্রষ্টতা এবং ইসলামের সাথে এর কোনোই সম্পর্ক নেই, তা আক্বীদাহ সংক্রান্তই হোক আর বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ কথা ও কাজ সংক্রান্তই হোক না কেন।’ (জামি’উল উলুম ওয়াল হাকাম, পৃ: ২৩৩)

‘বিদআতে হাসানা’ বা উত্তম বিদআত বলে কোনো কিছু আছে– এর সপক্ষে তাদের কাছে কেবল একটি প্রমাণই আছে, আর তা হলো তারাবীহ সালাত সংক্রান্ত উমারের (রা.) উক্তি, ‘এটা কতই না উত্তম বিদআত।’ (সহীহ বুখারী, আল ফাতহ)

এছাড়া তারা বলে যে কিছু বিদআত রয়েছে যে সম্পর্কে সালাফগণ কোনো আপত্তি তোলেননি, যেমন কোরআনকে একটি খণ্ডের মধ্যে সংকলিত করা এবং হাদীস লেখা ও সংকলন। এক্ষেত্রে বলা যায়, এগুলোর ভিত্তি দ্বীনেই রয়েছে, তাই এগুলো আদৌ বিদআত নয়।

উমার (রা.) বলেছিলেন, ‘কতই না উত্তম বিদআত’, এখানে বিদআত কথাটিকে শাব্দিক অর্থে নিতে হবে, শরীয়াতের পারিভাষিক অর্থে নয়। দ্বীনের মধ্যে যা কিছুরই ভিত্তি রয়েছে, সেটাকে যদি বিদআত বা নব্য প্রথা বলে আখ্যায়িত করা হয়, তবে সেক্ষেত্রে সেটা শাব্দিক অর্থে বিবেচনা করতে হবে, কেন না শরীয়াতের পরিভাষায় বিদআত হচ্ছে সেটাই যার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।

কোরআনের সংকলনের ভিত্তি ইসলামে রয়েছে, কেন না নবীজী (স.) কোরআন লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু, তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় সাহাবীগণ একে একটি খণ্ডে সংকলন করে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

তেমনি নবীজী (স.) কিছুদিন তারাবীর নামাযে ইমামতি করেন। কিন্তু, সেটা যেন ওয়াজিব হয়ে না যায়, এজন্য তিনি পরবর্তীতে তা থেকে বিরত হন। নবীজীর (স.) জীবদ্দশায় ও তাঁর পরও সাহাবীরা একাকী তারাবীহ পড়তেন, যতক্ষণ না ওমর (রা.) তাদেরকে একজন ইমামের পেছনে একত্র করে দেন, যেমনটি তাঁরা প্রাথমিক অবস্থায় নবীজীর (স.) পেছনে তারাবী পড়তেন। এটা ধর্মীয় ব্যাপারে মোটেও কোনো বিদআত নয়।

হাদীস লেখার ভিত্তিও ইসলামে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) কিছু হাদীস বিশেষ বিশেষ সাহাবীর জন্য লিখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন যখন তাঁর কাছে সেই অনুরোধ করা হয়। তবে সাধারণভাবে তাঁর জীবদ্দশায় হাদীস লেখার অনুমতি ছিল না। কেন না তা কোরআনের সাথে মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল এবং ভয় ছিল কোরআনের মধ্যে এমন কিছু অনুপ্রবেশের যা কোরআনের অংশ নয়। নবীজীর (স.) মৃত্যুর পর সে ভয় আর ছিল না। কেন না কোরআন নাযিল হওয়া ইতোমধ্যেই পূর্ণতা লাভ করেছিল এবং তাঁর মৃত্যুর পূর্বে এর ক্রমিক বিন্যাস নির্ধারিত হয়েছিল। তাই মুসলিমগণ এর পরবর্তীতে সুন্নাহকে সংরক্ষণ করার জন্য এবং হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য সংকলন করেন।

ইসলাম ও মুসলিমদের পক্ষ হতে আল্লাহ তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। কেন না তাঁরা তাঁদের প্রভুর কিতাব এবং নবীজীর (স.) সুন্নাহকে হারিয়ে যাওয়া ও বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করেছেন।

তাদের জবাব এ কথাও যে, যদি শুকরিয়া জানানোই উদ্দেশ্য হয়, যেমনটি তারা দাবি করে থাকেন। তবে তিনটি শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, সাহাবী, তাবেঈ ও তাবে তাবেঈগণের প্রজন্ম, যারা কিনা নবীজীকে (স.) সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন এবং সৎকর্ম ও শুকরিয়া আদায়ে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিলেন, তারা কেন এটি পালন করলেন না? যারা মিলাদুন্নবী পালনের এই বিদআত চালু করেছেন, তারা কি তাঁদের [তিন প্রজন্ম] থেকে অধিক হেদায়েত প্রাপ্ত? তারা কি আল্লাহর প্রতি অধিকতর শোকরগুজার? অবশ্যই নয়!

রাব্বুল আলামিন আমাদের সঠিক বুঝ ও সকল প্রকার শিরক-বিদআতমুক্ত জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএফ/

আরও পড়ুন...
‘ঈদে মিলাদুন্নবী : নবীজিকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন নাকি বিদআত?
অত্যাসন্ন ১২ রবিউল আউয়াল; ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত কেন?
সীরাতুন্নবী ও মিলাদুন্নবী : পার্থক্য ও সংশ্লিষ্ট কথা